বিদ্বেষ-আমরা ও বাস্তবতা ।

যখন সবকিছু আগ্রাসনে জরাজীর্ণ তখন মুক্তির জন্য আঘাত দিতে হয় । আপনার স্তব্ধতা- মৌনতার মাঝে নাড়া দেবার আয়োজন লাগে ।তবে শক্ত হাতে আঘাত হানতে সততা আর বুদ্ধি নিষ্ঠ উদ্যোগ প্রয়োজন । সমাজের যে কোন পরিবর্তনে এর আবশ্যকতা মেনে না নেওয়ার কারণ নাই । মোটামুটি দুই দশক অন্তর অন্তর পরিবর্তন ঘটে এ দেশের মানুষের । যারা একটির সাথে আর একটির ধরণ মিলাতে চাইবেন তাদের প্রতি সমবেদনা । আপনার সময় যা হয়েছে তা যে দুই দশকের পর নতুন একটা প্রজন্ম মেনে নিবে সেটা বোধ করি বোকার রাজ্যে বাস করার মত প্রত্যাশা। এমন প্রত্যাশা নির্বুদ্ধিতা ছারা আর কিছুই না ।রবি ঠাকুরের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পরে গেল –

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা ,
ওরে সবুজ , ওরে অবুঝ,
আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।
রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে,
আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,
সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে
পুচ্ছটি তোর উচ্চ তুলে নাচা।
আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।

১৯৭১ সালের স্বাধীন দেশের , ৭২ এর সংবিধানের সেক্যুলারিজম আজ ধর্ষিত । ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা আজ পরাজিত শক্তির থাবায় রক্তাক্ত । স্বাধীনতা যুদ্ধ ধর্মের জন্য হয়নি হয়েছিল প্রত্যেক বাংলাদেশীর অধিকার আদায়ের জন্য ।কিন্তু আজ দেশটি ধর্মের নামে অন্ধত্ব বরণ করেছে ।আজ রাজনীতি,ব্যবসা,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ,কর্মক্ষেত্র, পোশাক সহ সকল বিষয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের আগ্রাসন চরমে । এখন মানবতা ধর্মের কাছে পরাজিত । পুরো জাতি এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত । পথ শিশুর আহার বাসস্থান নেই কিন্তু লক্ষ টাকায় কোরবানির গরু বিক্রি কিন্তু ঠিকই হয়। সকল সেক্টরে দুর্নীতির পাহাড় গড়া টাকা পয়সায় হজ্জ্ব ঠিকই হয় । দেশে কোন বিজ্ঞানী গড়ে উঠছে না বরং মাদ্রাসা থেকে লক্ষ লক্ষ মুখস্থ করা হুজুর গড়ে উঠছে প্রতি বছর। দেশে নেই কোন বিমান কিংবা গাড়ী তৈরি করার কারখানা কিন্তু প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় দানের টাকায় গড়ে উঠছে মাদ্রাসা সহ মসজিদ।নেই কোন বিজ্ঞানের শিক্ষা কিন্তু ঠিকই হেলিকপ্টারে করে ওয়াজিরা সুবিধা বঞ্চিত ধার্মিকদের অমুসলিমদের ঘৃণা ও হত্যা করার বীজ বপন করার মাধ্যমে প্রলুব্ধ করছে ।নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে বস্তাবন্দী করা হচ্ছে । মানুষের মাথায় বিশ্বাসের ভাইরাস দখল করে নিয়েছে , তাই নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের দায়িত্ব গায়েবি সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দিয়েছে । বিজ্ঞানের আশীর্বাদ কল্পনার সৃষ্টিকর্তা করছে বলে সবাই বিশ্বাস করে পশ্চাদপসরণ করছে । বাংলাদেশী সংস্কৃতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে । পুরো জাতি ধর্মান্ধদের জিম্মায় । এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে না , যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে পারে না বরং সমালোচনা করলে মোল্লারা দেশে অস্থিরতা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে । সবাই এখন মোল্লাদের পকেটে। আর মোল্লারা পুঁজি করেছে বিশ্বাসের ভাইরাসকে, প্রতিটি মানুষ এখন জিম্মি। এদের সহযোগিতায় আছে রাজনৈতিকবিদ ও ব্যবসায়ীরা ।

