এবার সমস্ত দ্বিধা বিভক্তি ভুলে আসুন এই অসম্ভব সুন্দর দেশটাকে ভালোবাসি।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত যদি বিস্তৃত বাংলার শুষ্ক মাটি শুষে না নিতো তবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্রের পাশে আরো একটি নদী হতো। নাম হতো ‘রক্ত নদী’! ত্রিশ লক্ষ মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি ভূখন্ড স্বাধীন দেশের গৌরবদীপ্ত আসন পেয়েছে। বাঙালি বীরের জাতি। দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে বিজয় চিনিয়ে আনা এমন বীরগর্ভা জাতি পৃথিবীতে খুব বেশি নেই।

মধ্য সপ্তদশ শতক থেকে আমাদের আত্মদানের সুচনা, ন্যায্য আদায়ের এই সংগ্রাম চলেছে উনিশ শতকের একাত্তর পর্যন্ত। মাঝখানে কত সংগ্রাম, কত ত্যাগের ইতিহাস! আমরা জীবন বাজি রেখেছি মায়ের ভাষায় কথা বলবার অধিকারের জন্য । এমন বিরল আবেগ আর বেনজির ভালোবাসার গৌরব পৃথিবীতে কেবল আমরাই করতে পারি। শোষনের বিরুদ্ধে মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের কেবল নয় মাসের নয়, শত বৎসরের সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে আমরা আজকের অবস্থায় উন্নিত হয়েছি। যুদ্ধ-বিগ্রহ, লড়াই-সংগ্রামে ক্ষত-বিক্ষত, বিধ্বস্তপ্রায় ইতিহাসের আস্তাকুঁড় আর ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে এসে মেধায় মননে সমগ্র পৃথিবীতে আমরা আসিন হয়েছি বহু গৌরবের আসনে। আমাদের গৌরব করার অনেক কিছুই আছে।

কাঁধের লাঙল-জোয়াল রেখে হাতে স্টেনগান তুলে নিয়ে বাঙালি দেখিয়েছিল দূর্বার সাহস। একদল চাষা, অগণিত মুটে-মজুর, অজস্র ছাত্র-জনতা একটা সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর দূর্ভেদ্য দুর্গ ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিলো কেবল অদম্য দেশপ্রেম দিয়ে। ভাবুন তো যদি আজকের দ্বিধা বিভক্ত মানসিকতা ৭১এর বাঙালিরও থাকতো, তাহলে দেশ স্বাধীন হতো কি করে! আজ আমরা ধর্ম-বর্ন, জাত-পাত, আর রাজনীতিতে ভয়ংকর দ্বিধা বিভক্ত। অথচ আজ থেকে অর্ধশত বৎসর আগে দেশমাতৃকার ডাকে আমাদের পূর্ব পুরুষরা সমবেত হয়েছিল কেবল ‘বাঙালি’ পরিচয়ে। পঞ্চাশ বছরে আমরা সর্বক্ষেত্রে এগিয়েছি, পিছিয়েছি কেবল মানসিকতায়!

একাত্তরের মহান মুক্তিযোদ্ধা এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদ নিজেদের অসামান্য ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের কাছে গচ্ছিত রেখে গেছে আমানত হিসেবে। ভাবুন তো সেই অমূল্য আমানত আমরা কতটা অক্ষত রাখতে পেরেছি! সুবোধ বালক, দুরন্ত কিশোর, দুর্বার যুবা, সংসারী পুরুষ, দায়িত্বশীল পিতা, আদরের সন্তান, জীবন বিপন্ন হবে জেনেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার যুদ্ধে নেমেছিলো কোন পদ পদবী কিংবা কোন স্বার্থে নয়, কেবল দেশকে স্বাধীন করবার জন্য, শোষণে শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তির স্বাদ নেয়ার জন্য, জুলুম আর বৈশম্যের প্রাগৈতিহাসিক ধারা রুখে দেবার জন্য, মাঠের কৃষাণ, ঘাটের মাঝির কণ্ঠে মুক্ত ভাটির সুরে ঘুম ভাঙা বিহঙ্গের হঠাৎ কলতানের জন্য, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ প্রান্তরে রাখালের বংশির সুরের স্বাধীনতার জন্য। পরের প্রজন্মের তরে একটা স্বাধীন স্বনির্ভর দেশ গঠনের জন্য। এই দেশকে ভালোবাসার এমন জগৎ শ্রেষ্ঠ নজির আমাদের সামনে রয়েছে, অথচ আমরা আমাদের এমন ঋষিতুল্য পূর্ব পুরুষদের দেখানো পথ ভুলে মেতে উঠেছি স্বার্থের কুৎসিত খেলায়!

