অবাক গনতন্ত্রের দেশ

”গনতন্ত্রের সূচনাই হয় বাকস্বাধীনতায়। বাকস্বাধীনতার মূল কথা হচ্ছে আপনি যা শুনতে চান না, আমার তা বলার অধিকার।” [হুমায়ুন আজাদ]

আপনার দেশটি যদি গনতান্ত্রিক হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই আপ‌নি সরকারের যে কোন ধরণের সমালোচনা করতে পার‌বেন; এক্ষেত্রে সমালোচনা কার করবো, কীসের করবো, তা ঠিক করে দেয়ার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। যদি সমালোচনা করার অধিকারকে রাষ্ট্র কোন ব্যক্তির স্বার্থকে রক্ষা করতে গিয়ে হরণ করে, তবে রাষ্ট্রটি আর গনতান্ত্রিক নেই।

আবরার নামের সচেতন একজন শিক্ষার্থী সমালোচনা করেছেন রাষ্ট্র কতৃক গৃহীত চুক্তিসমূহের। তিনি তার লেখনীতে তার যুক্তি-তর্ক তুলে ধরেছেন, ’চুক্তিগুলি দেশের স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করেছে’; এই সমালোচনা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের গৃহীত চুক্তিগুলোর সমালোচনার জন্যে যেভাবে তিনি প্রাণ দিলেন, যে উপায়ে তিনি প্রাণ দিলেন, এর দায় সরাসরি বর্তায় রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন দলটির প্রধানের ওপর।

কোন রাজনৈতিক দল যখন যেনতেন উপায়ে রাতের আঁধারে সংসদ দখল করে, তখন তাদের নৈতিক ভিত্তি সর্বদাই থেকে যায় ভঙ্গুর, দলের সংগঠনগুলি হয়ে যায় বিশৃঙ্খল, নৈতিক বুদ্ধি থেকে বিচ্যুত হতে থাকে নিয়মিত। নৈতিক অবস্থান হারানো মানুষেরা জানোয়ারের চেয়েও ভয়ংকর হয়; লাঠি ছুরি, চাপাতি সবকিছুর ব্যবহার চলতে থাকে এক সাথে। সংসদে নতুন নতুন আইন জুড়ে দেয়া হয় এবং দেশের মানুষের বাক স্বাধীনতার হরণ করা হয় নির্লজ্জ উপায়ে। অথচ, “এই সংসদ কোন ঐশ্ব‌রিক ভবন নয়, সেখা‌নে যারা যায় তারাও দেব‌দূত নয়; আর যা কিছু দ‌লের সবাই মি‌লে গ্রহণ ক‌রে, দা‌মি কাগ‌জে ছে‌পে দি‌লেই তা সং‌বিধান হয় না। সং‌বিধান হ‌চ্ছে ব্য‌ক্তির স্বাধীনতার দ‌লিল; সংস‌দের দা‌য়িত্ব ওই দ‌লিল প্রণয়ন করা। য‌দি কো‌নো সংসদ ব্য‌ক্তির স্বাধীনতা অপহরণ ক‌রে, ত‌বে সে সংসদ বিশ্বাসঘাতক; য‌দি কো‌নো সং‌বিধান ব্য‌ক্তি‌কে পীড়ন ক‌রে, ত‌বে সে‌টি নি‌ষিদ্ধ পুস্তক।” [হুমায়ুন আজাদ]

কাজেই ক্ষমতার চেয়ার দখল করে রাখতে গিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীনদের একের পর এক যে জঘণ্য ইতর কর্মের সাক্ষী হচ্ছে আদরের এই বাংলাদেশ; তাতে এই দেশের জনগন আজ চূড়ান্তভাবে ক্ষুব্ধ (অনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যতীত)।

ইতিহাস সাক্ষী, এই দেশের যে কোন প্রকারের স্বৈরাচার দমনে সামনে থেকেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা; ইতিহাসের স্বৈরাচারদেরকে ঘাড় ধরে টেনে হিঁচড়ে রাজপথে এনে ছেড়ে দিয়েছে এই শিক্ষার্থীরাই।স্বৈরাচার দমনের প্রক্রিয়ায় সমালোচনায়, স্লোগানে, বিদ্রোহে বারবার মুখর হয়ে উঠেছে ঢাকার রাজপথ।

স্বৈরাচার আসে যায়; অবশ্য এর প্রধান সুবিধাভোগী হয়ে রয় আমলা সেনাপতিরা, নতুন করে বলার মতো কোন বিষয় এটা নয়। কিন্তু আজ আমলা সেনাপতিরা এতটাই সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে যে, প্রচণ্ড লোভে তাদের জিভ এতটাই লকলক করছে যে, মুখোশের নিচে থাকা অবাক গনতন্ত্র তার শিক্ষার্থী সন্তানদেরকে হত্যা করার পরও বোধের উন্মেষ ঘটছে না কিছুতেই! তাদের মগজে বুদ্ধিতে স্থান পাচ্ছে না, কোথায় যাচ্ছে এত কষ্টের, এত সাধের, এত মায়ার, এত ভালবাসার এই লাল সবুজের বাংলাদেশ।

আমরা দেখেছি, প্রতিটি ইতর কর্ম সম্পাদন করার পর ক্ষমতাসীনদের চেষ্টা থাকে যে, কোন না কোন উপায়ে জনগনের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া। এমন কিছুরই কি মঞ্চস্থ হয়ে গেল অাবার? একদিকে একচেটিয়া দেশবিরোধী বৈদেশিক চুক্তির পসরা, অন্যদিকে জুয়াড়ি সম্রাটকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেরী করে চুক্তির এই সময়টাতে আটক দেখানোর ঘটনাটি আমাদের কাছে চাতুর্যপূর্ণ বলেই অনুভূত হয়েছে।

গনমাধ্যমকে ব্যস্ত রেখে, দেশের জনগনের চোখে কতটা ধুলো দেয়ার ফন্দি করেছিল এই ’অবাক গনতন্ত্র’ তা এখন আর মুখ্য নয়; মুখ্য বিষয় হচ্ছে, চোখে ধুলো জমার আগেই আবরার নামের শিক্ষার্থী ক্ষমতাসীনদের জঘণ্য বর্বরতায় তার জীবন দিয়ে জানান দিয়ে গেল যে, ‘অবাক গনতন্ত্র’ তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার বাসনায় তোমাদের দেশের সম্পদ তোমাদেরকে ঘোরতর ফাঁকি দিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে!

 

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of