অনেক সেক্যুলার মানুষ নিরাপত্তার কারণে দেশত্যাগ করে জীবন জীবিকার প্রয়োজনে মুক্তচিন্তার প্রসারে নীরব ভূমিকা পালন করেছে । আর যারা দেশে আছে তারা তো প্রকাশ্যে আসতে পারে না । দেশের ভিতরে যারা প্রকাশ্যে আছে তারা ধর্মান্ধদের নিয়ে কথা বলতে পারে না । কেউ কেউ সামাজিক কিছু কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে । আবার অনেকে রাষ্ট্র যন্ত্র কিংবা ধর্মান্ধদের সাথে হাত মিলিয়ে তাদের তোষামোদ করে নিজের অবস্থান পোক্ত করছে । এরকম শূন্য মাঠে সমাজের রান্ধে রান্ধে প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামি করণ করা হয়ে গিয়েছে । চরম ভাবে রেডিক্যাল মুসলিমের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে । এখন দরকার শুধু কিছু অস্ত্র , যে কোন সময় জিহাদের জন্য প্রস্তুত লক্ষ্য লক্ষ্য তরুণ মাদ্রাসার ছাত্র অপেক্ষা করছে। এই পরিস্থিতি ধর্মীয় চেতনা দল গুলো করতে সক্ষম হয়েছে । মাদ্রাসার পাঠ্য কারিকুলাম গুলো সালাফি ধারায় চলছে । সরকার পদক্ষেপ নিয়েও পরিবর্তন করতে পারেনি পাঠ্য কারিকুলাম। তাদের ব্যাপকতা এখন এতই সংঘটিত যে তারা যে কোন সময় রাষ্ট্র যন্ত্রের ভীত নাড়িয়ে দিতে এখন সক্ষম । এদের সন্তুষ্ট করতে সরকার দিচ্ছে বিপুল অংকের অর্থ । আর বাজেটের মোটা বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে তৈরি হচ্ছে মসজিদ । আমাদের দেশে সাধারণত প্রতিটি মসজিদ নির্মাণের সাথে সাথে তার পাশে গড়ে উঠে মাদ্রাসা । একটু ভাবুন প্রতি বছর লক্ষ্য লক্ষ্য মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র বের হচ্ছে । তাদের কর্ম ক্ষেত্র যেহেতু মসজিদ মাদ্রাসা ভিত্তিক , সেহেতু বৃহদাংশ ছাত্ররাই থাকে বেকার । তাদের কোন কর্ম নেই, কারিগরি শিক্ষা নেই,অন্য পেষাতে কাজের সুযোগ নেই, এদের হতাশার মাত্রা প্রকট।এরাই প্রস্তুত আছে জিহাদের জন্য । কেউ এ বিষয়ে আলোচনা করার নাই । গবেষণা করার নাই । রাজনীতিবিদরা এখন বালিশ ,চেয়ার টেন্ডার ও ক্যাসিনোতে দ্রুত অর্থ অর্জনে ব্যস্ত । গত দশ বছরে ৫৫ হাজারের উপর মানুষ কোটিপতি হয়েছে । আর আমরা সম্ভবত অবৈধ ভাবে অর্থ পাচারে সারা বিশ্বে এক নম্বর ।আমাদের দেশের মানবাধিকার চেয়ারম্যান এখন ইসলামিক স্টাডিজে পড়ালেখা করা হিজাবী আমলা ।

আমরা বিগত ৩-৪ বছর ধরে মুক্তচিন্তা চর্চায় এ বিষয়গুলো অনুধাবন করতে পারি । আমাদের দেশের ৮০% লোক জানে না কোরান হাদিসে কি লেখা আছে ? ধর্মান্ধরা অর্থ সহকারে ধর্মীয় পড়াশুনার কোন ক্ষেত্র তৈরি হতে দেয়নি। তবে তারা নবী মুহম্মদ ও বুড়ীর কাঁটা দেওয়ার গল্প জানে । কিছু হলেই নবী মোহাম্মদের মানবিকতার প্রথম উদাহরণ এটি । এটা হাস্যকর , এটার কোন ইসলামিক দলিল নেই । পাঠক অবাক হবেন না । আমরা জানি হুজুরদের মুখে শুনেছি ইসলাম শান্তির ধর্ম।কিন্তু আপনি জানেন কি ইসলামে জিহাদ করার আয়াত কয়টি? সেক্সের আয়াত কয়টি ? দাসী সেক্সের আয়াত কয়টি?, গনিমতের আয়াত কয়টি? হত্যার আয়াত কয়টি ? নারীকে অবমাননা করার আয়াত কয়টি ?অমানবিক আয়াত কয়টি? সমস্যাটা হল কোরানে সংস্কার সম্ভব না এবং নবী মোহাম্মদ হল প্রত্যেক উম্মতের জন্য অনুকরণীয়।মোমিনরা দাবী করে ১৪০০ বছর পূর্বে ইসলামে এমন রীতিনীতিই প্রচলন ছিল এবং এখনও তা মেনে চলতে হবে ।কিন্তু আধুনিক বিশ্বের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের জীবন ধারা পরিবর্তন হয়েছে ।এখন ইসলামিক রীতিনীতি পৃথিবীর সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়া মোটেও যুক্তি সঙ্গত ও মানবিক নয় ।

