হায় রে ধর্মানুভূতি, হায় ধর্মান্ধতা।

আবারও কথিত ‘ধর্মানুভুতিতে’ আঘাতের কারনে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলো বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বীপ জেলা ভোলায়। শুরুতে ধর্মানুভূতি নিয়ে লেখা শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ স্যারের ‘ধর্মানুভূতির উপকথা’ নামক প্রবন্ধ হতে কয়েক লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করি- “একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় আজকাল, কথাটি হচ্ছে ‘ধর্মানুভূতি’। কথাটি সাধারণত একলা উচ্চারিত হয় না, সাথে জড়িয়ে থাকে ‘আহত’ ও ‘আঘাত’ কথা দুটি; শোনা যায় ‘ধর্মানুভূতি আহত’ হওয়ার বা ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত’ লাগার কথা। আজকাল নিরন্তর আহত আর আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে মানুষের একটি অসাধারণ অনুভূতি, যার নাম ধর্মানুভূতি । মানুষ খুবই কোমল স্পর্শকাতর জীব, তার রয়েছে ফুলের পাপড়ির মতো অজস্র অনুভূতি; স্বর্গচ্যুত মানুষেরা বাস করছে নরকের থেকেও নির্মম পৃথিবীতে, যেখানে নিষ্ঠুরতা আর অপবিত্রতা সীমাহীন; তাই তার বিচিত্র ধরনের কোমল অনুভূতি যে প্রতিমুহূর্তে আহত রক্তাক্ত হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন সুদিন আসবে, সে আবার স্বর্গে ফিরে যাবে, তখন ওই বিশুদ্ধ জগতে সে পাবে বিশুদ্ধ শান্তি; সেখানে তার কোনো অনুভূতি আহত হবে না, ফুলের টোকাটিও লাগবে না তার কোনো শুদ্ধ অনুভূতির গায়ে। অনন্ত শান্তির মধ্যে সেখানে সে বিলাস করতে থাকবে। কিন্তু পৃথিবী অশুদ্ধ এলাকা, এখানে আহত হচ্ছে, আঘাত পাচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে তার নানা অনুভূতি- এটা খুবই বেদনার কথা; এবং সবচেয়ে আহত হচ্ছে একটি অনুভূতি, যেটি পুরোপুরি পৌরাণিক উপকথার মতো, তার নাম ধর্মানুভূতি। মানুষ বিশ্বকে অনুভব করে পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে; ইন্দ্রিয়গুলো মানুষকে দেয় রূপ রস গন্ধ স্পর্শ শ্রুতির অনুভূতি; কিন্তু মানুষ, একমাত্র প্রতিভাবান প্রাণী মহাবিশ্বে, শুধু এ-পাঁচটি ইন্দ্রিয়েই সীমাবদ্ধ নয়, তার আছে অজস্র ইন্দ্রিয়াতীত ইন্দ্রিয়। তার আছে একটি ইন্দ্রিয়, যার নাম দিতে পারি সৌন্দর্যেন্দ্রিয়, যা দিয়ে সে অনুভব করে সৌন্দর্য; আছে একটি ইন্দ্রিয়, নাম দিতে পারি শিল্পেন্দ্রিয়, যা দিয়ে সে উপভোগ করে শিল্পকলা; এমন অনেক ইন্দ্রিয় রয়েছে তার, সেগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে প্রখর প্রবল প্রচণ্ড হয়ে উঠেছে তার ধর্মেন্দ্রিয়, যা দিয়ে সে অনুভব করে ধর্ম, তার ভেতরে বিকশিত হয় ধর্মানুভূতি, এবং আজকের অধার্মিক বিশ্বে তার স্পর্শকাতর ধর্মানুভূতি আহত হয়, আঘাতপ্রাপ্ত হয় ভোরবেলা থেকে ভোরবেলা। অন্য ইন্দ্রিয়গুলোকে পরাভূত ক’রে এখন এটিই হয়ে উঠেছে মানুষের প্রধান ইন্দ্রিয়; ধর্মেন্দ্রিয় সারাক্ষণ জেগে থাকে, তার চোখে ঘুম নেই; জেগে জেগে সে পাহারা দেয় ধর্মানুভূতিকে, মাঝেমাঝেই আহত হয়ে চিৎকার ক’রে ওঠে এবং বোধ করে প্রচণ্ড উত্তেজনা। এটা শিল্পানুভূতির মতো দুর্বল অনুভূতি নয় যে আহত হওয়ার যন্ত্রণা একলাই সহ্য করবে। এটা আহত হ’লে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ধর্মানুভূতির উত্তেজনা ও ক্ষিপ্ততায় এখন বিশ্ব কাঁপছে।

