ধান ও রূপসী কাব্য (শেষ পর্ব)

প্রায় একমাসে বাড়ির সবার সাথে পরিচয়ঘটে আমার। আমিনদ্দির ৪ বিবির সবাইকে এখন চিনি আমি। তাদেরকে খালাম্মা বলে ডাকি। এ বাড়ির মহিলারা তেমন পর্দা করেনা। ভিনপুরুষ কৃষাণ শ্রমিকদের সামনে আসতে সঙ্কোচ করেনা তারা। মহিলারাও কাজ করে পুরুষদের মতই। ভেতরে রান্না ছাড়াও তারা বাইরে করে ধানের কাজ, গরুকে ফ্যান পানি দেয়া, হাঁসমুরগির দেখাশোনাসহ নানাবিধ কাজে। এমনকি ঘরের আশেপাশের মৌসুমী সব্জির গাছগুলো ৪-বৌ পরিচর্যা করে তাদের সন্তানদের নিয়ে। লেখাপড়া সম্ভবত এ গাঁয়ে নেই। কারণ এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা কেউই স্কুলে যায়না। সবাই মা বাবার সাথে ঘাটে মাঠে কাজ করে। তবে নামাজ কালাম শেখার জন্য ছোট ছেলেমেয়েরা মসজিদে যায় ফজরের পর। সুর করে সুরাকিরাত পরে তারা।

:

গরম পোশাক না থাকাতে, আর রাতে ছেঁড়া কাঁথায় শীত না মানাতে কাশি আর জ্বর হলো আমার একদিন। তা নিয়েই গেলাম ধান কাটতে। ধান কাটছি আর কাশছি তা দেখে আমিনদ্দি কপালে হাত দেয় আমার। বলে “আজ ধান কাটতে হইবো তোমার। আমার লগে বাড়ি চলো” বলেই হাত ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে যায় আমায়। উঠানে নিজের বিছানায় শুয়ে থাকতে বলে আমাকে। বাজারের ফার্মেসি থেকে দুটো জ্বরের ট্যাবলেট এনে খেতে দেয়। মেয়ে রূপসীকে ডেকে বলে – “মা, এটটু বাশক পাতার রস ছেইচা দাও মিন্টু মিয়ারে। ওনার কাশ হইছে”! একটু পর মাটির খোড়ায় পাতার রস নিয়ে রূপসী বসে আমার বিছানার পাশে। গায়ে কপালে হাত দেয় স্বতস্ফূর্তভাবে সে। অব্যাহত কাঁশি দেখে বলে – “ভাল কাশই বাজাইছেন বিদেশ আইয়া। এখন কে করবো আপনের তায়তালাপ”! আমি একটু শুকনো হাসি হেসে বললাম – “তোমাগো বাড়ি আইছি, তাই তুমি করবা”! -‘ক্যান আমি আপনার বউ নেহি যে খেদমত করুম” বলে চোখ টিপে হাসে আমার দিকে। ভেজা কাপড় এনে গা মুছিয়ে দেয়। তাতে কাতুকুতু লাগছে দেখে নিজে আর কাতুকুতু দেয় ইচ্ছে করে। রহস্যের হাসি হাসে সে! পুরো দুদিন রূপসীর সেবায় উঠে বসি আমি! সে মা বাবাকে দেখিয়ে এবং গোপনে দুভাবেই সেবা করে আমাকে নিজ পরিবারের সদস্যের মত। ঘর থেকে কারো পুরনো এক উলেন সোয়েটার এনে দেয়। যা গায়ে দিয়ে জ্বর থেকে উঠে দাঁড়াই তৃতীয় দিনে!

:

