লতা এবং ভালবাসার বৃক্ষ (পর্ব : ১)

ঢাকা থেকে রাঙাবালিগামী লঞ্চের প্রথম শ্রেণির যাত্রী আমি। আমি রাঙাবালি যাবোনা, যাবো আমার দ্বীপগাঁয়ে। যা খুব ভোরে স্টপেজ দেয় আমাদের নদীর ঘাটে। এ লঞ্চটি বেশ ভাল। তা ছাড়া লঞ্চের স্টাফরা প্রায় সবাই পরিচিত আমার। সারেং সলেমান আমার গাঁয়েরই ছেলে। তাই এটাতে যেতে প্রেফার করি আমি। আজ কি কারণে যেন দেরী করেছে লঞ্চ। গভীর রাতে মেঘনার ভাসমান চরে নাকি প্রায় দুঘন্টা আটকে ছিল এ দ্বিতল লঞ্চটি। তাই সম্ভবত এ দেরী। এখন সকাল সাতটা। তারপর আরো ঘন্টাখানেক লাগবে আমাদের স্টপেজে পৌঁছতে। মানে পৌঁছতে পৌঁছতে আটটা। আমি ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হচ্ছি নামার জন্যে। কেবিনের পেছনে কি এক জটলা দেখে এগিয়ে যাই সামনে। একটা মেয়েকে কেন্দ্র করে জটলা করছে অনেক লঞ্চযাত্রী। পরিচিত স্টাফদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারি – লতা নামের এক ভারতীয় মেয়ে ভুলক্রমে লঞ্চে উঠে বসেছে ঢাকা থেকে, কোথায় যাবে জানেনা সে। তাই ঘাবড়ে গিয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে একাকি। আমি জানতে চাই তার বাড়ি কোথায় ভারতের। সে কুচবিহার জেলার চ্যাঙড়াবান্দা এলাকার কথা জানায়। তারপর যে ইতিহাস শুনি তাতে মন ভারাক্রান্ত হয় আমার মত অনেক লঞ্চযাত্রীর! যার মর্মবাণী এমন –

:

দুবছর আগে ফেসবুকে পরিচিত হয় ঢাকার ছেলে মোহাম্মদ ফরহাদের সঙ্গে। ইনবক্সে চ্যাট করতে করতে আন্তরিকতা বাড়ে তাদের। একদিন তা প্রেমে গড়ায়। লতা মন্ডল বিশ্বাস করে বাংলাদেশের ফরহাদকে। লতাদের বাড়ি চ্যাংড়াবান্দা বর্ডারের খুব কাছেই। চ্যাংড়াবান্দা সাব পোস্ট অফিস সংলগ্ন রাস্তার ধারে ওদের বাড়ি। বাবা দিন মজুরের কাজ করে। মা রান্না করে একটা স্কুলে। একাদশ শ্রেণিতে পড়তো লতা স্থানীয় মা অন্নদাদেবী বিদ্যামন্দিরে। ভালবাসার কথা বলে ফরহাদ বাংলাদেশের বুড়িমারি সীমান্তে দেখা করতে যায় লতার সঙ্গে। প্রেমের টানে সীমান্ত রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ডের ধানক্ষেতে দেখা করে ওরা। মাঘের কুয়াশার এক ফাঁকে ফরহাদের হাত ধরে লতা ঢুকে পড়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে। ষোল বছরের টিনএজ লতা আইনি জটিলতা ইত্যাদি চিন্তা না করে এক আনন্দ বাতাসে ভর করে ফরহাদের হাত ধরে উঠে বসে ঢাকার বাসে। ঢাকা পৌঁছতে সন্ধ্যা হয় ওদের। ফরহাদ লতাকে তার বাড়িতে না নিয়ে ঢাকার সদরঘাট নিয়ে আসে কেন যেন। লতাকে টার্মিনালে বসিয়ে কজন লোকের সাথে কথা বলে ফরহাদ। এক বান্ডেল টাকার বিনিময়ে লতাকে তাদের হাতে তুলে দিতে যায় ফরহাদ! সন্দেহ আর ভয় ঢোকে লতার মনে। লোকগুলো গরু বোঝাই ট্রলারে করে দৌলতদিয়া ঘাট নেবে লতাকে। সব কথা শুনে আতঙ্কে আঁতকে উঠে ভারতীয় এ কৈশোরিক মেয়েটি। আসলে গার্লস ট্রাফিকিংয়ের শিকার হয়েছে সে! ফরহাদদের কথা বলার এক ফাঁকে আকস্মিক লতা ভীড়ের মাঝে রাঙাবালির এ লঞ্চে উঠে পেছনের টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। লঞ্চ ছাড়ার ঘন্টা খানেক পর টয়লেট থেকে বের হয় সে। গুটিসুটি মেরে ডেকে এক মহিলার বিছানায় বসে থাকে সারারাত। ভোর হলে ঐ মহিলাকে খুলে বলে তার বিপদের কাহিনি।

:

ঘটনা শুনে আঁতকে উঠি আমি। সে মহাবিপদ থেকে আপাতত বাঁচলেও, অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আরেক বিপদের মধ্যে আছে বুঝতে পারি আমি। তারপর অচেনা অজানা রাঙাবালি চরাঞ্চলে গিয়ে আবার কোন নতুন বিপদে পড়ে তা আঁচ করে ভীষণ চিন্তিত হই আমি। হুজুর টাইপের উপস্থিত দুযাত্রী তার উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে বলে টিপ্পনী কাটে। হিন্দুর মেয়ে হয়ে মুসলমানের সাথে ঘর ছেড়েছে এমন মেয়েকে পুলিশে দেয়া উচিত এমন কথাও বলে তারা। লঞ্চের পরিচিত স্টাফরা অসহায় মেয়েটিকে হেলপ করতে বলে আমাকে। মেয়েটিকে লঞ্চে রেখে গেলে সে আরো বিপদে পড়তে পারে আঁচ করে, আমার সাথে নামার প্রস্তাব দেই তাকে। মেয়েটি কি করবে বুঝতে পারেনা একাকি। লঞ্চ স্টাফরা অনেকটা জোর করে তাকে তুলে দেয় আমার হাতে। আমাদের দ্বীপগাঁয়ের স্টেশনে নামি আমি অচেনা ভারতীয় লতা মন্ডলকে নিয়ে!

:

[এর পরের পর্ব কাল]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of