মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও ভণ্ডামি ।

সামসময়িক সময়ের মুসলিম বিশ্বের আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করলে বিষয়টি দিনের মতো পরিষ্কার । মুসলিমরা পৃথিবীতে এখন অধিকাংশ অরাজকতার মধ্যে সম্পৃক্ত। আর এই অরাজকতা খুঁজতে গিয়ে আমি খুঁজে পেলাম নতুন বিষয় যে, মুসলিমরা যে অরাজকতা করছে তা আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধে । কোরান হাদিস তোয়াক্কা না করে তারা এসব করছে । যদিও মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই বলে একটি কথা শুনে আমাদের কান ভারী হয়ে গেছে । পবিত্র কোরানে এমনটিই বলা আছে । আল্লাহ তা আলা বলেন –

সূরা আল হুজরাত,আয়াত ৯ ও ১০

“৯। যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়ানুগ পন্থায় মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন।”

“১০। মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।”

 

মুসলিম পণ্ডিতরা দাবী করেন এ আয়াত দুটি দুনিয়ার সব মুসলমানদের এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে ।এ আয়াতের দুটির দাবী ও গুরুত্ব কি? তা বহু হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে । আল্লাহ তালা বলেন: যদি একদল অন্য দলের উপর বাড়াবাড়ি করে এবং তাদের আক্রমণ করে বসে তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে । এ সংক্রান্ত যথেষ্ট সহি হদিস রয়েছে ।আয়াতের শানে নযুল পর্যালোচনায় দেখা যায় কিভাবে মুসলিম উম্মাহদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাধান করা হয়েছে । হাদিসে এমন বর্ণনা পাওয়া যায় যে, ইমানদারদের সাথে একজন ইমানদারের সম্পর্ক ঠিক তেমন যেমন দেহের সাথে মাথার সম্পর্ক। সে ইমানদারদের প্রতিটি দু:খ-কষ্ট, ঠিক অনুভব করে যেমন মাথা দেহের প্রতিটি অংশের ব্যথা অনুভব করে । পাঠকদের তফসির ইবনে কাসীর, অনুবাদক ড: মুহম্মদ মুজীবুর রহমান , ৯ম সংস্করণ, হুসাইন আল মাদানী প্রকাশনী,সপ্তদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫-২৮ থেকে আমার বক্তব্য সমূহ মিলিয়ে নেয়ার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি ।

 

আসুন এখন আমরা মুসলিম বিশ্বের সমসাময়িক কিছু ঘটনাবলী পর্যালোচনা করি। আমি সে ক্ষেত্র বেছে নিবো সিরিয়া , কাশ্মীর,উই ঘুরের মুসলমান নির্যাতন , ইয়েমেন হামলা , রোহিঙ্গা সমস্যা । আসলে এসব সমসাময়িক ঘটনা সম্বন্ধে আমরা কম বেশী জানি । ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে মুসলিম নেতা সৌদি বাদশাহ প্রিন্স সালমান, পাকিস্তানী প্রধানমন্ত্রী  ইমরান খান , তুর্কী প্রেসিডেন্ট এরদোগান , মালায়শিয়ার মাহাতির মোহম্মদ ও আমাদের দেশের নব্বই ভাগ মুসলমানদের সমালোচনা করলেই একটি পরিষ্কার চিত্র আমরা দেখতে পাবো । আসলে বর্তমান বিশ্বে এরা মুসলিম বিশ্বের প্রধান ও প্রভাব বিস্তারকারী নেতা । এদের কথা এবং কাজের সহিত কোন ধরনের সামঞ্জস্যতা পাওয়া যায় না । এমনকি কোরান ও হাদিসের নির্দেশাবলী মেনে চলতে দেখা যায় না । এরা হর হামেশাই ইসলামের নাম নিয়ে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধতার কথা বলে কোথায় মুসলিমরা নির্যাতিত হচ্ছে সে বিষয়ে বক্তব্য দিতে সোচ্চার থাকে। এরা কি আসলেই মুসলিম সংহতি ও ঐক্যের জন্য সোচ্চার ?  কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদের আমরা এসব ধর্মীয় নেতাদের উস্কানিমূলক সংহতি ও ঐক্যের বক্তব্যতে মুগ্ধ হয়ে হৈ চৈ করতে ব্যস্ত । কিন্তু আসলে এসব ধর্মীয় নেতার মুসলিম ঐক্যের ব্যাপারে কতটুকু স্বচ্ছ?

