রাষ্ট্র ছাড়েন, আপনি নিজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন?

গতকাল রাতে আমার একবন্ধু বললো, বাসায় আব্বু-আম্মু  ক্ষেপে আছে। জানতে চাইলাম কেন? সে জানালো আবরার কে হত্যার ঘটনায়, তারা নাকি হতাশ দেশে বাক-স্বাধীনতা নেই তাই। আমি বললাম “আমি হইলে বলতাম আগে বাসায় বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন”। আমি অন্তত এভাবেই আমার মাকে বলি এমন ইস্যু গুলোতে।

আচ্ছা বাংলাদেশে বাক স্বাধীনতা ছিলো কবে? এই যে এখন সবাই মিলে বলছে স্বাধীনতা নেই! স্বাধীনতা নেই! আমার প্রশ্ন হলো বাক স্বাধীনতা আদৌ কি কখনো ছিলো? যখনই আমার কোনো কথা কারো ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগে, তখনই সে আমাকে প্রত্যাখ্যান করে, আমাকে আঘাত করে, আমার ক্ষতি করতে উদ্যত হয়। এটাই বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র।

পরিবার হলো আমাদের প্রাথমিক ও মূল বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠন গুলো তো আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেয়, কিন্তু নৈতিক যে শিক্ষা তা কোনো কোর্সে বা কোনো বইতে প্রদান করা হয়না। নৈতিকতা কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয় যে একে পড়ে মুখস্ত করে মাথায় নিতে হবে। নৈতিকতা হলো চর্চার বিষয়। এই চর্চাটাই আমাদের পারিবারিক পরিমন্ডল থেকে শুরু করতে হবে। আজকে রাষ্ট্র আপনার বাক স্বাধীনতা হরণ করছে বলে যে ক্রোধ আপনার মধ্যে জমছে তা নিতান্তই হাস্যকর। কারন স্বৈরাচারীতা আতুরঘর আমাদের নিজস্ব ঘর, ঘর থেকে তা সমাজে, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে বা জাতীয় পর্যায়ে।

০১.

আমাদের পরিবার গুলো সাধারণত পিতৃ প্রধান, যেখানে পুরুষ একক ভাবে সকল আয়রোজগার করেন, যেহেতু তিনি রোজগারের একমাত্র উৎস সেহেতু তিনি ধরেই নেন তার কথা উপর, তার মতামতের উপর, তার করা নিয়মের উপর কেউ ভাবতে পারবে না, কথা বলতে পারবে না, কোনো মন্তব্যও করতে পারবে না। এই যে একটা স্বেচ্ছাচারিতা, এটার পিছনে কিন্তু তার সহধর্মীনি তথা নারীর অবদানও কম নয়। নারী নিজে স্বনির্ভর না হয়ে স্বামীর উপর নির্ভরশীল তাই, স্বামীর করা নানান অন্যায়কে মুখ বুঝে সহ্য করেন। এবং শুধু তিনি নন, তার যে সন্তানরা আছে, তাদেরও এই স্বেচ্ছাচারীতাকে মানবার জন্য উৎসাহিত করেন, বাধ্য করেন।

এরপর আসেন সেই পরিবারের সন্তানের বিষয়। একটা শিশু যখন বড় হয়, তার বুদ্ধিমত্তার বিকাশ হয় তখন সে দেখে একজন মানুষ থাকবে, যার উপর সবাই নির্ভশীল থাকবেন, তিনি সকল নিয়ম বিধান করবেন, তিনিই সকল শাস্তি দিবেন, তিনি রাগ দেখাবেন। সেই মানুষের একজন সাহায্যকারী থাকবে, যে নিজেও সেই মানুষদ্বারা নির্যাতিত। সেই সাহায্যকারী ওই স্বেচ্ছাচারী মানুষটির সব কিছুতে সাহায্য করবে এবং যদি কেউ স্বেচ্ছাচারীতার বিরুদ্ধে কিছু বলতে চায়, তবে তাকে রুখে দিতে হবে। যে কথা বলতে চাইবে, তাকে ভয় দেখাতে হবে, তাতেও যদি প্রতিবাদী মানুষটিকে থামানো না যায়, তবে তার উপর প্রথমে সাহায্যকারী নিজে বল প্রয়োগ করবে, এবং পরবর্তীতে স্বয়ং সেই স্বেচ্ছাচারী মানুষটিই প্রতিবাদীকে নিবৃত করতে সচেষ্ট হবে। যদি নিবৃত করা না যায়, তাকে পরিবার হতে বহিষ্কার করা হবে, তার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে নিয়ে যেতে হবে।

