চাঁদা

ইদানিং বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করছি লক্ষ্মীপুজোর পরেই এলাকায় এলাকায় একদল শিশু উপস্থিত হচ্ছে, যাঁরা রাস্তা বন্ধ করে কালীপুজোর চাঁদা চাইছে। এই বছর তো অবস্থা এতটাই খারাপ যে এখন থেকেই কালীপুজোর চাঁদা তুলতে ব্যস্ত। মানুষ নানা রকম কাজে ব্যস্ত, তাই এভাবে রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবরোধ কতটা সমস্যা বহুল, তা শিশুদের বোঝাবে কে? শিশুদের বিষয় তাই মানুষ এগুলিকে মজার ছলেই দেখে, তাঁরা কিছু অর্থ দিয়ে এই সমস্ত শিশুদের আবদার মেটান। ব্যক্তিগত ভাবে আমি ও বহু ক্ষেত্রে এদের চাঁদা দিয়ে তাঁদের আবদার মিটিয়েছি কিন্তু সমস্যা হল গত কয়েক বছর আগেও যেখানে দুতিনটি কালীপুজো হত, এখন সেখানে তা দশ বারোটিতে এসে ঠেকেছে। এখন এত শিশুদের আবদার মেটানো সত্যিই কষ্টকর!

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুদের নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য হওয়ার ফলে তাঁরা নতুন দল করে আলাদা ভাবে চাঁদা তুলতে ব্যস্ত তাই এই সমস্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এখন শিশুদের এই কালীপুজোর চাঁদা তোলা বাহ্যিক দিক থেকে বিশেষ কিছু নয় তবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ বিশাল!

প্রথমত- একটা শিশু সে কেন কালীপুজোর চাঁদার মত বিষয় নিয়ে পড়ে থাকবে? শিশুদের কি ধর্ম ও কুসংস্কার মুক্ত হওয়া উচিত নয়?

দ্বিতীয়ত- একটি শিশুর প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত পড়াশোনা করা। তা না করে, স্কুল, টিউশন কামাই করে এভাবে দিনের পর দিন চাঁদা তোলার যে প্রচেষ্টা তা কি শিশুগুলির পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না? শিশুগুলির এইরূপ কর্মকান্ড কি তাদের সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করছে না?

তৃতীয়ত- এইরূপ কর্মকান্ডের ফলে একটি শিশু কি শিক্ষা পাচ্ছে? এথেকে একটি শিশু এটাই মনে করছে পুজোতে এভাবে টাকা আদায় করা বৈধ্য। বহুক্ষেত্রে দেখা যায় এরূপ কর্মকান্ডে বাড়ির অভিভাবকদের ও প্রচ্ছন্নে মদত রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল এই শিশুরা একদিন বড় হবে এরাই সমাজ পরিচালনা করবে, তখন কি এরাই পুজোর চাঁদার নামে জোরজুলুম করবে না? তখন এরাই মনে করবে পুজোর চাঁদা আদায় আমাদের জন্মগত অধিকার! কোন বাস চালক, ট্রাক চালক, অটোর ড্রাইভার বা কোন দোকানদার পুজোর চাঁদা দিতে না পারলে তাঁদের উপর চড়াও হবে। সেই অর্থ দিয়ে কিছু পরিমাণ টাকা পুজোই খরচ হবে, কিছু অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা হবে এবং বাকি অর্থ ফিস্ট, মদ, মাংস ইত্যাদির মাধ্যমে ফুর্তি করে ওড়ানো হবে। এগুলি কি কোন সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা গঠনের উপযোগী কর্মকান্ড?

এখন হিন্দুদের এরূপ কর্মকান্ড দেখে একশ্রেণীর মুসলমানদের উদ্ভব হয়েছে তাঁরা ঈদ, মিলাদ, জলসা ইত্যাদির নামে অনৈতিক ভাবে চাঁদা তুলছে। এখন প্রশ্ন হল এভাবে পুজো, ঈদ, ঈশ্বর, আল্লা, ভগবানের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় কতটা নৈতিক কর্ম বলে মনে করেন? এর ফলে কি সাম্প্রদায়িকতার দ্রুত প্রসার ঘটছে না? প্রকৃতপক্ষে যদি সত্যিই ধর্মিক মানুষ হন তাহলে নিজেদের অর্থে পুজো বা ঈদ পালন করলে কি আল্লা বা ভাগবান অধিক খুশি হতেন না?

যাক এখন অভিভাবকদের কাছে প্রশ্ন আপনারা কি আপনাদের শিশুদের এরূপ অনৈতিক শিক্ষা দিতে চান? বরং শিশুদের এটা বোঝানো উচিত এরূপ চাঁদা আদায় নৈতিক কর্ম নয় বরং নিজের অর্থে যদি পুজো করা যায় তা অধিক উত্তম। এভাবে শিশুরা অর্থ সম্পর্কে যত্নবান হবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে।

এখন প্রশ্ন হল আমাদের করণীয় কি? বিষয়টি যেহেতু শিশুদের তাই আমাদের খুব সহানুভূতির সঙ্গে শিশুদের বোঝাতে হবে, কোন প্রকার বলপ্রয়োগ বা ভয় প্রদর্শন কখনোই কাম্য নয়। এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য আমার এক ছাত্রের অভিভাবক তাঁর পুত্রের এভাবে অর্থ আদায় করার জন্য পুজোর ঠাকুর কিনে দেন নি। তিনি বলেন তুমি মানুষের নেওয়া অর্থগুলি আগে ফিরত দাও তারপর আমি তোমাকে ঠাকুর কিনে দেব এবং এ ঘটনা যেন আর কোন দিন না দেখি! এরপর থেকে আমার ওই ছাত্রটি আর কোন দিন এভাবে অর্থ আদায় করেনি। এটা একটা উদাহরণ মাত্র, আপনারা ও আপনাদের শিশুদের বিভিন্ন ভাবে বোঝাতে পারেন।

অনেকে মনে করবেন শিশুদের এই ছোট ছোট বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলার দরকার কি? তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি আমি ও তাই ভাবতাম এবং এইজন্যই এতদিন বিষয়টি নিয়ে উপেক্ষা করে এসেছি কিন্তু বর্তমানে কেন জানি না মনে হচ্ছে বিষয়টি ধীরে ধীরে এক সামাজিক সমস্যায় রূপান্তরিত হচ্ছে। তাই সচেতন করার উদ্দেশ্যেই লেখা। কারণ ছোট ছোট বিষয়গুলি থেকেই বড় বড় সমস্যাগুলির উৎপত্তি হয়। তাই বিষয়টি আর খুব একটা উপেক্ষণীয় নয়। কথায় আছে ‘বিন্দু বিন্দু থেকেই সিন্ধু’ দর্শন হয়।

পরিশেষে, বলতে চাই একটা শিশুর কি শিক্ষা অর্জন ও যুক্তিবিদ্যার চেয়ে অনেক বেশি ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হওয়া প্রয়োজন? অভিভাবকদের কাছে আমার প্রশ্ন আপনি কি আপনার শিশুকে শিক্ষিত, মানবিক মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চান, নাকি ধর্মান্ধ, কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যাক্তিতে পরিণত করতে চান?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1