আহত বা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া সুখকর অনুভূতি নয়; শরীরে আঘাত পেলে আমরা চিৎকার ক’রে উঠি। শরীরের থেকেও মনোরম যে-সব ইন্দ্রিয় আছে আমাদের, সেগুলো আহত হ’লেও চিৎকার ক’রে ওঠার কথা; তবে সেগুলোর চিৎকারের স্বর আমরা শুনতে পাই না।”
প্রয়াত বন্ধুবর ওয়াশিকুর বাবু লেখেছিলো “ধর্মানুভূতি দিয়ে চাষাবাদ হয়না, উৎপাদন হয়না, শিক্ষা হয়না, গবেষনা হয়না, শিল্প-সাহিত্য হয়না। ধর্মানুভূতি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা হয়, দাঙ্গা হয়, লুটপাট হয়, ধর্ষন হয়, নোংরা রাজনীতি হয়”।
যে দুজন মানুষের কথা উপরে লিখলাম দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, দুজনকেই ধর্মান্ধ পশুদের শিকার হয়ে অকালে প্রান হারাতে হয়েছে।
আহারে ধর্মানুভুতি! ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিকট রাষ্ট্র যে কতটা অসহায়! তা আজকে আবারও প্রমান হলো।
গতকাল ২০ অক্টোবর রোববার ভোরে ইমানী জোশে তৌহিদি জনতা ভোলা জেলার বোরহানগঞ্জ থানার হিন্দু ছেলে শুভর ফাঁসির দাবি নিয়ে থানা ঘেরাও করলো পুলিশের উপর চড়াও হলে পুলিশের গুলিতে যে প্রান গেলো এদের প্রাণের উপর কোন মায়া নেই! কেননা এদের মস্তিষ্ক ভাইরাস আক্রান্ত। এরা সরবে বলে থাকে আমরা যারা ধর্মহীন, এই ধর্মহীনেরা হলো পশুর সমতুল্য!😂😂😂 এরা কি বুঝতে পারে না ধর্ম তাদেরকে পশুর চাইতে অধম করে তুলে। মুখে মুখে অসাম্প্রদায়িকতার, সম্প্রীতির বুলি আউড়ানো ধার্মিকেরা যে ভেতরে ভেতরে কতটা সাম্প্রদায়িক তা সহজে অনুমেয়। ঘৃণার বিষবাস্পে এরা নীল হয়ে গেছে। অতীতে ঘটে যাওয়া রামু, নাসিরনগর, মাগুরা, দাউদকান্দি, এলাকার ঘটনাগুলো সারাদেশবাসী জানে সেইসব ঘটনার আলোকে বলা যায় যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা আজ কতটা বিপর্যস্ত তা আমাকে আর বলতে হবে না। কোন সংখ্যালঘু ব্যক্তিই নিজেকে, নিজের পরিবারকে অনিশ্চিয়তায় ফেলে, জীবন বিপন্ন করতে জেনে বুঝে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের আল্লাহ-নবীকে নিয়ে কটুক্তি, ব্যঙ্গ করতে যাবে না। একটা বাচ্চাছেলেও জানে এর পরিনাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে। জলে থেকে কুমিরের সংগে লড়াইয়ের দুঃসাহস এদের নেই। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি বাংলাদেশী হিন্দুরা অধিকাংশই মেয়েলী স্বভাবের! এরা উচ্চস্বরে কোন সংখ্যায় গরিষ্ঠ লোকের সাথে কথা বলে না।
উস্কানীমূলক বার্তা প্রদানের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার আগেই ছেলেটা পুলিশের কাছে গিয়ে জানিয়েছে ওর ফেসবুক আইডি হ্যাকড। সে পুলিশের কাছে উপস্হিত থাকাকালীন সময়েও বার্তা প্রদান করা হয়েছে। তারপরেও তৌহিদি জনতার থানা ঘেরাও করে পুলিশের উপর আক্রমন করার ইমানী জোস চাগার দিয়ে ওঠে। এরা সবকিছুর মধ্যেই ইহুদি নাসারা, আমেরিকা, ভারতের ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলে, কিন্তু কাঁঠালপাতা খাওয়া মাথায় বিবেক বুদ্ধি বলে কিছু আছে বলে বোধহয় না। আহারে, অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতি আর কত দেখবো সম্প্রীতির নমুনা?😥

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of