আবরারের মৃত্যু, আলোচনা সমালোচনা, প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক।

আবরার কি সত্যিই মেধাবী? হ্যাঁ অবশ্যই মেধাবী!

মেধাবী না হলে এত ভাল ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হতো না। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে এটা কি দোষের কিছু? অবশ্যই না, মেধাবী হলেই যে নাস্তিক হতে হবে এমন কোন কথা নেই। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল তিনিও প্রচুর মেধাবী ছিলেন, তিনিও কিন্তু ধার্মিক ছিলেন।সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, নিউটন, এরা সবাই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। তবে তাদের সৃষ্টিশীলতা এবং কর্মে ধর্মের কোনো প্রভাব পড়েনি।

নাস্তিক্যবাদ পুরোপুরি ভিন্ন এক মতাদর্শ। কেউ চাঁদে গেলেই তাকে নাস্তিক হতে হয় না, কেউ নাসায় কাজ করলেও তাকে নাস্তিক হতে হয় না, যে কেউ যেকোনো সময় যেকোনো কিছু আবিষ্কার করতে পারে, তার জন্য তাকে নাস্তিক হতে হবে না। রাস্তার পাশে গ্যারেজে ময়লা আবর্জনার মধ্যে গাড়ি মেকানিকের কাজ করে সেও কিন্তু ছোটখাটো ইঞ্জিনিয়ার, সে ইঞ্জিনিয়ার হয়তো জানেই না নাস্তিক বলে এই পৃথিবীতে কিছু আছে। বুয়েটে পড়লেই তাকে নাস্তিক হতে হবে, তা না হলে তাকে মেধাবী বলা যাবেনা, এই দর্শনের কোন ভিত্তি নেই।

সবাই সবকিছু জানে না, সবাই সবকিছু করতে পারেনা, সবার দ্বারা সব কিছু করা সম্ভবও হয়না। তসলিমা নাসরিন নারীবাদ বিষয়ক অসংখ্য বই লিখেছে। ধর্মান্ধতা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তার অসংখ্য লেখা পাওয়া যায়, কিন্তু তার মাথার উপরে ঘুরতে থাকা পাখাটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলে, তাকে অবশ্যই মেকানিকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, হয়তো তার দ্বারা পাখা ঠিক করা কখনোই সম্ভব হবে না। কেননা এ বিষয়ে সে অভিজ্ঞ না, এই বিষয়ে তার কোনো মেধা নেই।
একেক মানুষ একেক জায়গায় মেধাবী, কেউ গাড়ি চালাতে পারে, কেউ কম্পিউটার, কেউ শিল্পী, কেউ ভালো অভিনয় করতে পারে, কেউ ভালো লেখালেখি করতে পারে, কেউ ভালো নাচতে পারে, কেউ রাজনীতির ময়দানে গুছিয়ে সুন্দরভাবে বক্তৃতা দিতে পারে, কেউ ভালো রান্না করতে পারে, কেউ বিমান চালাতে পারে, কেউ বিমান তৈরি করতে পারে, এরা সবাই একেকজন একেক জায়গায় মেধাবী। এই জ্ঞান অর্জনের জন্য কাউকে নাস্তিক হতে হয় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও মেধাবী ছিলেন, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু তিনিও ছিলেন ধর্মান্ধ, কথায় কথায় তিনি ইনশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে বেড়াতেন, তিনি তার ৭ই মার্চের ভাষণে বলেছেন, আমি মুসলমান, আমি বাঙালি, মুসলমান একবার মরে, বারবার মরে না। কিন্তু তবুও তার পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয়েছে, কেননা ধর্মের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামের কোন সম্পর্ক নেই। তসলিমা নাসরিন বুয়েটে পড়াশোনা করেননি, তিনি ডাক্তারি পড়াশোনা করেছেন, অনেক এমবিবিএস ডাক্তারকে দেখা যায় কাজের ফাঁকে কোরআন শরীফ পড়তে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে, কালো কাপড়ে নিজেকে ঢেকে রাখতে, মুখ ভর্তি দাড়ি, আর মাথায় টুপি, গায়ে পাঞ্জাবি লাগিয়ে হুজুর হয়ে যেতে। তারাও কিন্তু মেধাবী, সিকিৎসা শাস্ত্রে তারা মেধাবী, তারা অনেকেই হয়তো ডারউইনের বিবর্তনবাদ এর নামই শোনেনি। চিকিৎসা শাস্ত্রে ডারউইনের বিবর্তনবাদ কোন কাজে আসে না, তাই তাদের জানার দরকার হয়নি। জ্বরের কি ওষুধ, সর্দির কি ওষুধ, কাশির কি ওষুধ, কোথায় কিভাবে কাটলে কত সেলাই করতে হবে, টিউমার কিভাবে বের করতে হবে, এগুলো জানাই ডাক্তারের কাজ। প্রাণী জগতের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে, মহাবিশ্ব কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, বিগ ব্যাং কাকে বলে এগুলো না জানলেও ডাক্তারের চলবে।

