লতা এবং ভালবাসার বৃক্ষ (পর্ব : ২)

মা থাকলে এক ফোটাও চিন্তা করতাম না আমি। মা সব ব্যাপারে তড়িৎ ফয়সালা দিতো আমায়। কিন্তু এখন মা নেই, তাই হেড টিচার বোনকে ডেকে আনি নিজ বাড়িতে। তাকে খুলে বলি সব বৃত্তান্ত। সেও টেনশনে পড়ে ঘটনা শুনে। আপাতত বোনের ঘরে রাখতে বলি লতাকে। আর লতাকে বলে দেই, সে যেন কাউকে না বলে যে, সে ইন্ডিয়ান। তাহলে সমস্যা হতে পারে। লতা আমার শেখানো কথামতো মুখ বন্ধ রাখে। চারদিনের জন্যে গ্রামে এসেছি জরুরী কাছে। তাতে জমির ধান কাটা, পৈত্রিক জমির ধানের ভাগ বাটোয়ারা বর্গা চাষীদের সাথে, নদীতে চর জেগে উঠা জমির সীমানা নির্ধারণে আমার থাকা অত্যন্ত জরুরী। বোনের হাতে লতাকে তুলে দিয়ে কিভাবে চারদিন কেটে গেল বুঝতে পারিনা আমি। মাঝে কেবল একরাতে লতাকে নিয়ে নদীর তীরে এসে ফোন লাগিয়েছিলাম তার বাড়ি ভারতে। কারণ বোনের বাড়ি সিগন্যাল থাকেনা ঠিকমত, তাই স্পষ্ট কথা শুনতে নদীর তীরে আসতে হয় আমাদের। প্রথমে লতা ভয়ে কথা বলতে চায়নি তার মা বাবার সাথে। কিন্তু মেয়ের জন্য চিন্তা করছে তারা এমন সব কথা বলে রাজি করাই লতাকে। ফোন লাগিয়ে প্রথমে লতার বাবার সাথে কথা বলি আমি। বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলি সংক্ষেপে এবং আমার বাড়িতে ভালই আছে এমন কথাতে বিশ্বাস করেন লতার বাবা পরিমল মন্ডল। এখন তাকে বর্ডারে নিয়ে আসবো কিংবা যে কোনভাবে ভারতে পাঠাবো তাকে এমন নিশ্চয়তায় ভরসা পায় অচেনা পরিমল বাবু।

:

রাঙাবালির লঞ্চে লতার ঘটনাটি সবার জানা, তাই ওকেসহ ঐ লঞ্চে ওঠা নিরাপদ মনে হলোনা আমার। সুতরাং বোনের সাথে প্লান করে বিশেষ লঞ্চে বরিশাল চলে গেলাম আমরা। এবার ঢাকাগামী লঞ্চে উঠলাম বরিশাল থেকে। যে লঞ্চে লতা বা আমাকে চেনেনা কেউ। লঞ্চের কেবিনে লতা খুলে বললো তার বাকি কাহিনি। প্রেমিক ফরহাদের একটা নাম্বার দিলো সে আমাকে। বেশ কবার রিং করেও বন্ধ পেলাম নাম্বারটি। একটা ঠিকানাও দিলো ফরহাদের ঢাকার বাড়ির। যা সবই ইনবক্সে প্রেমিক ফরহাদ দিয়েছে তাকে। কেন সে এমন রিক্স নিয়ে ফরহাদের কথামত বাংলাদেশে ঢুকলো এমন কথাতে আত্মগ্লানিতে কাঁদলো মেয়েটি। বললো – “দাদা, দরিদ্রের সংসার আমাদের। ঘরে খুব শান্তিতে নেই ভাইবোনেরা। এক বোনের বিয়ে হয়েছে কোচবিহারে। সে বোনটাও অত্যাচারিত নেশাসক্ত জামাইবাবু থেকে। তাই বছর খানেক হলো ওদের বাড়িতে চলে এসেছে সেও”। তারপরো বাংলাদেশি ফরহাদকে কিভাবে বিশ্বাস করলো সে – এমন কথাতে লজ্জিত হলো মেয়েটি। বললো – ‘দাদা বুঝতে পারিনি প্রতারক সে। জীবনের প্রথম প্রেম। সুন্দর সুন্দর কথা বলেছিল সে। তার কথার ফাঁদে পড়েছি দাদা। এবার আমাকে রক্ষে করুন’! কিন্তু কিভাবে রক্ষা করবো তার কূলকিনারা খুঁজে পাইনা আমি!

:

পত্রিকায় অনেকবার দেখেছি – ভারত বা বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য ধরা পড়লে মামলা হয়। যতদিন না মামলার রায় হয়, ততদিন জেলে থাকতে হয় অনুপ্রবেশকারীকে। এসব কেসের রায় হতে ৩/৪ বছর চলে যায়। তার আগে বেরুতে পারেনা সংশ্লিষ্ট অপরাধী। তারপর তাকে কোর্টে প্রমাণ করতে হয় যে, সে কোন সন্ত্রাসী নয়, যা প্রমাণ করাও বেশ জটিল! তারপর যে বা যারা এসব অবৈধ প্রবেশকারীকে আশ্রয় বা সহায়তা দেয়, তাদের জন্যেও আছ দন্ডনীয় শাস্তি! এসব কুচিন্তায় কুলকিনারা করতে পারিনা কিভাবে সহায়তা করবো অসহায় মেয়েটিকে। বিশেষ করে ভারতে তাকে কিভাবে নিবিঘ্নে পাঠানো যায়। কারণ ইমিগ্রেশন আইন বড়ই ‘অবান্ধব’ দুদেশের সাধারণ নাগরিকের জন্যই!

:

ঢাকা ফিরে প্রথমেই ফরহাদের দেয়া ঠিকানায় হাজির হলাম একাকি। বুঝলাম ঠিকানাটি পুরোই ভুয়া। লতাকে ঠকানোর জন্য এমন মিথ্যে ঠিকানা ব্যবহার করেছে শঠ ফরহাদ। বাড়ির কেউ চেনেনা ফরহাদ নামের কাউকে। ছবি দেখেও কেউ চিনতে পারলো না। ঢাকাস্থ ভারতীয় দূতাবাসের জনৈক তৃতীয় সচিবের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম একটা অনুষ্ঠানে বছর খানেক আগে। ফোনে দেখা করতে চাইলাম তার সাথে। অনেক চেকিং গেট পার হয়ে অবশেষে দেখা হলো কাঙক্ষিত ব্যক্তির সাথে। খুলে বললাম পুরো ঘটনা তাকে। হেলপ চাইলাম লতাকে আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ পথে নিজ বাড়ি পাঠাতে। কিন্তু মেয়েটি যেহেতু অবৈধ পথে এদেশে ঢুকেছে, তাই বৈধ পথে পাঠানো যাবেনা তাকে, এমন ‘চাঁচাছোলা’ কথা বললেন তিনি। বরং আমাকে এ ঝামেলায় না জড়িয়ে, তাকে পুলিশের কাছে তুলে দিতে আইনী পরামর্শ দিলেন এ পেটি অফিসার। বুঝলাম আমাদের দেশের আমলা আর ভারতীয় আমলা একই। মানুষকে সহায়তা করতে চায়না তারা, কেবল আইনী জুজুর ভয় দেখায়। কিন্তু আমার মন সায় দিলোনা তার কথায়!

:

লতাকে পাঠাতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট বানানো যায় কিনা তারও খোঁজখবর নিলাম। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে এদেশে পাসপোর্টে এতো কড়াকড়ি যে, লতার পাসপোর্টও বানানো গেলনা। কারণ লতার ভোটার আইডি বা জন্ম নিবন্ধন কিছুই নেই বাংলাদেশের। ভারতীয় ভোলানাথ দাস আমার পরিচিত। বেনাপোলের ওপারে পেট্রাপোলে মানি এক্সচেঞ্জ আছে তার। পোর্টে কোন সমস্যা হলে টাকার বিনিময়ে হেলপ করে সে। একবার অসুস্থ্য ভাগ্নিকে চিকিৎসার জন্য বেনাপোল বর্ডারে নিলে, হাঁটতে অপারগ বিধায় বাংলাদেশের গাড়িসহ পেট্রোপোলে ঢুকে যাই আমরা। ভোলানাথ নিজে এসে হিন্দিতে বিএসএফ-কে সব বুঝিয়ে গাড়ি ভেতরে নেয়ার ব্যবস্থা করে সে। আরেকবার ভারতীয় ট্রানজিট ভিসাতে ভুটান গিয়ে ফিরতে কলকাতা চলে যাই আমি। শেখানে সাত দিন অবস্থানের পর পেট্রোপোল এলে ভোলানাথ দাস বিশেষ ব্যবস্থায় এ পোর্ট পার হতে আইনী সহায়তা করে আমাকে। সুতরাং ভোলানাথকে খুলে বলি পুরো ঘটনা এবং হেলপ চাই তার। কিন্তু ভোলানাথ দু:খ প্রকাশ করে আমার কাছে। জানায় – বৈধ পথে লতা কখনোই ঢুকতে পারবে না ভারতে। কেবল দালালের মাধ্যমে রাতে চেষ্টা করা যেতে পারে। তাতে অনেক সময় গুলি খেয়ে নিহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে! বর্ডার এখন বড়ই কড়া!

:

[এর পরের পর্ব কাল]

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of