তামাম রাত্রি প্রবল বর্ষণের পর ঝলমলে প্রত্যুশে যে রূপবতী সুর্য্য বাংলার পুবাকাশ রাঙানো কিরণ ছড়ায় প্রকৃতির নৈসর্গিক রুপ এমন করে পৃথিবীর আর কোন দেশে ধরা দেয় না। এদেশের বিস্তীর্ণ অরণ্যের অজুত বৃক্ষের অজস্র শাখায় শাখায় বিচিত্র পাখ-পাখালি অহর্নিশী যে সুমধুর কলতান তোলে, ভুবন বিখ্যাত বাজিয়ে অনন্ত আরাধনায় পৃথিবীর সব থেকে আধুনিক যন্ত্রযোগেও সেটা তুলতে পারে না। অবারিত ধানের খেতে সবুজ ধানের পাতায় পাতায় প্রবল হাওয়ায় হঠাৎ ওঠা ঢেউয়ের সৌন্দর্য্য দেখে নিশ্চিন্তে মরে যাওয়া যায়। শতবর্ষী বটমূলে বসে ক্লান্ত রাখালের মোহন বাঁশির গৃহত্যাগী সুর, নিরবধি বয়ে চলা শান্ত স্রোতস্বিনীর বুকে মাঝিমাল্লার ভাটিয়ারী সুরের সুকরুন হাহাকার পৃথিবীর আর কোন দেশে দেখা যাবে না।

এখানে স্নিগ্ধ বিকেলে সুনীল আকাশে ধবল বলাকার ডানায় শিল্পিত রুপে যে নিপুণ সৌন্দর্যের অবতারণা হয় সেটা মর্ত্যলোকো আর কোথাও হয় না। শান্ত দিঘির নিটোল জলে পানকৌড়ির টুপটুপ ডুব সাতারে যে নয়ন জুড়ানো দৃশ্যের অবতারণা হয়, জগৎশ্রেষ্ঠ চিত্রকরও এমন দৃশ্য চিত্রায়িত করতে পারবে না। শরতের শুভ্র কাঁশের বন কিংবা হেমন্তি শুক্লপক্ষের রাতের গৃহত্যাগী জোৎস্ন্যা কেবল এদেশেই এমন অসহনীয় সৌন্দর্য্য নিয়ে হাজির হয়। এ দেশের গ্রামীণ জনপদে কর্মমুখর বিকেল অজস্র রুপকথার জন্ম দেয়। মুখর সন্ধ্যায় পাটি পাতা উঠোনে ঝুপ করে চেপে বসা আঁধারের পথ ধরে গল্পে গল্পে রুপকথার রাজা-রানী, রাক্ষস নেমে আসে কেবল আমাদের দেশেই। বর্ষন মুখর বাংলার রুপ যে দেখেনি, তার দুচোখ পৃথিবীর সব থেকে সুশীতল সৌন্দর্য্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

দিগন্তে মিশে যাওয়া সুনীল আকাশ তলে এমন নৈসর্গিক সুন্দর একটি দেশ পৃথিবী নামক গ্রহে কেবল একটাই আছে। সে আমাদের চিরায়ত বাংলা! আমাদের গর্ব আর সীমাহীন অহংকারের বাংলাদেশ! আসুন না এবার সমস্ত দ্বিধা বিভক্তি ভুলে এই অসম্ভব সুন্দর দেশটাকে ভালোবাসি। সমস্ত মত-পথ, সকল বিভাজন, মতাদর্শের ভিন্নতা ভুলে আরেকবার সবাই মনেপ্রাণে বাঙালি হয়ে বাঁচি। অনেক তো হলো হিংসা-হানাহানি, এবার আসুন আরেকবার কেবল বাঙালি হই। এই দেশটাকে নিয়ে গর্ব করার, এই দেশটাকে ভালোবাসার বহু কারণ আছে, যদি না থাকতো তবে এই দেশটাকে ভালোবেসে একাত্তরে এতগুলো মানুষ অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতো না।

ধর্ম থাকুক উপাসনালয়ের চৌহদ্দিতে, রাজনীতি থাকুক সংসদ ভবনের চৌকাঠের ভেতর, মতাদর্শ থাকুক ব্যক্তি মনের একেবারে গভীরে, দেশের প্রশ্নে আমরা যেন নির্দ্বিধায় ডিঙাতে পারি মত ও পথের বিভাজনের দেয়াল। সর্ব ধর্মের মানুষ, সর্ব পথের অনুসারী দেশের স্বার্থে সব বিভক্তি ভুলে সর্বান্তকরনে যেন এক হয়ে যাই। মন্ত্রী থেকে মুচি, ব্যবসায়ী থেকে কুলি, ধনকুবের কিংবা ভিখারি; দেশের মালিকানা সবার সমান, সুতরাং দেশের প্রতি ভালবাসাটাও যেন হয় সমানুপাতিক। দুখিনী এই বাংলার ইতিহাস থেকে বর্তমান পুরোটা সময়ের ওপর চোখ রাখুন, অনুভব করুন স্নেহার্দ হৃদয় দিয়ে; দেখবেন এই মাতৃতুল্যা দেশটাকে ভালোবাসার বহু কারণ আছে। যদি না থাকতো, তবে এত প্রাণ দেশের জন্য মৃত্যুর মিছিলে সমবেত হওয়ার প্রেরণা পেতো না!

ফেসবুক মন্তব্য

২ thoughts on “এবার সমস্ত দ্বিধা বিভক্তি ভুলে আসুন এই অসম্ভব সুন্দর দেশটাকে ভালোবাসি।

  1. কিছুদিন পর দেশটা আমার এটা বলাও দেশদ্রোহীতা বলে গণ্য হবে। কারণ দেশটা শেখ মুজিবের এবং শেখ হাসিনার। এটা বলাকে এখন দেশপ্রেম হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 6