১৮৭: মক্কা বিজয়-১: আক্রমণের অজুহাত!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

হিজরি ৮ সালের জুমাদি-উল আওয়াল মাসে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর, ৬২৯ সাল) স্বঘোষিত নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর যে অনুসারীদের সিরিয়া অভিযানে পাঠিয়েছিলেনে, মুতা নামক স্থানে এসে তারা কিরূপে চরম বিপর্যস্ত ও পরাজিত অবস্থায় পলায়ন করেছিলেন, তার আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে। প্রশ্ন ছিল, “এই চরম পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার পর অতঃপর মুহাম্মদ তাঁর নেতৃত্ব পুনঃ-প্রতিষ্ঠা ও অনুসারীদের মনোবল চাঙ্গা করার প্রয়োজনে কোন অবিশ্বাসী জনপদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিলেন ও তা কী অজুহাতে?”

মুতা অভিযানের চরম ব্যর্থতার পর, পরবর্তী দুই মাস মুহাম্মদ মদিনায় অবস্থান করেন। অতঃপর হিজরি ৮ সালের শাবান মাসে তিনি যে ঘটনাটি-কে “অজুহাত হিসাবে” ব্যবহার করে মক্কার কুরাইশদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী আক্রমণ চালান, সেই ঘটনাটি ঘটেছিল হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার একুশ মাস পরে। এই একুশ মাস সময়ে, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ও তাঁর অনুসারীরা “কমপক্ষে চারবার” হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির প্রায় প্রত্যেক-টি শর্ত ভঙ্গ করেছিলেন। ‘কুরআন’ ও ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের আলোকে এ বিষয়ের বিশদ ও বিস্তারিত আলোচনা “হুদাইবিয়া সন্ধি: চুক্তি ভঙ্গ (পর্ব: ১২৫-১২৮) পর্বে করা হয়েছে। হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন করার অব্যবহিত পর থেকে এই ঘটনাটির পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন কলাকৌশলে কমপক্ষে চারবার নিজেই এই সন্ধি-চুক্তির প্রায় প্রত্যেকটি শর্ত ভঙ্গ করার পর, সেই একই মানুষটি যখন সংক্ষুব্ধ, নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত কুরাইশদের বিরুদ্ধে ‘চুক্তি ভঙ্গের অজুহাত’ এনে বিনা নোটিশে তাঁদেরকে আক্রমণ করেন, তখন তা হয় নিঃসন্দেহে প্রতারণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত!

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা আক্রমণ ও বিজয় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর দশ বছরের মদিনা-জীবনে (৬২২-৬৩২ সাল) অবিশ্বাসী ব্যক্তি ও জনপদের ওপর যে ৬৫-১০০টি (সূত্র ভেদে বিভিন্নতা আছে) নৃশংস হামলার সাথে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তার সবগুলোতেই তিনি তাঁর আগ্রাসনের দায়ভার বিভিন্ন উপায়ে আক্রান্ত জনপদ-বাসীর উপর ন্যস্ত করেছিলেন। কিছু উদাহরণ:

১) কুরাইশদের বিরুদ্ধে যাবতীয় আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বৈধতা প্রদানের প্রয়োজনে, জিবরাইলের নামে মুহাম্মদের অজুহাত:

“তারাই প্রথম তাদের সাথে বিবাদের সূত্রপাত করেছিল ও তাকে/তাদেরকে বহিষ্কারের সঙ্কল্প নিয়েছিল (কুরআন: ৮:৩০, ৯:১৩-১৪, ৬০:১)।” [1]

২) বনি কেইনুকা গোত্রের সমস্ত লোককে তাঁদের শত শত বছরের ভিটেমাটি থেকে প্রায় এক বস্ত্রে উচ্ছেদ করে তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি লুট করার বৈধতা প্রদানের প্রয়োজনে, জিবরাইলের নামে মুহাম্মদের অজুহাত (পর্ব-৫১):

“তারা ধোঁকা দিতে পারে (কুরআন: ৮:৫৮)।”

৩) বনি নাদির গোত্রের সমস্ত লোককে তাঁদের শত শত বছরের ভিটেমাটি থেকে প্রায় এক বস্ত্রে বিতাড়িত করে তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি লুট করার বৈধতা প্রদানের প্রয়োজনে, জিবরাইলের নামে মুহাম্মদের অজুহাত (পর্ব-৫২ ও ৭৫):

“তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও ‘তারা আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছে (কুরআন: ৫৯:৪)’।

