দুর্গাপুজো ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

দেখতে দেখতে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজো এসে উপস্থিত হয়েছে, তাই সমস্ত বন্ধুদের দুর্গাপুজোর শুভেচ্ছা জানালাম; সকলে শুভেচ্ছা গ্রহণ করল কিন্তু কিছু মুমিন বন্ধুরা বলল ভাই ‘কেন বিধর্মী কাফেরদের শিরিক কারি উৎসবের শুভেচ্ছা জানাচ্ছো? ঈমান থাকবে না, তওবা কর!’ এখন প্রশ্ন হল ঈমান কথার অর্থ কি? ঈমান কথার অর্থ হল বিশ্বাস। তাহলে প্রশ্ন হল ইসলাম কি এমনই ঠুনকো ধর্ম যে সামান্য শুভেচ্ছা জানালে ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে ও ঈমান থাকবে না? সত্যি বলতে কি এই সমস্ত বন্ধুদের কোন দোষ নেই নবী মহম্মদ প্রবর্তিত ইসলাম ধর্ম পৃথিবীকে মুসলমান ও অমুসলমান এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে ইসলামের দৃষ্টিতে অমুসলিমরা হল নিকৃষ্টতম প্রাণী। কোরানের সূরা বাইয়্যিনাহ:6 – নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম’। (98:6)

ইসলামি মতে আপনি অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারবেন না, ও অন্য ধর্মের মানুষদের তৈরী করা দ্রব্য কিনতে পারবেন না। এ সম্পর্কিত কোরানের একটি আয়াত হল- সূরা আল ইমরান:24 – ‘মুমিনগন যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশঙ্কা কর, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে আল্লাহ তা আলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাই কে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।’ (3:24) এই কারণেই রথ বা পুজোর সময় বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা অনেক সময় বলেন রথের মেলা থেকে কোন দ্রব্য কেনা মানে আপনি গোনার শরিক হবেন, তাই এই সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকুন, তাহলে বুঝুন কি অবস্থা! ইমরান খানের মত মডারেট মুসলিমরা বিশ্বকে বলতে চেষ্টা করে ইসলাম শান্তির ধর্ম কিন্তু আসল সত্যটি হল ইসলাম কোন দিনই শান্তির ধর্ম ছিল না, ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধ ও রক্তের মাধ্যমে সেই রক্ত পিপাসা আজও মেটেনি! এই ধর্মটি একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ধর্ম, যা অন্যান্য ধর্মের স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।

মানব সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম দিকে মানুষ বিভিন্ন প্রকৃতিক শক্তিগুলিকে পুজা করত এভাবে বহুত্ববাদী ঈশ্বরের ধারণার সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে এই সমস্ত ধর্মের কঠোর আচার আচরণ ও যাগযজ্ঞের আধিক্যের কারণে মানুষ একেশ্বরবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এই সমস্ত কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইহুদি, খ্রিস্টান প্রভৃতি একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রবর্তন হয়, সর্বশেষে প্রবর্তিত হয় ইসলাম ধর্মের। নবী মহম্মদের প্রবর্তিত ইসলাম ধর্ম এগুলির মধ্যে সবচেয়ে উগ্র ছিল, তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলেন পৃথিবীতে ততদিন যুদ্ধ চলবে যত দিন না একটি ও মানুষ ইসলাম গ্রহণে অবশিষ্ট থাকবে। তার ফল হিসাবে আজও বিশ্বব্যাপী জেহাদি কর্মকান্ড দেখা যায়। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কাবা ঘরের 360 টি পৌত্তলিক মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন এবং মূর্তিপূজাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ইসলামের দৃষ্টিতে সব গোনার ক্ষয় আছে কিন্তু ‘শিরিক কারির’ কোন ক্ষমা নেই এবং মুসলিম হিসাবে আপনার কর্তব্য হল- যদি শক্তি থাকে তাহলে হাত দিয়ে এগুলি বন্ধ করতে হবে, না হলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতে হবে!