উপরের দুই প্যারায় যা লিখলাম তা কিন্তু আসমান থেকে পেড়ে নিয়ে আসা কোনো ভাবনা নয়। এটাই বাস্তব। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখনো এই বাস্তবতাই বিদ্যমান। এবার পারিবারিক পরিমন্ডলে ঘটা এই স্বেচ্ছাচারীতার ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রয়োগ করুন ফলাফল দেখবেন মিলে গেছে। আরে তাই তো যা আমাদের পরিবারে আমরা চর্চা করি, তাই রাষ্ট্রীয় ভাবে চর্চা হচ্ছে! তাহলে পাথর্ক্য বলতে কিছু তো নেই, তবে কেন রাষ্ট্র করলে আমরা এতো হতাশ, বিক্ষুদ্!, আর নিজেরা করলে তা শাষণ, সন্তানের ভালোর জন্য, পরিবার রক্ষার অযুহাতে জাস্টিফাই করেন?

 

০২.

আজকে যারা ছাত্রলীগ করে, যারা ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির করতো এরা তো কোনো আগুন্তক না! আমাদের সমাজে, আমাদের সাথেই মিলে মিশে এরা বেঁচে আছে, তবে এরা কেন এমন ফ্র্যাংকেস্টাইন হচ্ছে তা নিয়ে কখনো ভেবে দেখেছেন? কোথায় পাচ্ছে এই অসহিষ্ণুতার শিক্ষা? কিংবা রাষ্ট্রইবা এতো অসভ্য আচরণ কেন করছে? যারা সরকার চালাচ্ছে তারাই বা কোন গ্রহ থেকে এসেছে এরাও তো আমাদেরই সমাজের অংশ! তাহলে এরা কেন বাক স্বাধীনতাকে গ্রহন করছে না! কেন তারা এমন স্বেচ্ছাচারী মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে? এরা কি তবে নিজের স্বার্থকে রক্ষার জন্য, কোনো প্রভুকে খুশি করার জন্য এমন বর্বর আচরণ করছে?

রাষ্ট্রের উপর যে ক্ষোভ ছাত্রসমাজ আজকে প্রকাশ করছে, তারা একটু অকপট হয়ে ভাবুক, এই ছাত্র সংগঠন গুলোকে এমন নৈরাজ্যের শিক্ষাটা নিজের পরিবার থেকে পেয়ে আসিনি? বাংলাদেশের পরিবার গুলো এককেটা স্বৈরাচারী মতবাদে চলে, আর দেশের মানুষ রাষ্ট্রটা চায় গনতান্ত্রিক!

একটা শিশুকে তার বাল্যকাল থেকে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে

  • কিভাবে পরমত অসহিষ্ণু হতে হবে;
  • কি উপায়ে ভিন্নমত দমন করতে হবে;
  • কি প্রকারে ভিন্নমত পোষনকারী কে শাস্তি দিতে হবে;
  • স্বৈরাচারী হলে কি কি সুবিধা ভোগ করা যায়;
  • স্বৈরাচারীর সাহায্যকারী হলে কি সুবিধা পাওয়া যায়; ইত্যাদি।

এই শিক্ষা প্রাপ্ত কোনো শিশু তার পরিনত বয়সে গিয়ে হঠাৎ করে বিশাল গনতান্ত্রিক ধারনা পোষন করবে, মহৎ হয়ে যাবে এমন ভাবার কোনো একটা কারন কি আছে? আজকে রাষ্ট্রের এই স্বৈরাচারী আচরণের আসলে কেন্দ্রবিন্দু তো এই পরিবার গুলোই। তাই নয় কি?

 

৩.