৪) বনি কুরাইজা গোত্রের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে খুন, তাঁদের সমস্ত নারী ও শিশুদের বন্দী করে দাস ও যৌন-দাসীতে রূপান্তর এবং তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি লুট করার বৈধতা প্রদানের প্রয়োজনে, জিবরাইলের নামে মুহাম্মদের অজুহাত (পর্ব-৮৭ ও ৯৪):

“তাহারা চুক্তি ভঙ্গ করে “কাফেরদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল (কুরআন: ৩৩:২৬)।”

৫) ঠিক একই ভাবে, ৬২৮ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে হুদাইবিয়াই দশ বছরের সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষর করার পর, মাত্র বাইশ মাসের মাথায় মুহাম্মদ সেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ৬৩০ সালের জানুয়ারি মাসে অতর্কিত হামলায় মক্কা বিজয় সম্পন্ন করেন; অজুহাত:

“যারা ভঙ্গ করেছে নিজেদের শপথ (কুরআন: ৯:১৩)।”

মুহাম্মদের এই অজুহাতটি যে একেবারেই মিথ্যাচার, তা আমরা জানতে পারি, ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিক মুহাম্মদের মক্কা আক্রমণের যে কারণ ও প্রেক্ষাপট লিপিবদ্ধ করেছেন, তা হলো, বহু আগে থেকেই বানু খোজা ও বানু বকর নামের দুই বিবদমান আরব গোত্রের সংঘটিত আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ, খুন-জখম ও হিংসা-প্রতিহিংসার কালানুক্রমিক ঘটনা-সমষ্টির সর্বশেষ অধ্যায়। এই ঘটনা-টি কী কারণে কোনভাবেই কুরাইশদের বিরুদ্ধে ‘চুক্তি-ভঙ্গের’ প্রমাণ হিসাবে গণ্য হতে পারে না, তার বিশদ ও বিস্তারিত আলোচনা “হুদাইবিয়া সন্ধি: চুক্তি ভঙ্গ-পাঁচ (পর্ব:১২৯)” পর্বে করা হয়েছে।” অতি সংক্ষেপে: [2][3][4][5]

‘হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি’ সম্পন্ন হওয়ার আগে সংঘটিত ঘটনা পরস্পরা:

বিবাদের সূত্রপাত-কারী বানু খোজা গোত্র (পরবর্তীতে মুহাম্মদের সাথে জোটবদ্ধ):

“মালিক বিন আববাদ নামের বানু বকর গোত্রের (পরবর্তীতে কুরাইশদের সাথে জোটবদ্ধ) এক লোককে তার বাণিজ্য থেকে ফেরার পথে আক্রমণ ও খুন করে তাঁর যাবতীয় মালামাল লুণ্ঠন করার মাধ্যমে বানু খোজা গোত্রের লোকেরা এই বিবাদের সূত্রপাত করে।”

> সে কারণেই, আক্রান্ত বানু বকর গোত্রের লোকেরা প্রতিশোধ স্পৃহায় আক্রমণকারী বানু খোজা গোত্রের এক লোককে হত্যা করে।

অতঃপর, বানু খোজার লোকেরা আবারও বানু বকরের “তিন জন” লোককে খুন করে:
“তারা খুন করে বানু বকর গোত্রের অন্তর্ভুক্ত আল-আসওয়াদ বিন রাজন আল দিল নামের এক লোকের তিন পুত্রসন্তান-কে, যাদের নাম ছিল: সালমা, কুলথিম ও তৈয়ব।”

>প্যাগান যুগে বানু আল-আসওয়াদ গোত্রের উচ্চতর মর্যাদার কারণে তাদেরকে দ্বিগুণ পরিমাণ রক্ত-মূল্য পরিশোধ করা হতো, কিন্তু বানু খোজা গোত্রের লোকেরা এই তিন খুনের রক্ত-মূল্য বাবদ তাঁদের-কে পরিশোধ করেন মাত্র ‘একগুণ’ পরিমাণ অর্থ। সেকারণেই, এই দুই বিবদমান আরব গোত্রের মধ্যে শত্রুতা চলতেই থাকে!