ঠিক এই কারণে বাংলাদেশ, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন মন্দিরের প্রতিমা ধ্বংসের খবর দেখা যায় এবং ভারতের ক্ষেত্রে সাধারণ মুমিন মুসলমানরা মুখে না বললেও দুর্গাপুজোর মতো উৎসবকে তাঁরা অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। শুধু তাই নয় ইসলামি মতানুসারে কোন মুসলমান মারা গেলে বলা হয়- “ইন্না লিল্লাহী ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” অর্থাৎ সে ব্যক্তি যত বড় অপরাধীই হোক না কেন সে জান্নাতবাসী (স্বর্গবাসী) হবে। অন্যদিকে কোন বিধর্মী মারা গেলে বলা হয়- “ফি নারি জাহান্নামা খালিদিনা ফিহা” অর্থাৎ “জাহান্নামের আগুনে সে স্থায়ী ভাবে থাকবে”। এই আয়াত অনুসারে বলা যায় সমস্ত জেহাদি, তালিবান ও আইএস যোদ্ধারা জান্নাতে যাবে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, নেলসন ম্যান্ডেলা, বিল গেটস প্রমুখ মহামানবেরা জাহান্নামবাসী হবে! ইহাই ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, এথেকেই প্রমাণিত হয় ‘ইসলাম ঘৃণার শিক্ষা দেয়’!

শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের মতো মানুষ বলেছিলেন- ‘যত মত তত পথ কালী, খৃষ্ট, আল্লা সব এক’! এই রকম সমন্বয়বাদী চিন্তা ভাবনা অবশ্যই শিশুদের বৌদ্ধিক বিকাশের ও সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য আবশ্যক কিন্তু এর কি কোন বাস্তবিক প্রয়োগ আছে? ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বব্যাপী শরিয়তি আইন চালু করতে চাই। এই শরিয়তি আইন অনুসারে অমুসলিমদের জিম্মি অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হবে, তাঁদের নিজস্ব ধর্ম পালনের কোন অধিকার থাকবে না এবং তাঁদের জীবন নির্ধারণের জন্য ‘জিজিয়া কর’ প্রদান করতে হবে। শুধু তাই নয় এই শরিয়তি আইন অনুসারে নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে গণ্য করা হবে তাঁদের পড়াশোনা, চাকরি, বাড়ির বাইরে যাওয়ার অধিকার নেই। যদিও মুমিনা নারীরা মনে করে ‘ইসলাম দিয়েছে নারীকে সর্বোচ্চ সন্মান’। সর্বোচ্চ সন্মান বলতে যদি শুধুমাত্র ‘সন্তান উৎপাদনের মেশিন এবং বস্তাবন্দি হয়ে থাকা বোঝায়’ তাহলে নিশ্চয়ই ইসলাম দিয়েছে নারীকে সর্বোচ্চ সন্মান! এছাড়াও ইসলামের বিভিন্ন বিভাগ শিয়া, সুন্নি, আহমেদীয়া, হানাফি, সালাফি ইত্যাদি মতাদর্শের মানুষরা পরস্পরকে কাফের মনে করে, তাহলে সহি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে কারা যে সহি মুসলমান হবে সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন?

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে ইসলাম অন্য কোন ধর্মের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করেনা এবং এই ধর্মটি মানব সভ্যতার জন্য হুমকি স্বরূপ। এখন প্রশ্ন হল ইসলাম যদি মূর্তি পূজা সম্পর্কে এত কঠিন অবস্থান গ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মত মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এবং ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বিঘ্নে এই পুজো সম্পন্ন হয় কি করে? (মূর্তি ধ্বংসের মতো সাম্প্রদায়িক ঘটনা কিছু হয় অস্বীকার করছি না, তবে সামগ্রিকভাবে বিভিন্ন ধর্মের উৎসব সুষ্ঠভাবেই সম্পন্ন হয়) এখানেই আসে মানুষের মানবিকতার কথা, উপমহাদেশ তথা বিশ্বের বেশিরভাগ মুসলমানরাই শুনে মুসলমান তাঁরা ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানে না। তাঁরা মনে করে ইসলাম মানে নামাজ, রোজা, কলেমা, জাকাত, হজ প্রভৃতি।

