জলজ্যোৎস্নার স্বয়ম্বরা (৩য় পর্ব)

এবং সত্যি প্রতিক্ষিত দিন এলো একক্ষণে। এক স্নিগ্ধ ভরা চাঁদ জ্যোৎস্নারাতে অনুষ্ঠানের দিন ধার্য হলো। উন্মুক্ত চরে চাঁদ ও জেনারেটরের আলোয় প্যান্ডেল সাজানো হলো রাজকীয় দীপোৎসবে। সকলের জন্য অনুষ্ঠান উন্মুক্ত থাকাতে আশপাশ এবং দূরবর্তী এলাকা থেকে অনেকেই নৌকা, নানাবিধ জলযান ও পায়ে হেঁটে উপস্থিত হতে লাগলো। আমার আত্মীয় ও পরিচিত নারীরা জলজ্যোৎস্নার সাথে রইল বিকেল থেকেই সারাক্ষণ। তাকে সাধ্যমত সাজানো হলো যেমন ঝলমলে সজ্জিত থাকে বিয়ের কনে। আগ্রহী নারী ও গ্রাম্য কুলবধুরা তাদের অলঙ্কার ধার দিলো জলজ্যোৎস্নাকে কেবল ঐ রাতের জন্য।

:

মাঝ রাতের আগেই প্যান্ডেলস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হলো। দর্শক আর অংশগ্রহণকারী পাণীপ্রার্থীদের ভীড়ে তিল ধারণের ঠাঁই রইল না অকুস্থলে। জেলে, কৃষাণ, বর্গাচাষী, বেকার স্নাতকোত্তর, গণক, ইন্টারপড়ুয়া তরুণ, ষাটোর্ধ ধার্মিক, বিপত্নীক জনপ্রতিনিধি, হাঁটের তোলা উত্তোলক, রাজনীতিক চাঁদাবাজ, খেয়া নৌকার মাঝি, নৌকা নির্মাণবিদ, মাটি কাটার মাটিয়াল, খেজুর আর তালরস আহরণকারী, গরু মোটাতাজাকারক, মহিষ রক্ষক, মাছ বিক্রেতা, হাঁটের চা ও পান বিক্রেতা, জিলাপি শিল্পী, দূরবর্তী কুমোর ও বাজারের নাপিতসহ বিবিধ পেশাবিদ নানান ভঙ্গিতে উপস্থিত হলো জলজ্যোৎস্নার পাণীপ্রাথীরূপে। দূরবর্তী মহিষ কাটার চর থেকে ৫-ভাই এলো প্যঞ্চপান্ডব সেজে। প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন শেষ হলেও অনেক প্রার্থী দাঁড়িয়ে রইলো আসনের অভাবে। আয়োজক আমাদের মন উদ্ভাসিত হলো নিটোল আনন্দে!

:

স্ব্প্নালোকিত আলাকমালার মাঝে মঞ্চে আনা হলো জলজ্যোৎস্নাকে। কিছুক্ষণ থাকার পর নিচে নেমে হেঁটে দেখার চেষ্টা করলো সে পাণীপ্রার্থীদের। কিন্তু প্রচন্ড ভীড়ের চাপে আবার তাকে উঠতে হলো সংরক্ষিত মঞ্চে। সিদ্ধান্ত হলো – মঞ্চের সামনে একে একে দাঁড়াবে প্রার্থীরা। পরপর নিজের পরিচয় দেবে সংক্ষেপে তারা। যাকে পছন্দ করবে জলজ্যোৎস্না, তার গলায় পরাবে সে স্বয়ংবরার সংরক্ষিত মালা। আশা আকাঙক্ষার জটিল গ্রন্থিরচনার প্রাকলগ্নে আকস্মিক চারদিক থেকে একদল মৌলবাদী জঙ্গীরা এগিয়ে এলো মঞ্চের দিকে। তারা এ মুসলমানির দেশে এমন ‘বেশরিয়তি’, ‘হিন্দুয়ানী’, ‘বেশ্যাপনা’ কাজ বলে একে বন্ধ করতে বললো তাৎক্ষণিক। এমন কথাও বললো – এটা হিন্দুস্থান নয়, মুসলমানের বাংলাদেশ। আমার আগেই ঢাকা থেকে আগত বন্ধু আল আজাদ মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন তাদের। এসব অমানবিক তর্কিত কথার মাঝে ধেয়ে এলো আগুন। তাদের কজন মারমুখী হয়ে প্রথমে বোমা নিক্ষেপ করলো মঞ্চের মাঝে। তারপর আকস্মিক বন্ধ করে দিলো জেনারেটরের বিদ্যুৎ লাইন। চাঁদ জাগা অন্ধকারের মাঝে চারদিক থেকে আক্রান্ত হলো স্বয়ংবর মঞ্চ। নানাবিধ ধর্মীয় ধ্বনি দিলো তারা। ভয়ে আর আতঙ্কে ছুটোছুটি করতে লাগলো আগত সাধারণ মানুষ আর মঞ্চের নারীরা।

