জলজ্যোৎস্নার স্বয়ম্বরা (১ম পর্ব)

জলজ্যোৎস্নাকে অনার্স প্রথম বর্ষে ভর্তি করাতে বরিশাল আসতে হয়েছে আমাকে। অর্থশাস্ত্রে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে সে বরিশাল বিএম কলেজে। জলজ্যোৎস্না হচ্ছে আমার গাঁয়ের মেয়ে! যদিও নদী ভাঙনের কারণে গ্রামটি ভাগ হয়ে অপর একটি চরে বসতি গড়েছে তার দরিদ্র পিতা। জলজ্যোৎস্না হচ্ছে মগন জলদাসের কন্যা। ওর মা জ্যোৎস্নারানী দাস কাজ করতো আমার মায়ের তত্ত্বাবধানে তার নিজ ঘরে। কন্যা ইন্দু জলদাসের বয়স ৬/৭ বছর হলেও, স্কুলে না গিয়ে সে ঘুরঘুর করতো তার মায়ের সাথে আমাদের বাড়িতে। বিষয়টি মায়ের চোখে পড়লে মা মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে বললে জ্যোৎস্নারানী দাস ঠোঁট উল্টে মাকে বলেছিল

– কিভাবে স্কুলে পাঠাবো কন? বইখাতা, জামা কাপড় দরকার! আমাদের গরিবদের কি ওসব আছে?

শুনে আমার মা-ই একদিন তাকে নতুন ফ্রক আর হাফপ্যান্ট কিনে দিয়ে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করান। সেই থেকে জ্যোৎস্নারানীকন্যা ইন্দু জলদাসের কলম খাতা, জামা কাপড় জোগানের দায়িত্ব ছিল আমার মায়ের। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন এ কাজ করতেন তিনি নিয়মিত। মা মারা যাওয়ার পর ইন্দুর পড়ালেখার দায়িত্ব নেই আমি। মায়ের মত তার বইপত্র, জামা কাপড় আর স্কুলের বেতনাদি আমিই পরিশোধ করতে থাকি নিয়মিত। নবম শ্রেণিতে বোর্ডে নাম রেজিস্ট্রশনের সময় ইন্দু জলদাসের বদলে তার নাম বদলে রাখি আমি “জলজ্যোৎস্না”। এটি আমার দেয়া নাম। ইন্দুর খুব পছন্দ হয়েছে নামটা। একদিন গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে বৃষ্টিতে ভিজে ইন্দু তার রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেখাতে আসে আমায়। হাসতে হাসতে বলে

– দাদাভাই, আমার নামটা খুব সুন্দর প্রিন্ট হয়েছে। আপনার দেয়া নাম কিন্তু। দেখুনতো ইংরেজি বানানটা ঠিক আছে কিনা!

:

জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখে পাঠ্য বইয়ের বাইরে নানাবিধ বই কিনে পাঠাই জলজ্যোৎস্নাকে। কারণ তার মধ্যে একটা সাহসীভাব আর দ্রোহ লক্ষ্য করি আমি। আমার পড়া হয়েছে এমন প্রায় সব বই ঢাকা থেকে পাঠিয়েছি তাকে। বলেছি তুমি পড়ার পর গাঁয়ের অন্য ছেলে বা মেয়েকে দেবে, যারা পড়তে চায়! বিশ্বের মুক্তিকামী নারীদের মুক্তির গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হতে চায় মেয়েটি। তাই বেগম রোকেয়া, মাদার তেরেসা, হেলেন কেলারের মত হতে চায় সে। পরবাসী তসলিমা নাসরিনের মারাত্মক ভক্ত এই গেঁয়ো মেয়েটি যার নাম জলজ্যোৎস্না! পড়ালেখা ছাড়াও নৌকা বাওয়া, মাছধরা, হালচাষ, জলতোলা, ধানকাটাতে বেশ পারদর্শী এ মেয়েটি। তবে আমার ইচ্ছেমত পড়ালেখায় খুব মেধাবি নয় মেয়েটি। বরাবর মাঝারি রেজাল্ট করে সে। তার একান্ত ইচ্ছে, অনার্সে ভর্তির সময় আমি যেন বিএম কলেজে থাকি তার কাছে, নিজ হাতে ব্যাংকে টাকা জমা দেই ব্যাংকে। এবং শেষে অধ্যক্ষ বা বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে যেন তার ব্যাপারে একটু বলে দেই, যাতে তার প্রতি সবার “নেক নজর” থাকে।

:

ভর্তির সকল কাজ শেষ হলে গাঁয়ের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা বলে জলজ্যোৎস্না। আমাকেও গাঁয়ে যেতে অনুরোধ করলে শহরে বোনদের সাথে দেখা করার কথা বলে থেকে যাই আমি। তারপরো আব্দার করে তাকে যেন লঞ্চে তুলে দেই আমি। কিন্তু তাকে পথের পাশের ভাসমান হোটেলে ভাত খাইয়ে একাই চলে যেতে বললে কিছুটা মনক্ষুন্ন হয়ে সে। তখন সাহস দেয়ার জন্য তাকে বলি

– আমি যদি তোমাকে তুলে দেই লঞ্চে তবে স্বাধীন দ্রোহি নারী ক্যামনে হবা তুমি? বরং পথে কোন ছেলে তোমাকে টিজ করলেও কিছু বলবো না আমি। দেখি, কিভাবে ওটা মোকাবেলা করতে পারো তুমি একাকি। এসিড টেস্ট তোমার!