লক্ষণীয় বিষয় এই যে হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির পূর্বে সংঘটিত এই ঘটনা পরস্পরার নিরপরাধ এক বাণিজ্য ফেরত মানুষের ওপর হামলা ও খুনের ঘটনার সূত্রপাত-কারী ও পরবর্তীতে আরও তিন জন নিরপরাধ মানুষ-কে নৃশংসভাবে খুন ও সেই খুনের যথাযথ রক্ত-মূল্য পরিশোধ না করা গুষ্টিটি ছিলেন বানু খোজা গোত্রের লোকেরা, যারা হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির প্রাক্কালে মুহাম্মদের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন।

বানু খোজা ও বানু বকর গোত্রের এমত বিবদমান ও শত্রুভাবাপন্ন অবস্থায় “মুহাম্মদ ও কুরাইশদের” মধ্যে হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন হয়। এই সন্ধি-চুক্তির এক শর্ত ছিল এই যে, যদি কোনো ব্যক্তি মুহাম্মদ ও কুরাইশ এই দুই দলের যে কোনো একজনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে ইচ্ছা করে, তবে সে তা করতে পারবে। নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা, খুন ও রাহাজানির সাথে সরাসরি জড়িত আক্রমণকারী বানু খোজা গোত্রের লোকেরা যোগদান করে মুহাম্মদের দলে; আর, আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত বানু বকর গোত্রের’ লোকেরা যোগদান করে কুরাইশদের দলে।

‘হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি’ সম্পন্ন হওয়ার পরে সংঘটিত ঘটনা পরস্পরা:

অতঃপর, আবারও বানু খোজার লোকেরা বানু বকরের ওপর আক্রমণ চালায়:
“হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি পর আবারও বানু খোজা গোত্রের (মুহাম্মদের পক্ষ) এক লোক আনাস বিন যুনায়েম আল-দিলি নামের বানু বকর গোত্রের (কুরাইশদের পক্ষ) এক লোককে আক্রমণ ও আঘাত করে; সে কারণেই, এই দুই গোত্রের কলহ-বিবাদটি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।”

“লক্ষণীয় বিষয় এই যে, হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির আগে ও পরে সংঘটিত উভয় ঘটনাতেই ‘প্রথম আক্রমণকারী’ গুষ্টিটি ছিল মুহাম্মদের সাথে জোটবদ্ধ বানু খোজার লোকেরা!”

এমতাবস্থায়, কুরাইশদের সাথে জোটবদ্ধ আক্রান্ত বানু বকর গোত্রের “কিছু লোক” প্রতিশোধ স্পৃহায়, হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির আগে তাঁদের গোত্রের মোট চার জন নিরপরাধ লোকের (প্রথমে মালিক বিন আববাদ ও পরবর্তীতে সালমা, কুলথিম ও তৈয়ব) হত্যাকারী ও হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির পরে তাঁদের-কে আবারও আক্রমণকারী বানু খোজা গোত্রের (মুহাম্মদের সাথে জোটবদ্ধ) কিছু লোককে আক্রমণ করে। দু’দল সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ও এই সংঘর্ষে “কুরাইশদের কিছু লোক” বানু বকর গোত্রের লোকদের সাহায্য করে।

আদি উৎসের সকল মুসলিম ঐতিহাসিকরা দাবী করেছেন যে, এই ঘটনার মাধ্যমে কুরাইশরা হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছিলেন, যা মূলত: মুহাম্মদের দাবি! কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, এই ঘটনায় কুরাইশরা হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির আদৌ কোনো শর্ত ভঙ্গ করেন নাই! কারণ: হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছিল ‘মুহাম্মদ ও কুরাইশদের মধ্যে’, যার শর্তগুলো ছিল এই (পর্ব:১২২):

‘তারা আগামী দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ রাখবে, যাতে জনগণ সহিংসতা পরিহার করে নিরাপদে থাকতে পারে এই শর্তে যে:

[১] যদি কোনো ব্যক্তি তার অভিভাবকদের অনুমতি ব্যতিরেকে মুহাম্মদের কাছে আসে, তবে তিনি তাকে তাঁদের কাছে ফেরত দেবেন; কিন্তু মুহাম্মদের পক্ষের কোনো ব্যক্তি যদি কুরাইশদের কাছে আসে, তবে কুরাইশরা তাকে তাঁর কাছে ফেরত দেবে না।

[২] তারা একে অপরের প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করবে না ও কোনোরূপ গোপন অভিসন্ধি বা প্রতারণার আশ্রয় নেবে না।

[৩] যে কোনো ব্যক্তি যদি মুহাম্মদের সঙ্গে সংযুক্ত ও চুক্তিবদ্ধ হতে ইচ্ছা করে, তবে সে তা করতে পারবে এবং যে কোনো ব্যক্তি যদি কুরাইশদের সঙ্গে সংযুক্ত ও চুক্তিবদ্ধ হতে ইচ্ছা করে, তবে সে তা করতে পারবে। বানু খোজা গোত্র তৎক্ষণাৎ সেখানে ঘোষণা দিয়ে মুহাম্মদের সাথে সংযুক্ত হয় ও বানু বকর গোত্র একইভাবে কুরাইশদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