আবার পুরোদমে ধানকাটা মাড়াইয়ের গতানুগতিক কাজ শুরু করি। দেখতে দেখতে অর্ধেকের বেশি জমির ধানকাটা শেষ হয়ে যায়। মাড়াই না থাকলে সন্ধ্যার পর স্থানীয় বাজারে যাই। হাঁটে আগত গাঁয়ের বন্ধুদের খোঁজখবর নেই।। কার কেমন ধান কাটা হচ্ছে, আমার জ্বর কেমন হয়েছে এমন খোঁজ নেয় পরিচিত বন্ধুরা। মাঝে মধ্যে আমিনদ্দির ৪ ঘরেরই ফুটফরমাস খাটি। বাজারের দোকান থেকে তেল-নুন এনে দেই তাদের কথামত। এক সন্ধ্যায় ৫০-টাকা হাতে দিয়ে রূপসী বলে – “মা কইছে জিলাপি কিনা আনতে। তবে অন্য ঘরের কেউ যেন না দেখে, গোপনে আনবেন”! কথামত বাজার থেকে কলাপাতায় জিলাপি কিনে চাঁদরে ঢেকে রূপসীর ঘরে ঢুকে তাকে পেয়ে যাই। হাত থেকে ছো মেরে জিলাপি নিয়ে আমার মুখে ঠেসে দিয়ে বলে – “নেন আপনে তো আমারে খাওয়াইবেন না, আমার হাতে খান”। সাহস পেয়ে আমি একটা জিলাপি তুলে দেই তার মুখে। সে আমার আঙুল কামড়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে রহস্যের হাসি হাসে। এর মাঝে ওর মা চলে আসে। তাকে দেখে বলি – “খালাম্মা আপনে নাকি জিলাপি খাইতে চাইছেন”! আকাশ থেকে পড়ে রূপসীর মা। বিস্ময়ে বলে – “কে কইলো”? এর মাঝে রূপসী মাকে বলে – “তোমার নামে আমি আনাইছি মা। আমার খাইতে মন চাইছে”! মা মেয়ে জিলাপি নিয়ে ঘরে ঢোকার প্রাক্কালে নাহার আস্তে করে চিমটি দিয়ে বলে, বহেন! জিলাপি না খাইয়া যাইয়েন না। ঘরের চৌকিতে বসে থাকলে একটা রেকাবিতে কটা জিলাপি নিয়ে এসে আমার গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আবার মুখে তুলে দিতে চায় সে। লজ্জায় দৌঁড়ে বাইরে চলে আসি আমি!

:

বাজারে গিয়া জিলাপির দোকানে বসে একান্তে চিন্তা করতে থাকি রূপসীর কথা। সে কি আমার প্রেমে পড়েছে? দেখতে দেখতে দুমাস শেষ হয়ে যায়। এবার হিসাব কিতাব করে দেশে ফিরে যেতে হবে আমাদের। রাতে এক ফাঁকে রূপসী আমার বাহুতে স্পর্শ করে বলে – “আপনে আমাদের ঘরে থাইকা যান, বাবারে বইলা গরু কিনুম আমরা। সকলের গরু আছে আমাগো গরু নাই। আপনে থাকলে আমরাও গরু পালুম”!

– ‘তুমি কি চাও আমি থাকি’?

– ‘হ চাই’। হেসে মুখ রাঙিয়ে বললো রূপসী! ঘরের ভেতরে যাওয়ার আগে আমার গালে চিমটি কেটে যায় সে ভালবাসার। আর বলে যায় – “দুধের কচি বাচ্চা, কিচ্ছু বোঝে না যেন”! রূপসীর আচরণে বিস্মিত হই আমি। তরুণ বয়সে রূপসীর প্রেমজ বাতাস দোলা দেয় মনে আমার!

:

হিসাব কিতাব শেষ হয় আমাদের। ৪ মন ২০ সের ধান পেয়েছি আমি মজুরী হিসেবে। আমিনদ্দি মানুষ ভাল। তাই মিল করে আমাকে ৫ মন ধান দিয়েছে সে। আর বলেছে – আমি চাইলে মাইনে করে তার বাড়ি থাকতে পারি। আর চইলা গেলে আগামি অগ্রহায়ণে আবার যেন আসি এ বাড়িতে”! কিন্তু রূপসীর টানে যাওয়া হলোনা আমার। আমার সাথে আগত সবাই ফিরে যাচ্ছে আমাদের গাঁয়ে। তাদের হাতে ধান বিক্রির টাকা আর চিঠি লিখে দিলাম মা বাবার কাছে। আমি রয়ে গেলাম বেপারী বাড়ি। এখন রূপসীদের গরু রাখি। ওদের ঘরে খাই দাই ঘুমাই। রীতি অনুযায়ী নতুন লুঙ্গি আর গামছা কিনে দিয়েছে রূপসীর বাবা আমিনন্দি। ঘরের সদস্যের মতই থাকি আমি। সুযোগ পেলেই কাছে আসে রূপসী। ঘর একা থাকলে রূপসী আমি একান্তে কাছাকাছি হই। বুকে বুক রেখে ধুকপকানি শুনি একে অপরের। সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয় আমাদের। একদিন রূপসী কণ্ঠলগ্ন হয়ে বলে – “আপনারে ছাড়া বাঁচুম না মিয়া”! তার মাথায় হাত রেখে বলি – “আমার লগে আমাগো দেশে যাইবা”? মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় কোমলমতি রূপসী। গাল স্পর্শ করে বলে –

– আপনে যেখানে লইয়া যান, যামু আমি!

– তোমার মা বাপ কি তোমারে আমার লগে দিবো?