:

এসব ধর্মভিত্তিক ভালত্ব আর মন্দত্বের প্রৌঢ় হৃদয় খুড়ে পেট্রোল ছিটিয়ে মঞ্চে আগুন দিলো ওরা এবার। ওদের যুক্তিহীন শূন্য চাতুরির মূঢ়তায় জলজ্যোৎস্নার পুরো শরীর আগুনে ঝলসে উঠলো মূহূর্তে। জলজ্যোৎস্নাকে আগলেরাখা আমার শরীর, বন্ধু আজাদ আর কতিপয় নারীর শরীরও জ্বলে উঠলো নিক্ষেপিত পেট্রোল কিংবা গান পাউডারে। আমাদের এ ট্রাজিক সময়ে চাঁদখসা রাতের দূর ব্রহ্মাণ্ডের নক্ষত্র আর প্রেমের দেবতারা চেয়ে থাকলো অশ্রুসজল! অন্ধকার নেপথ্যের আগুন আলোমাঝে পড়ে যায় আধেক জ্বলা জলজ্যোৎস্না। প্রজ্ঞাময়ী প্রীতির মত পুড়েও সে এক বিভা ছড়াতে থাকে মঞ্চমাঝে। মূহূর্তে যেন চন্দ্রালোকে ঢেকে যাওয়া নিঃস্বত্ব সূর্যকে কেড়ে নেয় রাহুকেতু! নীলাভ নক্ষত্রপথের দিশা খুঁজে খুঁজে সংস্কৃতিবান তরুণেরা জল ঢালে আমাদের জ্বলন্ত শরীরে। লন্ডভন্ড মানুষের মাঝে জলজ্যোৎস্না যেন মৃগতৃষ্ণার মতো পড়ে থাকে অসার অন্ধকার আর জ্বলন্ত জলমাঝে। মৃত মাছের ট্রাজিক পুচ্ছতাড়নার মত অন্ধকারে কুয়াশার পঞ্জরে কাতরাতে থাকি আমরা আয়োজকরা!

:

রাতের শেষ প্রহরে ভাগা মঞ্চ থেকে টেনে ইঞ্জিনচালিত ট্রলাতে তোলা হয় আমাদের ৩-জনকে। বন্ধু আজাদ, জলজ্যোৎস্না আর আমি। শহরে নিতে হবে আমাদের পোড়া চিকিৎসার জন্যে। পুড়ে যাওয়া জীবনের এসব ধূসর পান্ডুলিপিপাঠে বর্বর সময়ে পাটাতনে শুয়ে থাকি আমরা ৩-জনে মৃতের মত। মাঠে ঘাসের ভিতরে নীল সাদা ফুলেরা পুড়ে যায় হেমন্তরাতের কুয়াশার মাঝে! আমাদের জীবনের এসব ক্লান্তিহীন উৎসানলে সুপ্ত রাতের নক্ষত্রালোকিত নিবিড় বাতাসের কান্নারা কাঁদতে থাকে। চর জীবনের এসব হেমন্তের তারাভরা রাতে জেগে থাকি আমরা নদীর নিভৃত চরে। অন্ধকার রাতে ধেয়ে চলা জীবনের অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম জেগে থাকে যেন আমাদের সাথে। পাশের স্বচ্ছ শাণিত নদী সেখানে যেন আমরা মৃত সারস। ডুবন্ত চাঁদের দিকে তাকিয়ে জলজ্যোৎস্নার মত অগণন মানবিক মানুষের মৃত্যু চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করি আমরা। তারপরো আমাদের মাঝে জলজ্যোৎস্নাকে আবিস্কার করি মৃত্যুজয়ী ব্রহ্মাণ্ডের অপরূপ সৌন্দর্যময়ী দ্রোহি কন্যা রূপে!

[অসমান্ত, শেষ পর্ব কাল]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 26 = 27