তসলিমার লেখার যুক্তিখন্ডন করতে গিয়ে আসিফ মহিউদ্দিন বলেছেন, সবার মত প্রকাশের অধিকার আছে। অবশ্যই সবার মত প্রকাশের অধিকার আছে, মত প্রকাশের বিরোধিতা করা কখনই উচিত না, কিন্তু এই আসিফ মহিউদ্দীন একটা গ্রুপ তৈরি করে, ব্লগার সোলারিন আলেকজান্ডারকে দীর্ঘমেয়াদী ফেসবুক থেকে নিষিদ্ধ করেছিল, যেটা নিতান্তই হাস্যকর, সেই আসিফ মহিউদ্দীনই অন্যের মত প্রকাশের পক্ষে কথা বলে। ফেসবুকে কে কি লিখবে, কি লিখবে না সেটা ডিসাইড করার ক্ষমতা আসিফ মহিউদ্দিনের নেই, সেই দায়িত্ব আসিফ মহিউদ্দিনকে কেউ দেয়নি। এটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একমাত্র ফেসবুকেরই রয়েছে।

পৃথিবীর সকল বিশ্বাসই অপবিশ্বাস, বিশ্বাস বলতে এই পৃথিবীতে কিছু নেই। কেউ একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস করবে, এটা কোন অন্যায় না। তবে ঈশ্বরের বিশ্বাসেও মাঝেমাঝে ভয়াবহতা দেখা যায়। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, আপনাকেও আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে হবে, যদি না করেন তাহলে আপনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, জোর করে হলেও আপনাকে বিশ্বাস করিয়ে ছাড়বো ঈশ্বর আছে, আর আমাদের ঈশ্বরই একমাত্র ঈশ্বর, ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের এইরকম উগ্র আচরনই দিনদিন এই শান্ত পৃথিবীটাকে অশান্ত করে তুলেছে। তাই এই বিশ্বাসকে আমি ঘৃণা করি।

মেধাবী এবং মানবিক দুটো আলাদা বিষয়, বুয়েট সহ বাংলাদেশের সবকটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড়বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই মেধাবীরা পড়াশোনা করে, তবে তারা সবাই মানবিক না। কোথাও কোনো মানুষ মারা গেলে আপনার কষ্ট লাগে, মানুষ হত্যা আপনি কখনো সমর্থন করেন না, তারমানে মানুষের পক্ষে আপনি মানবিক। কিন্তু বাসায় এসে ঠিকই আপনি গরুর মাংস খাচ্ছেন, মুরগির মাংস খাচ্ছেন, নিজেও পশু হত্যাকে সমর্থন করেন। তাহলে বুঝতে হবে পশুদের কাছে আপনি অমানবিক।

বুয়েটে যারা পড়াশোনা করে তারা সবাই মেধাবী, একজন মেধাবী ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, তার জন্য আপনারা সবাই আন্দোলন করতেছেন, আপনাদের ভুলে গেলে চলবে না, যারা হত্যা করেছে তারাও কিন্তু বুয়েটের ছাত্র, তারাও মেধাবী তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। একজন মেধাবীর জন্যে তো আর ১০ জন মেধাবীর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না, তাই নয় কি? আমি মৃত্যুদণ্ডকে কখনোই সমর্থন করিনা, সবারই সমানভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তবে অপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার, মৃত্যুদন্ড ছাড়াও অনেক ভাবে মানুষকে শাস্তি দেওয়া যায়। মৃত্যুদণ্ড খুবই নিম্নমানের একটি শাস্তি, যাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় সে বেঁচে যায় তার জন্য কষ্ট পেতে হয় পুরো পরিবারকে, একটা পিপড়ার জীবন আর মানুষের জীবনের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের পায়ের নিচে চাপা পরে প্রতিনিয়ত অসংখ্য পিপড়া মারা যাচ্ছে, যখনই আমরা দেখতে পাই আমরা একটা পিপড়াকে হত্যা করেছি, তখনই আমরা কষ্ট অনুভব করি। ঠিক একইভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ফেললেই তো সব শেষ। তাদের বাঁচিয়ে রেখে অনুশোচনায় ভোগার সুযোগ করে দেওয়া উচিত, এটাই হবে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি।
আমি মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে, এবং যাবজ্জীবন সাজার পক্ষে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − = 70