ইসলাম যে শুধু এত ছোট্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই, ইসলামে জেহাদ ও বিধর্মীদের কতল করার বিধান রয়েছে তা তাঁরা বোঝে না। আসলে সাধারণ মানুষ অন্নসংস্থানের জন্য জীবন যুদ্ধে ব্যস্ত, তাই আরবির মতো এক দুরূহ ভাষাই ধর্ম চর্চা করার মতো সময় বিশেষ পায় না। মোল্লাদের দ্বারা প্রচারিত কথায় বিশ্বাসী হয়ে মানুষ মনে করে নবী মহম্মদ বড় মানবিক মানুষ ছিলেন এবং তিনি মানবতার কথা বলতেন। আসলে মানবিক অনুভূতি সম্পন্ন কোন মানুষই শুধুমাত্র অন্য ধর্ম পালনের জন্য কোন মানুষের হত্যাকে সমর্থন করে না, সেইসঙ্গে তাঁরা মনে করেন সকলেরই নিজের ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। ঠিক এই কারণেই বেশিরভাগ মুসলমানরাও মনে করেন প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিজের স্বাধীন ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে, ঠিক এখানেই নবী মহম্মদের জঘন্য মতবাদ পরাজিত হয়েছে ও মানবতাবাদ জয়যুক্ত হয়েছে!

ব্যাক্তিগত ভাবে আমি কোন ধর্মে বিশ্বাসী নয়, তবে উৎসব ভালোই লাগে। বিশেষত দুর্গাপুজোর বিভিন্ন প্যান্ডাল, শিল্প কর্ম, গান ও সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিবেশ রীতিমতো মুগ্ধ করে। আর একটি কারণে দুর্গাপুজোতে যায় তা হল এই সমস্ত মৌলবাদীদের সাম্প্রদায়িক চিন্তার প্রতিবাদ স্বরূপ এই উৎসবে অংশ গ্রহণ করি। মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণের কারণে মুসলমানদের মানসিক অবস্থা খুব ভালো করে বুঝি। ইসলাম ধর্মে কোন আনন্দের উৎসব নেই, ইসলাম ধর্ম অনুসারে গান শোনা, গান করা, কবিতা লেখা, ছবি আঁকা, নৃত্য প্রভৃতি সমস্ত কিছুই যা মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন তা সব কিছুই হারাম করা হয়েছে, সব সময় আল্লাহ ও জাহান্নামের ভয়ে ভীত থাকতে হবে! তাই প্রকৃতপক্ষে মুসলমানরা মানসিক দিক থেকে অসুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের মধ্যে উগ্রতা বিরাজ করে।মুসলমানদের প্রধান দুই উৎসব ‘ঈদ উল ফিতর’ ও ‘ঈদ উল আজহা’।

ঈদ উল ফিতর এক মাস রোজা রাখার পর হয়, একে খুশির ঈদ বলা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল কি করে এটি খুশির ঈদ হল? ছোটবেলায় সারাবছর অপেক্ষা করে থাকতাম চাঁদরাতের জন্য ওই দিন ফিস্ট হত, গান হতো, নাচ হত সত্যিই ঈদে এক প্রাণবন্ত ভাব থাকত। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় জামাতিরা ঈদের এই আনন্দকে হারাম ঘোষণা করেছে। তাই এখনকার ঈদ মানে শুধু বাড়িতে কিছু খাওয়া দাওয়ার আয়োজন ও সারাদিন মাইকে জঘন্য ওয়াজ শোনা এবং সাম্প্রদায়িকতার প্রসার! তাই বর্তমানে ঈদ আসলে আর খুশির হয় না বরং মনে হয় এই দিনের যত দ্রুত প্রস্থান ঘটবে ততই মঙ্গল! আর ‘ঈদ উল আজহা’ এর বিষয়ে কি বলব, এটা একটি অভিশপ্ত দিন! এই দিন সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার নামে যেভাবে নিরীহ পশুগুলিকে কুরবানী করে হত্যা করা হয় তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম জঘন্য ও হৃদয় বিদারক এক ঘটনা!

