তৌহিদী জনতা

গতকাল এক উত্তেজিত যুবকের ভিডিও দেখলাম, যেখানে তিনি চিৎকার করে-‘shoot me, kill me, kill him’ জাতীয় উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। এই ভিডিওটিকে উদ্দেশ্যে করে দেশীয় কথিত প্রগতিশীল, নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিবর্গদের হাসিঠাট্টা ব্যাঙ্গবিদ্রূপ করে স্ট্যাটাস ও কমেন্ট করতে দেখলাম। এটাই হচ্ছে দেশীয় কথিত প্রগতিবাদীদের চিন্তার সীমাবন্ধতা। তারা সব কিছু হাসিঠাট্টার সাথে উড়িয়ে দিয়ে দায় থেকে অবসর নেন। সেই উত্তেজিত যুবকটি একটি ভয়ংকর বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন-যা সকলেই ব্যাঙ্গবিদ্রূপের মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ বিষয়টি খুবই গম্ভীর ও ভয়াবহ সংকেতের পূর্বাভাস।

উত্তেজিত যুবকটি বলেন, ‘৯০% মুসলমানের দেশে মুসলিম নিধন চলছে।’ বাঙলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাক্যটি শুনতে হাস্যকর মনে হলেও এর পিছনে যে কোন ভয়ংকর ষড়যন্ত্র কাজ করছে না তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বাক্যটি প্রথম শুনি ২০১৩ সালে। প্রেসক্লাবের সামনে একদল কিশোর চিৎকার করেছিল এই বলে যে, ‘৯০% মুসলিমের দেশে মুসলিম নিধন চলছে’। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল শত শত কিশোর, তারা আলাপআলোচনা করছিল এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে পাখির মত করে মুসলিম নিধন নাকি চলছে। এই বাক্যটি শুধু ভিডিও প্রকাশ করা সেই যুবকটির চিন্তাভাবনা নয়, বরং বাঙলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা হাজার হাজার মাদ্রাসা, ওয়াজমাহফিল, মসজিদের কট্টর সন্ত্রাসপন্থী ইসলামিস্টদের প্রোপাগান্ডার শিকার হওয়া কোটি কোটি নির্বোধের বিশ্বাস। যা তারা নিখুঁত ও দক্ষতার সাথে কোটি কোটি অবুঝ, নির্বোধের অব্যবহৃত মগজে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

সম্প্রতি ভোলার ঘটনাটি প্রথম কিংবা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। ফেসবুককে কেন্দ্র করে ২০১১ সাল থেকে ২০১৯, প্রতি বছর হিন্দু ও বৌদ্ধদের নাম ব্যবহার করে জঙ্গি মুসলমানেরা সহিংস হামলা চালিয়েছে। পরবর্তীতে, প্রতিটি ঘটনার পিছনে কয়েকজন উগ্রবাদী মুসলমানকে শনাক্ত করা গেছে। এবারও একই, সম্পূর্ণ নতুন কিছু নয়। তবে একটি নতুন চিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে; তা হলঃ উগ্রবাদী মুসলমান জঙ্গিরা নিরপরাধ দুজনকে হত্যা করে তা পুলিশের ঘাড়ে চালানোর চেষ্টা করেছে এবং এই কারণেই তারা ময়নাতদন্ত না করার দাবি তুলেছে এবং গৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড কাদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছিল- তা অনুমান করা যায় এবং প্রশাসন ও রাষ্ট্র কতটা দুর্বল তা স্পষ্টত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে হিন্দু নিধন চালু হয়ে বর্তমানে সাড়ে সাত শতাংশে নামলেও দেশের সাধারণ ও অসাধারণ মুসলমানদের ধারণা ও বিশ্বাস যে, দেশের হিন্দুরা ভালো আছে ও নিরাপদে আছে, কোন দিন বাড়িঘর জ্বালানো হয় নি, জমি দখল করা হয়নি, হিন্দু নারী খুঁজে খুঁজে ধর্ষণ করা হয়, পিটায় পিটায় দেশছাড়া করার পরও উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায় বাঙলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে নাকি মুসলিম নিধন চলছে!

শক্তি, জ্ঞান এবং ধর্ম কোন সভ্য সমাজে একই পৃষ্ঠায় থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকতে পারে না। তবে বাস্তবতা হল অনেক রাষ্ট্রের অলিখিত বা মৌখিক ধর্মীয় অনুশীলন রয়েছে, যেমন বাঙলাদেশের। এবং এটি কেবল গণতন্ত্রের সাথে দ্বন্দ্বই নয়, শক্তি এবং জ্ঞানের সংমিশ্রণে একটি বিষাক্ত ধারা যা মৌলিকত্বকে ধ্বংস করে। ফলস্বরূপ, যখন ধর্ম একটি ক্ষমতা ধরে রাখে, তারা উৎপাদনশীল কিছুই করতে পারে না, নতুন কিছু তৈরি করতে পারে না, জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে, বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে তাদের কোনও অবদান থাকে না। এবং এটাই বর্তমানে বাঙলাদেশের রুঢ় চিত্র।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of