বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ২ (বাংলায় ইসলামের বিস্তার)

প্রকৃত তিতুমীরকে আবিষ্কার করতে গেলে, তিতুমীরের উদ্ভাসের পটভূমিকা এবং অবিভক্ত বাংলায় ইসলাম ও তার প্রসার সম্মন্ধে জানতে হবে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো এর স্বরূপ তুলে ধরার। আগের পর্বেই লিখেছি যে, তিতুমীরই শরিয়তী বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসলামের প্রবেশ ঘটান বঙ্গদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজজীবনে। বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব ঘটে এমনই এক সময়ে যখন বিকৃত কিন্তু লােককান্ত বৌদ্ধধর্ম সেন রাজাদের প্রবল পরাক্রমে রূপান্তরিত হচ্ছিল হিন্দুধর্মে। এই বৌদ্ধ-হিন্দু মিশ্র ধর্মকেন্দ্রিক সমাজই অবাধ চারণভূমি হয়ে উঠলাে ফকির দরবেশ বাহিত ইসলামের কাছে। ওই সময়ে বাগদাদ-বসরার বণিকেরা বহরের পর বহর পণ্যবােঝাই নৌকা নিয়ে নােঙ্গর করছে দক্ষিণের সমুদ্র বন্দরগুলিতে। নৌকাগুলি শুধু পণ্য আর বণিকই বহন করছে না, বহন করছে সূফী দরবেশও। তারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পরছে উপকূলের গ্রামগুলিতে নদীপথ হয়ে দেশের অভ্যন্তরে। প্রচার করছে ইসলামের তথাকথিত সামাজিক সাম্যের কথা। এই সেমেটিক একেশ্বরবাদী ধর্মমতকে অবতারবাদী হিন্দুরা অন্য অদ্বৈত ধর্মের মতই ভাবল, কারণ দরবেশরা প্রাথমিকভাবে মারফতী ইসলামের কথাই বলেছিল। গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীদের মত জোব্বাধারী ফকির দরবেশরাও প্রচুর সমাদর পেল গ্রামীন বঙ্গসমাজে। সরকারীভাবে বাংলায় ইসলাম প্রবেশ করেছিল ১২০৩ খৃষ্টাব্দে, যখন বক্তিয়ার খিলজীর তুর্কী ঘােড়া উত্তরবিহার চূর্ণ করে আছড়ে পরেছিল লক্ষণ সেনের নদীয়ায়। বক্তিয়ার খিলজী বাংলার মসনদে বসার সাথে সাথেই রাজশক্তি লেগে যায় ইসলামের প্রসার কার্যে। মধ্যযুগে একসময়ে দেখা যায়, স্মৃতিশাস্ত্র কন্টকিত বাংলাদেশ ছেয়ে গেছে দরগা, মসজিদ আর খানকাতে। ইসলাম প্রসার লাভ করেছে উত্তরের মৈমনসিং-বগুড়া থেকে দক্ষিণের ব-দ্বীপের শেষতম গ্রাম পর্যন্ত ; পূর্বের শ্রীহট্ট-চট্টগ্রাম থেকে পশ্চিমের মঙ্গলকোট পর্যন্ত। বাংলায় ইসলামের জয়যাত্রা সম্মন্ধে মানুষের তেমন কোনো সম্যক ধারণা তখন ছিলোনা কারণ তখন জনসংখ্যা গণনার বিজ্ঞান প্রচলিত হয়নি। ১৮৭১-৭২ বাংলায় প্রথম জনগণনা হয়, আর তাতে দেখা যায় বাংলার পাঁচটা বিভাগের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী আর চট্টগ্রাম বিভাগে মুসলমানই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বর্ধমান ও প্রেসিডেন্সি বিভাগে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বাংলার ৪৮% মানুষই মুসলমান সম্প্রদায়ের।