তাই প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের কোন খুশির দিন নেই, এই কারণে তাঁদের এক বৃহৎ অংশ বিভিন্ন ভাবে পুজো, ক্রিসমাস ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। এই সমস্ত উৎসবে এসে তাঁরা মানসিক আনন্দ লাভ করে ও আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে তোলে। প্রকৃতপক্ষে হিন্দুধর্মের এই দুর্গাপুজো আর হিন্দুদের মধ্যে আবদ্ধ নেই বরং তা সার্বজনীন দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে এবং আমাদের সৌভাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করছে, ইহাই এই উৎসবের সার্থকতা। আসলে উপমহাদেশে সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির প্রসারের ক্ষেত্রে দুর্গাপুজো, গণেশ উৎসব, দশেরা, হোলি, ডান্ডিয়া রস, গরবা এগুলির বিরাট ভূমিকা রয়েছে। ধর্মীয় দিক থেকে ইসলামে সার্বজনীন কোন উৎসব নেই। (ব্যাক্তিগত উদ্যোগে মানুষ এটি বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে পালন করে, তবে ঈদের কোন সার্বজনীন চরিত্র নেই।) কিন্তু হিন্দুধর্মে এরূপ সার্বজনীন উৎসব থাকার কারণে ভারতীয় উপমহাদেশে এই সমস্ত পুজোকে কেন্দ্র করে এক সার্বজনীন উৎসবের সৃষ্টি হয়েছে এটিই আমাদের মিশ্র সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। যদিও এই পুজোতে যে বিপুল পরিমাণ খরচ করা হয় তার যদি কিছু অংশ গরীব দুঃখী মানুষদের পিছনে খরচ করা হত তাহলে কি দেবী দুর্গা আরও বেশি খুশি হতেন না? আর দুর্গাপুজো যদি ক্রিসমাসের মতো সম্পূর্ণ ধর্ম বিমুখ একটি উৎসবে পরিণত হতো তাহলে মানবতার আরও প্রসার ঘটত।

এখন বেশ কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠন তাঁরা মানুষের মধ্যে এই ভাতৃত্ববোধকে নষ্ট করতে চাই। তাঁরা মনে করে ইসলামি মৌলবাদের জবাব তারা হিন্দুত্ববাদ দিয়ে দেবে। সেই উদ্দেশ্যে বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দলের মতো সংগঠনরা বহুক্ষেত্রে ডান্ডিয়া, গরবা, দশেরা ইত্যাদির মত উৎসবে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমান সহ অন্য ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে কথা বলছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্ত অনুষ্ঠানে যোগদানের ক্ষেত্রে আধার কার্ড দেখতে চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এরা ভারতের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্ন করতে চাই। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে প্রচ্ছন্নে হিন্দু মুসলমান বিভেদ সৃষ্টি করতে চাই। হিন্দুধর্ম এখনও পর্যন্ত ভারতের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে কিন্তু হিন্দুত্বের যে প্রসার ঘটছে তা রীতিমতো ভয়াবহ! কারণ ইসলামী মৌলবাদীদের টক্কর দিতে গিয়ে যেভাবে হিন্দুত্বের প্রসার ঘটছে তা সমাজকে বহু ভাগে বিভক্ত করছে। গোরক্ষার নামে যেভাবে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে তা রীতিমতো মানবতার জন্য লজ্জা! হিন্দুত্ববাদী গোরক্ষকদের তা কে বোঝায়? এখন প্রশ্ন হল এই হিন্দুত্ববাদ কি হিন্দুদের পক্ষে?