 

 

প্রথমেই আসি এরদোগানের ব্যাপারে । দুই বছর আগে যখন আরাকান থেকে লক্ষ্য লক্ষ্য মুসলিম রোহিঙ্গা আরাকান আর্মির আতাচারসহ নিপীড়নে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে এসেছিল তখন কিন্তু এরদোগান সবচেয়ে প্রতিবাদমূলক বক্তব্য প্রদান করেন । এমন কি এরদোগানের স্ত্রী আমাদের দেশে এসে রোহিঙ্গাদের সমবেদনা জানিয়েছিল । আমরা বাংলাদেশী মোসলমানরা এরদোগানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ।সারা বিশ্ব বাংলাদেশের প্রশংসা  করেছিল রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য । এরদোগান  ঘোষণা দিল মুসলিম সংহতি ও ঐক্যের জন্য প্রয়োজনে  মায়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ  করবে  বলে ঘোষণা করলো । মুসলিম ঐক্যের কথা বলে এসব প্রতিবাদ তিনি করেছিলেন বলে আমরা মোসলমানরা খুশী হয়েছিলাম।তখন বাংলাদেশীরা  মুসলিম বন্ধু হিসেবে এরদগনকে গ্রহণ করেছিল, যিনি প্রতিবাদ করেছিলেন এবং প্রয়োজনে মুসলমানরা নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত । আমরা মুসলিমরা এরদোগনকে নিয়ে গর্ভ করছিলাম যে , এরদোগন হল মুসলিম বিশ্বের জন্য নতুন খলিফা ।কিন্তু মুসলিমদের কল্পিত এই খলিফা এরদোগান কিছুদিন আগে বাংলাদেশেকে পরামর্শ দিয়েছিল রোহিঙ্গাদের জন্য একটি আলাদা জায়গা নির্বাচন করত: পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে । কথার সাথে কাজের মিল নাই । বাংলাদেশের জন্য এখন রোহিঙ্গা বিষফোঁড়া। তুর্কী কিন্তু কিছু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিয়ে পুনর্বাসন করতে পারতো । উন্নত বিশ্বের অনেক  অমুসলিম দেশ মানবিক কারনে অনেক শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে ,এটা একটি মানবিকতার জন্য চলমান  প্রক্রিয়া। আমার জানা মতে কোন মুসলিম রাষ্ট্রে এমন মানবিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নাই । ইউরোপ ও আমেরিকাতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হিসাবে এসইলাম ভিসার প্রথা চলমান আছে।  ভৌগোলিক ভাবে তুরস্ক বাংলাদেশ থেকে এ সংক্রান্তে সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল কিন্তু এরদোগন তা করেন নি। তুর্কি সহ সকল মুসলিম রাষ্ট্র  রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারতো। আর এদিকে গত ১০ অক্টোবর ২০১৯ এরদোগন সিরিয়াতে তুরস্ক সামরিক অভিযান পরিচালনা শুরু করেন । তুর্কী সামরিক শক্তি ভৌগলিক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্য কুর্দিদের উপর হামলা শুরু করে । এতে কুর্দি মুসলমানরা এরদোগানের নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে । বন্দী আই এস সদস্যরা বের হয়ে গেল । এখন কুর্দি মুসলমানদের নিজ স্বাধীনতার জন্য বাঁধা হল তুরস্ক । কিন্তু অবাক ব্যাপার হল কুর্দি মুসলিমদের উপর এরদোগানের এই নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ছাড়া সমগ্র মুসলিম দেশ সমূহ নীরব । যদিও সৌদি মধ্য আরব নিয়ন্ত্রণের কারণে রাজনৈতিক ও ভৌগলিক সুবিধা অর্জনের জন্য এরদোগানের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে ।কিছুদিন আগে যেই রোহিঙ্গাদের জন্য যুদ্ধ করার জন্য এরদোগন সারা বিশ্বে হৈ চৈ করছিল কিন্তু এখন কুর্দিদের হামলা চালাচ্ছেন , এটা কোন ধরনের ভণ্ডামি । এমন কি সকল মুসলমান রাষ্ট্র নীরবতা পালন করেছে । আর অমুসলিম দেশ গুলো প্রতিবাদ করছে।  তুর্কিকে হামলা  থামানোর জন্য অর্থনীতিক চাপ দিচ্ছে। এখন পাঠকের বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলাম এরদোগান কোরান ও হাদিস অনুসারে মুসলিম ঐক্যের জন্য কতটুকু গ্রহণীয় ?