আমার কথায় হাসি ফোটে জলজ্যোৎস্নার মুখে। হেসে দৃঢ়তায় বলে

– থ্যাংকু বস। তো যাই?

হাত নেড়ে বললাম

– যাও, রিক্সায় না গিয়ে বরং হেঁটে যাও। তাতে শরীর ভাল থাকবে প্লাস টাকা বাঁচবে।

– যাবো?

– হ্যাঁ যাও!

– কিন্তু নেটের টাকাটা কে দেবে শুনি? ইন্টারনেট চালাতে কে বলেছে?

জলজ্যোৎস্নার কাছে লজ্জা পেয়ে বলি

– আমিই বলেছি। কিন্তু টাকা দেব তাতো বলিনি।

– বাবার যে অবস্থা তার কাছে নেটের টাকা চাইতে পারবো না আমি।

– কেন তোমার টিউশানির টাকা?

– ৩টা ছাত্রকে পড়িয়ে পাই ছশ টাকা। তাকি আমার খরচে লাগেনা? এই যে লঞ্চে বরিশাল এলাম, তার টাকাটা কে দিলো?

– থাক রে বাবা আর বলতে হবেনা, এই নাও দুশ টাকা নেটের জন্য। ঢাকা গিয়ে প্রতিমাসে নেট ভরে দেব আমি। এবার ঠিক আছে?

– ‘ওকে বস’ বলেই লঞ্চস্টেশনের দিকে পা বাড়ালো আঠারো উনিশ বছরের গ্রাম্য মেয়ে জলজ্যোৎস্না। বিপরীত দিকে আমি হাঁটা শুরু করলাম সিএন্ডবি সড়কে বোনের বাড়ি যেতে। যেখানে বোন রান্না করে অপেক্ষা করছে আমাকে খাওয়াতে!

:

দুদিন পর গাঁয়ের বাড়ি গেলে লঞ্চঘাটে জলজ্যোৎস্না আর তার বাবার সাথে দেখা। বাবা মেয়ে আমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে ঢুকলো আমাদের বাড়িতেই। বৃদ্ধ মগন জলদাস আমার বেশ পরিচিত। মা থাকতে নিয়মিত মাছ ধরে দিতেন আমাদের পুকুর আর খালের। এখন বয়স হয়েছে, তাই মাছ ধরার কাজে ইস্তফা দিয়েছেন অনেক বছর হলো। বাড়িতে ঢোকার আগে বড় রাস্তায় চোখের দিকে চেয়ে বললাম

– কাকা কি আমাকে কিছু বলবেন?

কাঁপা কাঁপা গলায় মগল বললেন

– তাই বলতেই তো তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম লঞ্চঘাটে। চলো বাড়িতেই গিয়েই বলি।

মগন দাস কন্যার বিয়ের কথা বললেন

– পিরোজপুরের হিন্দু নারকেল ছোবড়ার ব্যবসায়ী পল্টু দাসের ছেলে রবীন দাসের জন্য প্রস্তাব এসেছে। পাপোস কারখানায় নারকেলের ছোবড়া সাপ্লাই দেয় ছেলের পরিবার। যৌতুক তেমন চায়না। আবার ইন্দুর পড়ালেখাও চালু রাখবে বলেছে তারা। আমি গরিব মানুষ। এর চেয়ে ভাল প্রস্তাব কি আর আসবে?

আমি সম্মতিসূচক কথা বলার আগেই জলজ্যোৎস্না কথা ছিনিয়ে নিল আমার মুখ থেকে। মুখ লাল করে বললো

– অপরিচিত ছেলে বিয়া করুম না দাদাভাই।

গাঁয়ের পরিচিত ৫/৬-টা মেয়ের উদাহরণ দিল সে। যারা বিয়ের পর নানাভাবে অত্যাচারিত হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে এসেছে কিংবা মুখ বুজে নানাবিধ অত্যাচার সহ্য করে এখনো বর্বর স্বামীর ঘর করছে। জ্ঞানী দার্শনিকের মত বললাম

– এটাই বাঙালি নারীর ভাগ্যলিখন জ্যোৎস্না। তুমিতো এ গাঁয়েরই মেয়ে।

নানাবিধ তর্ক জুড়ে দিলো জলজ্যোৎস্না আমার সাথে। দৃঢ়তায় বললো

– পূর্ব পরিচয় নিজ পছন্দ ছাড়া কখনো বিয়ে করবোনা আমি কাউকে। বাবা আমার খরচ না দিলে শহরে টিউশানি করে থাকবো আমি।

নানান যুক্তিতে বাবা পরাজিত হলেন। আপাত জয় হলো কন্যার। বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল। পরদিন নদীর ওপারে নব জেগে ওঠা চরে ওদের বাড়িতে যাবো এমন প্রতিজ্ঞা করিয়ে বিদায় নিলো বাবা মগন দাস আর কন্যা জলজ্যোৎস্না!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 60 = 62