হিন্দুত্ববাদের ধারক ও বাহকরা দেশের হিন্দুদের পুরানো ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যেতে চাই যেখানে সবার উপরে থাকবে ব্রাহ্মণ, তারপর ক্ষত্রিয়, তারপর বৈশ্য ও সবশেষে শূদ্র। এর প্রতিফলন হিসাবে দেখা যায় বর্তমান লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এক জায়গায় ব্রাহ্মণদের প্রশংসা করে বলেন, ‘সমাজে ব্রাহ্মণদের স্থান সর্বোচ্চ’! এই যদি দেশের স্পিকারের অবস্থা হয় তাহলে দেশের আপামর জনসাধারণের কি হবে? একদিকে দলিত ও নিম্নবর্ণের মানুষদের উপর অত্যাচার ক্রমবর্ধমান। খবরের কাগজে প্রায়ই প্রকাশিত হয় কোথাও দলিত শিশুরা রাস্তার ধারে বসে মল ত্যাগ করার কারণে তাদের উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা হত্যা করে, আবার কোথাও দেখা যায় উচ্চ শ্রেণীর মানুষের শ্মশানে নিম্নবর্ণের মানুষকে পোড়ানোর অধিকার নেই। অর্থাৎ এই ঘৃণ্য হিন্দুত্ববাদীরা ও মুসলিম মৌলবাদীদের থেকে কোন অংশে কম নয়, তাই এদের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বস্তরে লড়াই সংগঠিত করতে হবে। উল্লেখ্য ভারতবর্ষে বৌদ্ধ, জৈন্য ও ইসলাম ধর্মের প্রসারের ক্ষেত্রে এই ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচার বহুঅংশে দায়ী।

বর্তমানে যে মোদী সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তাঁরা সুকৌশলে হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য এনআরসি, নাগরিকত্ব বিল ইত্যাদি আনার চেষ্টা করছে। বোঝাতে চেষ্টা করছে এতে মুসলমানদের শায়েস্তা করতে সুবিধা হবে, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি মিথ্যার প্রচার। এনআরসি ও নাগরিকত্ব বিল পাশ হলে দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের সব কাজ ফেলে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য লাইন দিতে হবে এবং শেষে দেশের নাগরিকত্ব হারাতে হতে পারে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা পৃথিবীর কোন দেশই এদের নাগরিকত্ব দেবে না। শুধুমাত্র অসমে 19 লক্ষ মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়নি এই মানুষ গুলির মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু সম্প্রদায় ভুক্ত, তাহলে প্রশ্ন হল এই মানুষ গুলির কি হবে? আদতে দেশে তীব্র বেকারত্ব, অর্থনীতির দুরবস্থা, দেশকে শিল্পপতিদের হাতে বিক্রি করার যে জঘন্য প্রয়াস চলছে; তার বিরুদ্ধে যাতে মানুষের আন্দোলন দানা না বাঁধে এবং এই সমস্যা গুলি থেকে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্যই এই কুনাট্য সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। ‘Divide and Rule Policy’ অর্থাৎ ভাগকর ও শাসন কর ইংরেজদের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিতেই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চলছে। তাই দেশের সমস্ত সমস্যাকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধু গোরক্ষা, রাম মন্দির, কাশ্মীর, পাকিস্তান, বালাকোট, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ইত্যাদি দেখানো হচ্ছে। প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বিদ্বজ্জনেরা দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখলে তাদের নামে দেশদ্রোহীতার অভিযোগে মমলা দায়ের হচ্ছে, এটাই কি ভারতের গণতন্ত্র? এটাই মোদীর ভারত? বস্তুত এই উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদ দেশের সামগ্রিক পতন ডেকে আনবে ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত শক্ত করবে।

এই বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলির জন্যই ভারতবর্ষকে দ্বীখন্ডিত হতে হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে মূলত তিনটি শক্তি ভারতে কাজ করছিল একটি জাতীয় কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি এরা ধর্মনিরপেক্ষ অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখতো। অন্যদিকে মুসলিম লীগ তাঁরা মুসলমানদের জন্য পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতো এবং হিন্দুমহাসভা হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্থান তৈরী করার চেষ্টা করে। পাকিস্তান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হয় এবং তাঁর কি পরিণতি হয় তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। অন্যদিকে, ভারতের এক বৃহৎ অংশের মুসলমানরা কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করেনি তাঁরা ভারতেই থেকে যায় তারা এক ধর্মান্ধ রাষ্ট্রে থাকার পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে ভারতবর্ষ এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রটি উপমহাদেশ তথা বিশ্বের কাছে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশ তথা বিশ্বের স্বার্থে এই ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। যদিও ভারতের বর্তমান শাসকদল তাঁরা এই দেশের চরিত্র বদলে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ পরিণত করতে চাই!