বাংলার গ্রামে এই বৃহৎ সংখ্যক মুসলমান জনসখ্যা সম্পর্কে হিন্দুধর্মের জাতিভেদ প্রথার জন্য স্বধর্মে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিম্নবর্গের মানুষেরা ‘সাম্যবাদী’ ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে, এই ধরণের একটি সরলীকৃত মতবাদ সর্বদা প্রচার করা হয় । এই মতের প্রবক্তারা প্রাথমিকভাবে বৃটীশ আমলারাই। ১৮৭১ খৃষ্টাব্দের লােকগণনার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পূর্বের চট্টগ্রাম বিভাগে মুসলমানদের সংখ্যা প্রচুর—যে বিভাগের জেলাগুলিতে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চবণেরর হিন্দুরা যথেষ্ঠ সংখ্যালঘিষ্ঠ, কারণ সাধারণভাবে গঙ্গার পূর্ব পার উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছে বসতির যােগ্য বলে বিবেচিত হত না। নীহার রঞ্জন রায়ের মতে অবিভক্ত বাংলায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পীঠস্থান ছিল অজয় নদীর দক্ষিণ তটবর্তী অঞ্চল যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নবদ্বীপ। ওই অঞ্চল থেকে যত দূরে যাওয়া যেত সমাজের ওপর থেকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবও তত কমতে থাকতাে। সুতরাং দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের ওইসব অঞ্চল ছিল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে বহুদুরে। জঙ্গল দখল করে নিম্নবর্ণের মানুষরাই ওইসব অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সংখ্যার আনুপাতিকে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে ওইসব নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ঘাত-প্রতিঘাতের সম্ভবনাই ছিল যথেষ্ট কম। তথাকথিত উচ্চবর্ণের অত্যাচারের সম্ভবনা তাই স্বাভাবিকভাবেই নূন্যতম । অন্যদিকে, বাংলার যেসব অঞ্চলে উচ্চ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে ঘাত-প্রতিঘাতের সম্ভবনা বেশী সেখানে কিন্তু মুসলমানদের সংখ্যা কম। ব্রিটিশ আমলাদের শুরু করা অত্যাচার থিওরি যা আজকাল ইসলামিস্ট, বামিসলামিস্ট, মডারেট ও সেকুলাঙ্গাররা প্রচার করে, তা সত্য হলে পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে কোনও নিম্নবর্ণের হিন্দু পাওয়া যেতনা ! তীক্ষ্ণধী মুসলমান লেখকেরা এই অত্যাচার থিওরিটা লুফে নিয়ে প্রচার করেছিল। কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছিলো :
“The followers of the Vedas became very powerful, they went out in bands and destroyed the Buddists. Dhamma (the presiding Deity of the Buddhist) was greatly pained at all these and assumed in his mystery the forms of Mussalman with black cap on their heads and bows and arrows in their hands. They rode powerful horses which struck terror on all sides, and they cried out one name, ‘Khuda.’ Brahma become Mahammed, Vishnu becaine the prophet and Siva became Adam: Genesh became Gazi and Kartik became the Qazi and all the ancient Rishis became Faqirs and Darveshes-the goddess Chandi became Hava (Eve) and Padmavati became the Lady of Light (Fatima, daughter of the Propet). All the gods and goddess entered Jajpur (a big village) in a body. They went on pulling down walls and gates. feasted merrily upon booty and cried out-catch them, catch them.”.

আদতে, জাতিভেদ প্রথা নয়, হিন্দুদের ছুৎমার্গ ইসলামায়নের জন্য কিছুটা দায়ী। হিন্দুদের ‘জাত’ অতি সহজেই যায় এবং একবার জাত গেলে তা ফিরিয়ে আনা সহজসাধ্য নয়। তার জন্য প্রয়ােজন প্রায়শ্চিত্তের। রবীন্দ্রনাথের পরিবার পীরালী ব্রাহ্মণ বলে কথিত। কবে কোন মুসলমানের রান্নার গন্ধ নাকি তাদের বাসগৃহে প্রবেশ করেছিল। সেজন্য কোনও সম্রান্ত হিন্দু ঠাকুর-পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন না। মুসলমান শাসক সম্প্রদায় ও ইসলাম প্রচারকেরা হিন্দুদের এই জাত যাওয়ার ব্যাপারটিকেই তৎপরতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে এক বিরাট সংখ্যক হিন্দুকে ইসলামায়িত করে। বাংলায় এই বিপুল সংখ্যক মুসলমানের উদ্ভব অবশ্যই ইসলামায়নের দ্বারা। খােন্দকার ফজলে রাব্বি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে মুসলমানদের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আগত স্থানীয় শাসনকার্যে রত পশ্চিমাদের বংশধর। রাব্বির মত শেষ পর্যন্ত গ্রাহ্য হয় নি। এ কথা আজ সর্বজনস্বীকৃত যে বাংলার মুসলমানদের বারাে আনাই ধর্মান্তরিত বৌদ্ধ এবং হিন্দু এবং কিছু কিছু উপজাতীয় মানুষ-কোচ, মেচ, রাজবংশী, বােড়াে, ধীমল প্রভৃতি। বক্তিয়ার খিলজীর বাংলা জয়ের অনেক আগেই অষ্টম শতাব্দীতে আরব বণিকদের সঙ্গে ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করে, কিন্তু বণিকদের সঙ্গে আগত সমকালীন ইসলাম প্রচারকেরা যে খুব বেশী সুবিধা করতে পেরেছিলো, এমন তথ্য পাওয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে মারফতী ইসলামের সঙ্গে ভারতে প্রচলিত বৌদ্ধ ও সনাতন ধর্মের তেমন কোনো বিরােধ নেই, কিন্তু মারিফতী ইসলামের প্রচারক হলেও এই পীর ফকিররা প্রথমতঃ এবং শেষতঃ মুসলমান। তাত্ত্বিক দিক দিয়ে শরিয়তী ও মারিফতী ইসলাম চুম্বকের দুটি মেরুর মত মনে হলেও প্রত্যেক সুফী সাধকই শরিয়ৎ সচেতন।

তিতুমীরের আন্দোলনেই আমরা দেখবাে আন্দোলন কট্টর শরিয়তী হওয়া সত্ত্বেও তাদের দলে যােগ দিয়েছিলো স্থানীয় ফকিররা………

(ক্রমশঃ প্রকাশ্য )

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of