– না দিলে পালাইয়া যামু!

:

এক সন্ধ্যায় বাজার থেকে এসে খালি ঘরে পাই রূপসীকে। সে বাহুলগ্ন হয় আমার। ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে চায়। আকস্মিক পেছনে তার মা এসে দাঁড়ায় কখন যেন। যা আমরা দুজনের কেউই লক্ষ্য করিনা। মা ধমক দেয় রূপসী আর আমাকে। রাত দশটার দিকে ঘর ঢোকে আমিনন্দি বেপারী। মুখ কালো করে বলো – “মিন্টু মিয়া তোমারে ভালা মানুষ বইলা মনে করছিলাম। কিন্তু তুমি ঘরের ইন্দুর হইয়া বান কাটছো”। কতগুলো টাকা আমার সামনে রেখে দিয়া বলে – “এই নাও তোমার হিসাব। কাইল সকালে চইলা যাইবা। তোমারে আর রাখুম না। মনে রাইখো, এককালে চরের লাঠিয়াল আছিলাম। রামদা বল্লম চালাইছি”! কোন কথা না বলে মাটির দিকে চেয়ে থাকি আমি। আমিনন্দি চলে গেলে, টাকা কটা জামার পকেটে রেখে দিয়ে ঘুমাতে যাই আমি।

:

অনেক রাত হয়, বাইরে প্যাঁচা আর তক্ষক ডাকে কিন্তু চোখে ঘুম আসেনা আমার। সকালে চলে যেতে হবে আমাকে কিন্তু রূপসী মেয়েটার কি হবে! অন্ধকার রাতে মাথায় কে যেন হাত রাখে আকস্মিক। কানের কাছে মুখ এনে বলে – “ভয় পাইয়েন না। আমি রূপসী”! কথা বলে জড়িয়ে ধরে আমায়। ফিসফিসিয়ে বলে – “তাড়াতাড়ি চলেন, আমরা পালাইয়া যাই”! ভয় জড়ানো কণ্ঠে বলি – “কই যাবে এতো রাতে”! আবার আমার মুখের কাছে মুখ এনে বলে – “আপনার দেশে যামু। ছোট নৌকাটা নিয়া। তাড়াতাড়ি ওঠেন”!

:

রূপসী হাতে একটা পুটুলি লয়, তাতে কি সব জিনিসপত্র। সমর্পণে দরজা খুলে বাইরে বের হই আমরা। কুয়াশা ঢাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে পাইনা। কেবল দুজনে দুজনের হাত ধরে নদীর ঘাটের দিকে এগিয়ে যাই এক পরম বিশ্বাসে। ঘাটে এসে লগি তুলে নৌকো খুলি কিন্তু বৈঠা কই! রূপসীকে নৌকোয় বসিয়ে আবার বাড়ির দিকে আসি বৈঠার খোঁজে। দুটো বৈঠা হাতে নিয়ে দৌঁড়াতে থাকি ঘাটের দিকে। শেষ রাতের শীত কুয়াশায় জমে যাচ্ছে রূপসী। আমাকে দেখে বলে – “এইবার নৌকা ছাইড়া দেন”। নদীর যেদিকে তাকাই কেবলই ঘন কুয়াশা। কোথাও ঠাওর করতে পারিনা কোন দিকে যাবো আমরা। শুকতারা দেখে তার বিপরীত দিকে নৌকো ঠেলে দেই। কিন্তু পেছনে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। ঝাঁঝালো টর্চের আলো পড়ে রূপসীর চোখে। চিৎকার করে ওর বাবা আমিনন্দি ডাকে “রূপসী”! কথা না বলে হাতে বৈঠা নেয় রূপসী। সেও প্রাণপণে বাইতে থাকে আমার সাথে। ঘাট থেকে একটা বল্লম ছুঁড়ে মারে নৌকার দিকে। তা হাত খানেকের জন্য পানিতে গিয়ে ফসকে যায়। আমরা দুজনে বাইতে থাকি ছোট ডিঙি নৌকা। পেছনে বড় নৌকো খুলে তাতে উঠে বসে পিতা আমিনন্দি আর তাদের সাথের লোকজন। টর্চের আলো আর তাদের কথা শুনে বুঝতে পারি তারা এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। মাঝরাতের কুয়াশাঢাকা অন্ধকার নদীতে রূপসী আর আমি হাতড়াতে থাকি এক জীবনের হাতছানি, জানিনা সে জীবন কতদূর। আমরা কি পৌঁছতে পারবো আমাদের গাঁয়ে এ ঘন কুয়াশার বন্ধন ছিন্ন করে!

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of