[৪] মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা সেই বছর অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করবে ও তাঁরা কুরাইশদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মক্কা প্রবেশ করবে না।

[৫] আর পরের বছর কুরাইশরা মুহাম্মদের আসার পথ পরিষ্কার রাখবে ও সে তার অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে পারবে ও সেখানে তারা তিন রাত্রি পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে। তারা আরোহীদের মত অস্ত্র সঙ্গে আনতে পারবে, যেমন খাপের ভিতরে তলোয়ার; এর চেয়ে বেশি কিছুই সঙ্গে আনতে পারবে না।

>>> আদি উৎসে মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বানু খোজা, বানু বকর ও কুরাইশদের সংঘটিত ঘটনায় ‘হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির যে সমস্ত প্রাসঙ্গিক শর্তগুলো জড়িত, তা হলো, এই:

এক: “তারা আগামী দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ রাখবে যাতে জনগণ সহিংসতা পরিহার করে নিরাপদে থাকতে পারে।”
 কুরাইশরা এই শর্তটি নিশ্চিতরূপেই ভঙ্গ করেননি, কারণ তাঁরা “মুহাম্মদ বা তার অনুসারীদের” ওপর কোনোরূপ আক্রমণ করেননি।

দুই: “তারা একে অপরের প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করবে না।”
 কুরাইশরা এই শর্তটি নিশ্চিতরূপেই ভঙ্গ করেননি, কারণ তাঁরা মুহাম্মদ বা তার অনুসারীদের ওপর কোনোরূপ শত্রুতা প্রদর্শন করেননি।

তিন: “তারা একে অপরের প্রতি কোনোরূপ গোপন অভিসন্ধি বা প্রতারণার আশ্রয় নেবেন না।”
 কুরাইশরা এই শর্তটিও নিশ্চিতরূপেই ভঙ্গ করেননি, কারণ তাঁরা মুহাম্মদ বা তার অনুসারীদের ওপর কোনোরূপ গোপন অভিসন্ধি বা প্রতারণার আশ্রয় নেননি।

হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির প্রাক্কালে “বানু বকর ও কুরাইশদের” মধ্যে মৈত্রী চুক্তি সম্পন্ন হয়। ইতিমধ্যেই মুহাম্মদ কমপক্ষে চার বার হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তি শর্ত ভঙ্গ করার কারণে কুরাইশ ও বানু বকর গোত্রের মধ্যে সংঘটিত মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী আক্রান্ত বানু বকর গোত্রকে সাহায্য “না করার” বিষয়ে কুরাইশরা নীতিগতভাবে বাধ্য ছিলেন না। মৈত্রী চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তাঁরা আক্রান্ত বানু বকর গোত্রকে সাহায্য করতে নীতিগতভাবে বাধ্য। তাঁদের “কিছু লোক” সেই কাজটিই করেছিলেন, “আক্রমণকারী বানু খোজা গোত্রের বিরুদ্ধে।” যেহেতু তাঁরা মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের কোনরূপ আক্রমণ করেননি, তাই তা হুদাইবিয়ার সন্ধিচুক্তির কোনো শর্ত ভঙ্গ ছিল না।

একইভাবে হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার সময়টিতে মৈত্রী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল বানু খোজা ও মুহাম্মদের মধ্যে। আদি উৎসের এই ঘটনার বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, বানু খোজা গোত্রের ওপর মুখ্য আক্রমণকারী গুষ্টিটি ছিল বানু বকর গোত্রের “কিছু লোক।” সকল বানু বকর গোত্র এই হামলায় জড়িত ছিলেন না, সকল কুরাইশরা তো নয়ই! এই ঘটনায় কুরাইশদের ভূমিকাটি ছিল গৌণ। এমত পরিস্থিতিতে মৈত্রী চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মুহাম্মদের কর্তব্য মূলত: “বানু খোজা গোত্রকে সাহায্য করা।” সর্বোচ্চ তিনি বানু খোজার পক্ষ নিয়ে মুখ্য আক্রমণকারী বানু বকর গোত্রকে আক্রমণ করতে পারেন। এর বেশি কিছু নয়!