তরুণ নাস্তিক ও মুক্তমনারা এখন অনেক আধুনিক,প্রগতিশীল ও মানবিক । ইসলামীকরন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মুক্তমনা ও তরুণ নাস্তিকরা তাই অনেক সমালোচনা করে ।নাস্তিক ও মুক্তচিন্তকরা যখনই ধর্মান্ধদের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ঠিক তখনই তারা হুমায়ূন আজাদ ,রাজীব ,অনন্ত, অভিজিৎ,বাবু, নিলয়, বাচ্চুদের ক্ষতবিক্ষত লাশের উপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করে। আর রাজনৈতিক ভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে বুলি আওড়াতে থাকে । ব্লাসফামি দিয়ে মোকাবেলা করে ফেলে সত্যকে । এমতাবস্থায় আমাদের দেশের তরুণ নাস্তিক ও মুক্তচিন্তাকরা নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে । তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কোরান হাদিস , তাফসীর , সিরাত গ্রন্থ, সরিয়া আইন সহ বিভিন্ন দেশের ইসলামি স্কলারদের ফতোয়ার এ্যাপস ও পিডিএফ ভার্সন অন লাইনে সাধারণ মুসলিমদের জন্য সহজলভ্য করে ফেলেছে এবং তরুণ নাস্তিক ও মুক্তমনারা ব্লগিং, ভিডিও ব্লগিং, অন লাইন ডিবেট ও আলোচনার মাধ্যমে মুক্ত চর্চা করে । এখানে বলা বাহুল্য মুক্তমনাদের ধর্মীয় সমালোচনা চলে বিজ্ঞান, দলিল ভিত্তিক, তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে ।সাধারণ মুসলিমরা ধর্মীয় গোঁড়ামির ফাঁক ফোকর সহজে নিজের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে যাচাই বাচাই করতে পারছে । ইন্টারনেটের কল্যাণে এটা মুক্তমনাদের সহজ হচ্ছে । প্রচুর মানুষের সারা পাওয়া যাচ্ছে । প্রতিদিন নতুন নতুন মুক্তমনারা অন লাইনে আলোচনা করছে অথবা ব্লগিং করছে ।মুক্তমনার এধরনের কাজ অদূর ভবিষ্যততে শাসকদের বাধ্য করবে ধর্মান্ধ মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ।ধর্মান্ধরা এখন প্রতিষ্ঠা করতে চায় মুক্তমনারা মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে এবং নবী মুহম্মদকে কটূক্তি করছে । এখন পাঠকরা বিবেচনা করবেন বিজ্ঞান,দলিল ও যুক্তি ভিত্তিক সত্য তথ্য কি ভাবে কটূক্তি হয়? এটা কি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক আচরণ ? সত্য বললে যদি মোমিনের ধর্মীয় আঘাত লাগে সে ক্ষেত্রে মুক্তমনাদের মোমিনদের প্রতি সমবেদনা জানানো ছারা কিছুই করার নাই । ইসলাম পরিশোধন না করলে মুক্তমনাদের লাগাতার কঠিন ও শক্ত আঘাত আসবে এটাই স্বাভাবিক । আন্দোলন তো আঘাতের মাধ্যমেই হয় ।

আমরা যারা তরুণ প্রজন্মের নাস্তিক ও মুক্তমনা , আমরা মনে করি আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর বাংলাদেশ উপহার দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব । তরুণ নাস্তিক মুক্তমনাদের দরকার শুধু সৎ ইচ্ছা , ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ আর ধৈর্য ধারণ করা । তরুণ মুক্তমনারা তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকে সংঘটিত হচ্ছে।এটা এখন সময়ের দাবী ।এখন পাঠক বিবেচনা করবেন নাস্তিক ব্লগাররা কি ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে ? নাস্তিকরা বিজ্ঞান,যুক্তি ও দলিল ভিত্তিক তথ্য উপস্থাপন করছে কি ? যেহেতু নাস্তিকরা ধর্ম ছেড়েছে সেহেতু তারা ধর্মের সমালোচনা করবে এটাই স্বাভাবিক । হুদাই ধর্ম বিদ্বেষী ট্যাগ লাগানোর কোন মানে নাই । আর মনে রাখবেন লেবু বেশী চিপলে কিন্তু তিতা বের হয় । আপনাদের সুদয় বুদ্ধির উদয় হউক । আমাদের মুক্তমনারা যাদের মনে হচ্ছে নাস্তিকরা ধর্মকে বিদ্বেষ করছে তারা দূরে চলে জান।মুক্ত চর্চা করতে থাকেন আপনার মতো করে । এখন নবীনদের কাজ করতে দেন ।

সবাই ভাল থাকবেন ।

জ্যাক পিটার ।
০৬/১০/২০১৯।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of