১৯৯৪ সালে ভিন্নমত পোষনের অভিযোগে বাংলাদেশ ছাড়া করা হয়েছিলো নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো, তিনি সমাজের প্রচলিত মতবাদের বিরুদ্ধে লিখছেন, তিনি ধর্মের বিপক্ষে লিখছেন। ব্যাস শুরু হয়ে গেলো আন্দোলন, তার বিরুদ্ধে মামলা, হামলার চেষ্টা। রাতের আঁধারে তাকে ধরে বিমান বন্দরে নিয়ে গিয়ে বলো দেশ থেকে বেরহ হারামজাদি। সবাই খুশি হয়েছিলো এই ঘটনায়। নাস্তিক, বেশ্যা, বেজন্মা ইত্যাদি ট্যাগ গুলো তো কোনো সরকারী প্রতিষ্ঠান দেয় নি? আপনারাই দিয়েছিলেন। কি হয়েছিলো তসলিমার নির্বাসনে? কারো কোনো ক্ষতি হয়েছে? বরং অধিকাংশই খুশি হয়েছে। কিন্তু আসলে কি হয়েছে এখন বলি শোনেন, রাষ্ট্র একটা বীজবুনে ছিলো সেই ঘটনায়, কেউ তার লিখনিতে ভিন্নমত প্রকাশ করলে, কিভাবে তাকে শায়েস্তা করতে হবে তার। তসলিমার পরে, অনেক ব্লগার হত্যা হয়েছে বাংলাদেশে তাদের মত প্রকাশের দায়ে, তখনও দেশের আমজনতা ঘটনা গুলোকে জাস্টিফাই করলো, কারন তারা নাস্তিক ছিলো!

একটা মানুষ তার নিজের মতামত প্রকাশ করতেই পারে, তার দাবীর স্বপক্ষে যুক্তিতর্ক উত্থাপন করতে পারে, কিন্তু তাই বলে কাউকে হত্যা করা, তার উপর আঘাত করা কোনো ভাবেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এই সত্যটা উপলব্ধি করতেই বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ সময় নষ্ট করেছে। কিন্তু আজকেও তারা মনে করে কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে তার শাস্তি হতে হবে।

 

০৪.

এখন আসুন, ধর্মের জাগায় আওয়ামী লীগকে বসান আর ধর্মানুসারীদের জাগায় আওয়ামী লীগার গুলাকে ভাবেন। পার্থক্য কি? ধর্মানুসারীরা যেমন ভাবে যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললেই কাউকে হত্যা করা, তাকে নির্বাসিত করা, তাকে জেলে অন্তরীন করা উচিত, তেমনি ওই ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগ ও তাই মনে করে, সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে কাউকে হত্যা করা, গুম করা, তাকে নির্বাসিত করা, তাকে জেলে অন্তরীন করা উচিত। আচ্ছা যদি কেউ সরকারে বিরুদ্ধে কথা বলে আর যদি সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেয় তবে তো সে নিষ্কৃতি পেয়ে যাচ্ছে, তার আর কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু যারা ধর্মে বিশ্বাস করেন, তারা তো বিশ্বাস করেন স্বর্গ-নরকে। তো যারা ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তাদের তো নিষ্কৃতি পাবার কোনো সুযোগ নেই! তাদের তো শাস্তি পেতেই হবে। তাহলে কেন তাদের কে এখন শাস্তি দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগেন ধার্মিকরা!

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা কখন ক্ষেত্রে বিশেষে প্রযোজ্য আর ক্ষেত্রে বিশেষে পরিত্যার্জ তা হতে পারে না। সত্যি যদি চান যে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক, বাক-স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকুক তবে এই আস্তিক-নাস্তিকের কুতর্ক ছেড়ে, হাতে হাত রেখে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করুন। কেউ ভিন্নমত পোষন করতেই পারে, তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝান। কিন্তু তার উপর কোনো আঘাত, অন্যায়কে জাস্টিফাই করতে যাবেন না কোনো ট্যাগ দিয়ে, এখন সে হোক নাস্তিক, শিবির বা একজন হত্যা কারী।

মনে রাখবেন কেউ একজন মানুষ হত্যা করলো বলে তার মানবাধিকার নিয়ে কথা বলার অধিকার নাই এমন ভাবনা যেদিন থেকে আপনি ভাবতে শুরু করবেন, সেদিন থেকে আপনি নিজেও একজন স্বৈরাচারী।

 

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of