>>> যে যুক্তির মাধ্যমে ইসলাম বিশ্বাসীরা কুরাইশদের কে হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির শর্ত ভঙ্গকারী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেন তা হলো: “যেহেতু বানু খোজা গোত্র মুহাম্মদের সাথে মৈত্রী-চুক্তি বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন, সেহেতু বানু খোজা গোত্রকে (মুহাম্মদের পক্ষ) আক্রমণ করার অর্থ হলো মুহাম্মদ কিংবা তার অনুসারীদের আক্রমণ করা। তাই তা হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ!” সে ক্ষেত্রেও, এই একই যুক্তিতে বানু বকর গোত্রের (কুরাইশদের পক্ষ) বিরুদ্ধে বানু খোজা গোত্রের আক্রমণের অর্থ হলো কুরাইশদের আক্রমণ করা; তাই তা হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির শর্ত ভঙ্গ। আদি উৎসের বর্ণনায় আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, হুদাইবিয়া সন্ধির আগে ও পরে সংঘটিত উভয় ঘটনাতেই “প্রথম আক্রমণকারী” গুষ্টিটি ছিল বানু খোজা গোত্র (মুহাম্মদের পক্ষ)।

“সুতরাং, এই যুক্তিতেও হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির শর্ত ভঙ্গকারী ছিলেন মুহাম্মদের পক্ষ, কুরাইশরা নয়।”

আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, এই হামলাটি বানু বকর গোত্র, কিংবা তাঁদের সাহায্যকারী কুরাইশদের সমষ্টিগত কোন সিদ্ধান্তের ফসল ছিল না। এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন এই দুই গোত্রের অল্প কিছু লোক! বিশিষ্ট দলপতিদের প্রায় সকলেই এই ঘটনার সাথে শুধু যে জড়িত ছিলেন না তাইই নয়, ঘটনাটি জানার পর তাঁরা জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত মনঃক্ষুণ্ণ ও এই ঘটনাটিকে ”অজুহাত হিসাবে” ব্যবহার করে তাঁদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদের আক্রমণের সম্ভাবনার দুশ্চিন্তায় তাঁরা ছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত! বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ছিলেন তাঁদের অন্যতম। আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, এই ঘটনার পাঁচ দিন পর আবু সুফিয়ান ভীত-সন্ত্রস্ত কুরাইশদের অনুরোধে মক্কা থেকে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। উদ্দেশ্য, মুহাম্মদের সাথে সমঝোতা ও তাঁর সাথে আপস-আলোচনার মধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা। [6]

মদিনায় পৌঁছার পর এই কুরাইশ নেতা একের পর এক নবী মুহাম্মদ ও তাঁর বিশিষ্ট অনুসারী আবু বকর ইবনে কুহাফা, উমর ইবনে খাত্তাব, আলী ইবনে আবু তালিব, উসমান ইবনে আফফান, নবী কন্যা ফাতিমা ও সর্বোপরি তাঁর নিজ কন্যা নবী পত্নী উম্মে হাবিবার সঙ্গে সাক্ষাত করে এই বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা চালান। মদিনায় এই সব লোকেরা তাঁর সঙ্গে কীরূপ আচরণ করেছিলেন, তার আলোচনা আগামী পর্বে করা হবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে:
“যদি কুরাইশরা চুক্তি-ভঙ্গ নাইই করে থাকেন, তবে কেন তাঁরা ছিলেন মুহাম্মদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত?” এর জবাব হলো, “বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অবিশ্বাসী জনপদের ওপর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের একের পর এক অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণ ও তাঁদের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধি।” মুহাম্মদের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধির কারণে মক্কার কুরাইশরা কীরূপ ভীত-সন্ত্রস্ত ছিলেন তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে ইসলামের ইতিহাসের দুইজন বিশিষ্ট সাহাবী, আমর বিন আল-আ’স (পর্ব: ১৭৭) ও খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের (পর্ব: ১৭৮) ইসলাম গ্রহণের কারণ ও প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায়, যার আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/ কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/
[2] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, পৃষ্ঠা ৫৪০- ৫৪২
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf
[3] আল-তাবারী, ভলুউম ৮; পৃষ্ঠা ১৬০-১৬২
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21292&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[4] আল-ওয়াকিদি, ভলুম ২, পৃষ্ঠা ৭৮০-৭৮৪; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৩৮৪-৩৮৬
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-
[5] হুদাইবিয়া সন্ধি: চুক্তি ভঙ্গ (পর্ব: ১২৫-১২৯):
https://drive.google.com/file/d/0BwbIXqxRzoBOUVBOUnlRUXkxX0E/view
[6] Ibid আল-ওয়াকিদি, পৃষ্ঠা ৭৮৫-৭৮৮; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৩৮৭-৩৮৯

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of