মানুষ মারার রাজনীতি, রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী আচরণ।

এই হত্যা প্রথম নয়, এর আগেও একের পর এক নাস্তিককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মুসলিমরা উল্লাসে ফেটে পড়েছে, নাস্তিকরা মরলে কার কি? নাস্তিকদের এত বড় সাহস ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে, ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, মোহাম্মদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদেরকে এভাবেই হত্যা করা দরকার, জবাই করে ফেলা দরকার সব নাস্তিককে।

হুমায়ুন আজাদকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে, আপনারা আনন্দিত, পরে তিনি জার্মানির মিউনিখে নিজ ফ্ল্যাটে মারা গেছেন। আপনারা মুসলিমরা আরও বেশি আনন্দিত, ইসলামের জয় হয়েছে, এক নাস্তিকের বিদায় হয়েছে। হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করার জন্য রাজাকার সাঈদী সংসদে দাঁড়িয়ে সরাসরি উস্কানি দিয়েছে।

ইসলামিস্টদের আন্দোলনের মুখে লেখক তাসলিমা নাসরিন দেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীতে কোন সরকারই তাকে দেশে আসতে দেয়নি। এটাতেও রাজনীতিবিদ আর ইসলামিস্টরা খুশি। কয়েকবার কবি শামসুর রহমানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, এটাতেও মুসলিমরা আনন্দিত। একএক করে, অভিজিৎ, অনন্ত, নিলয়, ওয়াশিকুর, বাচ্চু, ফয়সাল সহ অসংখ্য লেখক-প্রকাশক ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে।

সেই হত্যাতেও রাষ্ট্র খুশি, রাজনীতিবিদরা খুশি, আওয়ামীলীগ খুশি, জামাত খুশি, জাতীয়পার্টি খুশি, হেফাজত মহাখুশি। মুসলিম তৌহিদী জনতার আনন্দের কোন সীমা নেই। রাষ্ট্রের কাছে নাস্তিকদের জীবনের কোন মূল্য নেই, আমাদের কলমের কোন মূল্য নেই, আমাদের চিন্তার কোন মূল্য নেই। আমরা নাস্তিক আমাদের হত্যা করা ফরজ, এই হত্যা ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে আমি একজন নাস্তিক হিসেবে আপনাদের বলে রাখি, আবরার নাস্তিক ছিলেন না, হয়তো মনে মনে আবরার নিজেও নাস্তিকদের হত্যাকে সমর্থন করেছে। তবে মুসলমানদের মতো আবরারের মৃত্যুতে আমরা আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়িনি। আমরা কোন মানুষের মৃত্যুতে আনন্দ-উল্লাস করিনা, আবরারের জন্য আপনার হৃদয়ে যতটুকু ব্যথা আমার হৃদয়েও ততটুকু ব্যথা, বরঞ্চ আপনার থেকেও আমার ব্যাথা বেশি। আবরারের কথা বলার অধিকার আছে, তার লেখার অধিকার আছে, তার চিন্তাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার আছে, সেটা ইসলামের পক্ষে, অথবা ভারতের বিপক্ষে, এমনকি নাস্তিকদের বিপক্ষে হলেও আমাদের কোন আপত্তি নেই, আমরা তার চিন্তার জগৎকে সমর্থন করি।

অন্ধকার কালো মেঘে বাংলার আকাশ ছেয়ে গেছে। মানুষ আর শান্তিতে বিশ্বাস করে না, মানুষের কাছে মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই, এই রাষ্ট্র একের পর এক পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছে। রাজনীতিবিদদের বুলেটের আঘাতে জর্জরিত হয়েছে অসংখ্য মানুষের হৃদপিণ্ড।

ভিন্নমতের মানুষ হলেই হত্যা, ভিন্ন দলের মানুষ হলেই হত্যা, ভিন্ন ধর্মের মানুষ হলেই হত্যা, ভিন্ন চিন্তার মানুষ হলেই হত্যা। হিন্দুদের বাড়িতে হামলা, বৌদ্ধদের বাড়িতে হামলা, হিন্দু মন্দিরে হামলা, বৌদ্ধদের মন্দিরে হামলা, ভিন্ন দলের মানুষের বাড়িতে হামলা। রাষ্ট্র একের পর এইসব কর্মকাণ্ডতে উস্কানি দিয়েছে। এই প্রথম কেউ একজন মারা গেছে ভারতের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, তবে এর আগে যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষে লেখার জন্য। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, মৌলবাদের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লেখার জন্য, মানুষের অধিকারের পক্ষে লেখার জন্য।

এই সকল হত্যার দায় রাষ্ট্রের, রাষ্ট্রকে এই দায় নিতে হবে, রাষ্ট্রই ছাত্রলীগের মতো উগ্র সন্ত্রাসীদের জন্ম দিয়েছে, রাষ্ট্রই হেফাজতের মতো উগ্র ধর্মান্ধদের জন্ম দিয়েছে, রাষ্ট্রই সর্বপ্রথম জঙ্গিবাদের বীজ বপন করেছে বাংলাদেশে, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা রাষ্ট্রীয় জঙ্গিরাই চালিয়েছে, বিএনপি সরকারের মদতে।

এই দেশ, এই পৃথিবী আপনার আমার সবার, সকল মানুষের এই পৃথিবীতে সমানভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কলম চালানোর জন্য আবরারের মত আর কোনো মানুষকে যেন জীবন দিতে না হয়। সকলের মাঝে শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of