বিশ্বহিন্দু পরিষদের হিন্দুরাষ্ট্রের চিন্তার সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। তাঁর জীবনে ব্রাহ্মচর্য পরীক্ষা ইত্যাদির নামে ব্যক্তিগত কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলে ও এটা মনে রাখা প্রয়োজন দেশ যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উতপ্ত তখন তিনি স্বাধীনতার আনন্দে অংশগ্রহণ না করে কলকাতায় উপস্থিত হয়েছিলেন সেই অবর্ণনীয় ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধ করতে। গান্ধীজির প্রয়াসে কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গা রুখে যায়। তিনি বলেছিলেন ভারত ভাগ হবে তাঁর লাশের উপর দিয়ে। যদিও তিনি ভারত ভাগ রুখতে পারেন নি। তবে তিনি এটা বলেছিলেন- ‘ভারতবর্ষে কোন মুসলমান বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মাথা নিচু করে বুকে হেটে চলবে এটা তিনি কখনোই মেনে নিতে পারবেন না। ভারতে মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা মাথা উঁচু করেই চলবে, সেটাই তিনি চান’। প্রকৃতপক্ষে গান্ধীজির এরূপ চিন্তা চেতনার উপর ভিত্তি করেই আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষ গঠিত হয়েছে। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ দূর করা ও কোনও ভাবে যদি ভারতকে পুনরায় এক করা সম্ভব হয় সে বিষয়ে জিন্নার সঙ্গে কথা বলা। যদিও গান্ধীজির সে যাত্রা আর সম্পন্ন হয়নি। নাথুরাম গোডসে নামে এক হিন্দু মহাসভার সদস্য গান্ধীজির বুকে গুলি চালায়। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বলি হয়ে জাতির জনকের স্বাধীন ভারতে মৃত্যু হয়। অথচ আজ একশ্রেণীর মানুষ গোডসেকে দেশপ্রেমি বলে আখ্যায়িত করছেন। ইন্টারনেটে ‘গোডসে অমর রহে’ এরূপ শ্লোগান দেখা যাচ্ছে। আসলে এরা উগ্র হিন্দুত্ববাদী ও হিন্দুরাষ্ট্রের উদগ্র সমর্থক।

তাই সমস্ত শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে একত্রিত হতে হবে এবং এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে দূরীভূত করতে হবে। প্রকারান্তরে কেন্দ্রের শাসকদলের এই চরম সাম্প্রদায়িক নীতিগুলি, পশ্চিমবঙ্গের অপর এক মৌলবাদী তোষণকারী সাম্প্রদায়িক শক্তি ও দুনীর্তি পরায়ণ রাজ্য সরকারের হাত শক্ত করছে। আসলে দাদা ও দিদির এই বিচ্ছিন্নতাবাদী খেলায় জনগণ ‘বলির পাঁঠায়’ পরিণত হচ্ছে। তাঁদের এই কুনাট্য সম্পর্কে যত দ্রুত মানুষ সচেতন হবে ততই জনগণের মঙ্গল! এখন প্রশ্ন হল এই মৌলবাদী শক্তিগুলির কি হবে? এদের থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? মৌলবাদী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্ত সংগ্রামকে আরও বেগবান করতে হবে। বস্তুত আমাদের লেখনি পড়ে মানুষের মধ্যে দ্রুত চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ধর্মন্ধতা দূরীভূত হচ্ছে। এটাই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী লড়াই। কারণ এই মুক্তচেতনার মানুষরাই আগামী দিনের ‘সমাজ গড়ার কারিগরে পরিণত হবে’। সেইসঙ্গে সামাজিক দিক থেকে মানুষে মানুষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই দুর্গাপুজোর মতো উৎসব বিরাট ভূমিকা পালন করে। তাই আসুন সমাজের সর্বস্তরের শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষরা একত্রিত হন ও এই ধর্মন্ধতা, মৌলবাদ ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করি ও আগামীর জন্য যেন এক সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে পারি সেটাই কামনা করি!

(সকলকে শারদীয়ায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। সকলের মঙ্গল হোক সেটাই কামনা করি।)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of