কিছুদিন আগে মুসলিম বিশ্বে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খাঁনের  প্রশংসায় মুসলিমরা পঞ্চমুখ।কেননা কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে হুঙ্কার দিয়েছিলেন । এমন কি মুসলিম সংহতি ও ঐক্যের জন্য ভারতকে পারমাণবিক হুমকি প্রন করেছে ।  আমরা বাংলাদেশী মোসলমানরা ১৯৭১ এ পাকিস্তানের বর্বরতা ভুলে মুসলিম ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাশ্মীর ইস্যুতে ইমরান খানের সমর্থন দিলাম । ভুলে গেলাম ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের কথা । যখন এই পাকিস্তান আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় আই এস যোদ্ধাদের মাধ্যমে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর নিপীড়ন নির্যাতন করেছে তখন সকল মুসলিম বিশ্বের মুখ বন্ধ করে ছিল।সম্প্রতি জলবায়ু কাশ্মীর সহ অন্যান্য ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘের ২০১৯ এর অধিবেশনে ইমরান খানের প্রতিবাদ মূলক, মুসলিম ঐক্যমূলক বক্তব্য মুসলমানদের কাছে খুবই প্রশংসা অর্জন করেছে কিন্তু আমি হতাশ হয়েছি । ইমরান খান অন্তত চীনের উঁই ঘুরে মুসলমানদের নির্যাতনের কারণে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক বক্তব্য সংযুক্ত করতে পারতো কিন্তু তিনি তা করেন নি । কারণ বর্তমানে চীনের সাথে পাকিস্তানের যথেষ্ট সু সম্পর্ক রয়েছে । তাহলে এখন পাঠকের কাছে প্রশ্ন পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর এহেন কর্মকালাপ কতটুকু ইসলাম সিদ্ধ বিষয়?

এখন আলোচনা করি সৌদি আরবের বিষয় । গত তিন বছর ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনের মোসলমানদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন করছে । যুদ্ধ বিমান দিয়ে ইয়েমেনে বোমা নিক্ষেপ করে মোসলমানদের বাড়িঘর ধুলার সাথে মিশিয়ে ফেলছে কিন্তু সারা বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কোন প্রতিবাদ করছেনা । নবীর দেশ বলে কি  তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যায় না ? কিন্তু অপর পক্ষে প্যালেস্টাইনে ইসরাইলি কোন আগ্রাসন হলে আমাদের বায়তুল মোকাররম থেকে মোল্লারা  প্রতিবাদ মিছিল করে । প্যালেস্টাইনের জন্য দোয়া করা হয় কিন্তু ইয়েমেনের জন্য করা হয় না । এমনকি সৌদি আরব চীনের উঁই ঘুরের বিষয়ে মন্তব্য করে যে, এটা চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয় এমন কি সৌদি সরকার কোন প্রতিবাদও করেনি । কিন্তু ইসরাইলকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে সমর্থন কিন্তু এখন সৌদি সরকার দিচ্ছে।  এমন পক্ষপাত দুষ্টতার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না । তাহলে মুসলিমরা নীরব কেন ?

মালায়শিয়ার মাহাতির মোহম্মদ মুসলিমদের নিপিড়নের বিরুদ্ধে কোন শক্ত প্রতিবাদ করেনি আজো । তবে তিনি সন্ত্রাসী মদতদাতা দাগি আসামী জাকির নায়েককে অবস্থান করার অনুমতি দিয়ে মুসলিম বিশ্বে সহানুভূতি নিয়ে নিলেন । কিন্তু জাকির নায়েক এখন মাহাতির মোহম্মদের কাছে অনুরোধের ঢেঁকি । জাকির নায়েককে কোন মুসলিম রাষ্ট্র আশ্রয় দিতে চায় না । এখন মালায়শিয়া আছে বিপাকে, কিছুদিন আগে জাকির নায়েক মালায়শিয়াতে সাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেওয়াতে  মালায়শিয়াতে প্রতিবাদের ঝড় হল, সরকার তদন্ত করল জাকির নায়েকে বক্তব্য দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিল । যদিও আপাতত জাকির নায়েককে মালায়শিয়ার সরকার  নজরদারির মধ্যে রেখেছেন । এমন কি মালায়শিয়ার পক্ষ থেকে ইয়েমেন , কুর্দি , কাশ্মীর কিংবা উঁইঘুরের মুসলমানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদও করেনি। মালায়শিয়াকে কোরান হাদিস অনুযায়ী মুসলিম ভ্রাতৃত্বের  নামে কোন পদক্ষেপও নিতে দেখা যায় না ।

এখন আমার পাঠকের নিকট প্রশ্ন মুসলিম মুসলিম কি ভাই ভাই ? আপনি যদি সত্যিকার ইমানদার মুসলমান হন তা হলে আপনি অবশ্যই এসব মুসলিম নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজনে। যুদ্ধ করা এখন ইমানি দায়িত্ব । আর যদি আপনি না করেন তা হলে অবশ্যই আমার আপনাকে ভণ্ড বলার অধিকার আছে । কেননা মুসলিমরা মুখে মুখে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা বলে সবাইকে বিভ্রান্তি করে এবং নিজ স্বার্থের জন্য কোরান হাদিস তোয়াক্কা না করে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে । আমি মুসলিমদের এই ভণ্ডামি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধ তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি , এখন আপনার পালা । আসুন মানবিকতা স্থাপনের লক্ষ্যে কোরান-হাদিস অনুযায়ী এসব ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তীব্র নিন্দা জানাই ।

ভাল থাকবেন ।

জ্যাক পিটার ।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of