বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ১

যারা আমার লেখা পড়েন, তারা জানেন যে, এক সময়ে আমি বাঙালি মুসলমানের হিরো ‘তিতুমীর’ কে নিয়ে দুই পর্বে লিখেছিলাম। সেই লেখার পরে মনে হয়েছিল, অনেক কিছুই বলা হয়ে উঠলো না, আরও অনেক লেখার ছিল। তিতুমীরের ‘বাঁশের কেল্লা’ বাঙালি মুসলমানকে গর্বিত করে, তাদের ছাতি ফুলে ৫৬” হয়ে যায় বাঁশের কেল্লার তিতুমীরের কথা ভেবে। হিরো তিতুমীর, ইংরেজদের সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কিভাবে বুক চিতিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এই বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতা সংগ্রামী হিরো তিতুমীরের অন্তরালে আসল সত্য কি জানতে গেলে অনেক ভেতরে তলিয়ে পড়তে হবে জানতে হবে। আজ থেকে তাই প্রকৃত ‘তিতুমীর’ কে তুলে ধরতে পর্যায়ক্রমে এই লেখা শুরু করলাম। লেখার স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী ইসলাম, উপমহাদেশে ইসলাম, বাংলায় ইসলাম অনেক কিছুই আসবে।

আমাদের ছোটবেলায় তিতুমীর পাঠ্যের মধ্যে ছিল। পঞ্চাশের দশকেই প্রদর্শিত হয়েছিল ‘বাঁশের কেল্লা’ নামক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটি অবশ্য আমি দেখিনি। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার যুদ্ধের বর্ণনা পড়ে তিতুমীরের বীরত্ব সম্পর্কে একটি সশ্রদ্ধভাব মনের মধ্যে লালন করে এসেছিলাম। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানির উৎস সন্ধানে একটা বই একবার হাতে এসেছিল। জয়ন্তী মৈত্রর Muslim Politics in Bengal, 1885-1906, বইটি পড়েই জানলাম, ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ নামক উগ্র মৌলবাদী আন্দোলনের শরীক ছিলেন তিতুমীর এবং কোনও স্বাধীনতা-যুদ্ধ নয়, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করেছিলেন মৌলবাদী তিতুমীর। নানা পড়াশোনার ফলে, বিভিন্ন রিলিজিয়নের তত্ত্ব সম্বন্ধে সামান্য কিছু হলেও আমাদের কিছু ধারণা, জ্ঞান হয়েছে। তারই সূত্র ধরে আমরা এটুকু এখন পর্যন্ত জানি যে, জেহাদ প্রচলিত অর্থে ধর্মযুদ্ধ নয়, বিশ্বজুড়ে আল্লাহর রাজত্ব কায়েম করার জন্য যুদ্ধ। ইসলামের মূলগ্রন্থ কোরাণ বাংলা ভাষায় অতি সহজলভ্য। আর হাদিশের দুই প্রামান্য সংকলন ‘সহী বুখারী” এবং “সহী মুসলিম হাদিশ বাংলাদেশের প্রকাশকদের কল্যাণে বাংলা ভাষাতেই সহজে পাওয়া যায়। ইসলাম সম্পর্কে ভারতের তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের জ্ঞানের সূত্র হলো সাঈদ আমীর আলীর প্রচারধর্মী বই ‘ম্পিরিট অফ ইসলাম’ আর বাংলার অধ্যাপকদের ইসলাম জ্ঞানের সূত্র হলো রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দের রচনাবলী। সমস্যাটা এখানেই !

তিতুমীরের প্রথম জীবনীকার বিহারীলাল সরকার তিতুমীরকে ‘ধর্মোন্মাদ’ আখ্যায়িত করলেও পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রয়ােজনে তিতুমীরকে ‘হিরাে’ বানানাে হয়। এই অপকর্মটি করেছিলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিজীবিরা জেহাদী তিতুমীরকে ‘কৃষক বিদ্রোহী’তে রূপান্তরিত করেছেন নিজেদের মনগড়া খেয়ালে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক সত্য নামমাত্রও নেই। ঔপনিবেশিক হীনমন্যতাযুক্ত এইসব সেকুলাঙ্গার ঐতিহাসিকদের ইতিহাসের উৎস কান্টওয়েল স্মিথ নামক এক শ্বেতাঙ্গ। অবশ্য এই একই দোষ থেকে অমলেশ ত্রিপাঠীকেও মুক্ত করা যায়না। তিতুমীরের ইতিহাস বিকৃতির প্রসঙ্গে সর্বপেক্ষা উল্লেখযােগ্য ভূমিকা সুপ্রকাশ রায় ও অমলেন্দু দের রচনা। গালগল্পই এই দুজনের ইতিহাস রচনার সূত্র আর দুঃখের বিষয় শিশুপাঠ্য ‘নারকেলবেড়িয়ার লড়াই’ লেখাই হয়েছে সুপ্রকাশ রায়ের গল্প গুলোকে ভিত্তি করে। বিহারীলাল কথিত ‘ধর্মোন্মাদ’ আখ্যাই তিতুমীরের যথার্থ প্রাপ্য। ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ নামক জেহাদী আন্দোলনের নেতা সাঈদ আহমদ বেরিলবী হ্বজে যাওয়ার আগে যখন কলকাতায় আসেন তখন বহু বঙ্গবাসী তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এইসব শিষ্যদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মীর নিসার আলী বা তিতুমীর। বাংলার ইতিহাসে তিতুমীরের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কারণ, তিতুমীরই শরিয়তী বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামের প্রবেশ ঘটিয়েছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজজীবনে।

লেখাটা মাত্র শুরু করলাম। রেফারেন্স, রেফারেন্স করে মাথা কুঁটবেন না। লেখার যথা সময়ে, যথা পর্বে ঠিকই সকল রেফারেন্স তুলে ধরবো। এই পর্ব পড়ে শুধু এটা অনুধাবন করার চেষ্টা করুন যে, ফেসবুকে ছাগুদের ঘাঁটি কেন ‘বাঁশের কেল্লা’ নামক পেজ…………

ক্রমশঃ প্রকাশ্য

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =