লতা এবং ভালবাসার বৃক্ষ (পর্ব : ৩)

লতার বাবার সাথে আবার আলাপ করি ফোনে বেশ কবার। সব শুনে সে জানায় – যে ধান ক্ষেত দিয়ে লতা বাংলাদেশে ঢুকেছিল, সেখানে লতা এলে উনিও ঐ জমিতে এগিয়ে যাবেন মেয়েকে আনতে। গুলি খেলে বাবা-মেয়ে দুজনেই খাবেন। আমার পাসপোর্টে ভারতীয় ভিসা লাগানোই ছিল। তাই লতাকে বুড়িমারী তথা চ্যাংড়াবান্দা বর্ডারে পৌঁছাতে লালমনিরহাট ট্রেনে চেপে বসলাম একরাতে দুজনে। বুড়িমারি চেকপোস্টের ওপারেই লতাদের বাড়ি। বড় একটা তালগাছ দেখিয়ে লতা বললো – ‘ঐ তালগাছটা থেকে তাদের বাড়ি মাত্র ১০০ মিটার দূরে’! লতাকে শ্যামলী পরিবহণের ‘ওয়েটিং রুমে’ বসিয়ে দালাল খুঁজতে গেলাম বুড়িমারি বাজারে। কথা বলতে পারাপারের অনেক দালাল পাওয়া গেল কিন্তু গভীর রাতে পার করবে তারা গরু পাচারকারীদের সাথে গ্রুপ করে। যা মারাত্মক রিস্ক। কারণ প্রায়ই শুনি – গভীর রাতে গরু আনতে গিয়ে অনেকেই বিএসএফ’র গুলিতে নিহত হয়ে পড়ে থাকে বর্ডারের জঙ্গলে। লতার বাবা সাধারণ দিনমজুর। মেয়েকে উদ্ধারে এসে সেও বিপদে পড়তে পারে। তাই কেবল লতার স্কুলের আইডি আর অন্য ভারতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে চ্যাংড়াবান্দা বর্ডারে থাকতে বললাম তাকে, যাতে লতা ধরা পড়লে যেন দেখাতে পারে সে, মেয়ের ভারতীয় হওয়ার প্রমাণপত্র!

:

রাতে ভারতীয় বর্ডারে কারফিউ থাকে। তাই তখন পার হওয়া মারাত্মক বিপদজনক বলে রাত হওয়ার আগেই সন্ধ্যার প্রাক্কালে বর্ডার পার হতে পরামর্শ দিলাম লতাকে। সে যখন বর্ডার পার হওয়ার উদ্যোগ নেবে, আমিও তখন বৈধ পাসপোর্টে ঢুকবো ভারতে। যাতে কোন সমস্যা হলে তার মোকাবেলা করতে পারি যৌভভাবে। লতার হাতে একটা ছোট মোবাইল, একটা টর্চ, কাটাতার কাটার একটা প্লায়ার, একজোড়া শক্ত হাতমোজা আর দুপ্যাকেট বিস্কুট দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম, কিভাবে প্রয়াজনে কাঁটাতার কেটে ভেতরে ঢুকতে হবে কিংবা হাতে মোজা লাগিয়ে তার বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। কোন কারণে আটকে পড়লে ক্ষুধায় সে বিস্কুট খাবে, আর প্রয়োজনে ফোন করবে আমাকে! সব ঠিক থাকলে চ্যাংড়াবান্দা রেল স্টেশনের কাছে দেখা করবো আমরা। শীতের বিকেল। সাড়ে পাঁচটায় সন্ধ্যা হয়। বর্ডারে লোকজনের যাওয়া-আসা চলে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত। ঠিক সোয়া পাঁচটায় লতা আর আমি রওয়ানা দিলাম ভারতের দিকে। লতা বন্দর গেটের একটু পশ্চিম দিকের জঙ্গল দিয়ে ধান ক্ষেতের দিকে যাচ্ছে আবছা অন্ধকারে একাকি। চেনা পথ তার, সেপথে একবার এসেছিল সে। আর আমি বাংলাদেশ অংশে পাসপোর্টে ‘এক্সিট সিল’ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি চ্যাংড়াবান্দা বর্ডারের দিকে। বর্ডার পোর্টের শেষ সময়। তেমন ভীড় নেই। কজন মানুষ বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছে কেবল হাতের ব্যাগ টেনে।

:

সাড়ে পাঁচটার মধ্যে চ্যাংড়াবান্দা রেল স্টেশনে পৌঁছে গেলাম আমি। ফোন দিতেই তা কেটে গেল কি কারণে যেন। কথামত স্টেশনে পেয়ে গেলাম লতার বাবাকে। মাও এসেছে বাবার সাথে মেয়েকে এগিয়ে নিতে। ঘন্টাখানেক হয়ে গেল লতা এখনো পৌঁছলো না। আবার ফোন দিলাম লতাকে। কিন্তু ফোন বন্ধ পেলাম এবার। চিন্তিত হলাম তিন জনেই। ওর মার কান্না থামাতে পারছি না এবার। এ সময় ফোনতো বন্ধ থাকার কথা নয়। শেষ ট্রেনটা ছেড়ে দিলো নিউ জলপাইগুড়ি যেতে। চ্যাংড়াবান্দা প্লাটফর্ম একদম ফাঁকা। কেবল আমরা ৩-জন। দুজন পুলিশ এসে জানতে চাইলো আমরা কারা? কই যাবো? কথা শুনে আমার পাসপোর্ট দেখলো তারা। একজন বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি বলাতে পরিচয় জানতে চাইলো লতার মা বাবার। ৩-জনের পরিচয় পেয়ে অন্যদিকে চলে গেল তারা। রাত ১০-টা বেজে গেলো। লতা আর এলোনা স্টেশনে। আমাদের ৩-জনের স্টেশনে থাকাও নিরাপদ নয়। আন্তজার্তিক বর্ডার এলাকা। গোয়েন্দা বিভাগের নানাবিধ লোকজন চারদিকে। বিশেষ করে রাতে! লতার মা বাবাকে নিয়ে স্টেশন ত্যাগ করলাম আমরা। বুক টিপটিপ করতে থাকলো – ‘লতা কি তবে ধরা পড়লো? গুলি খেয়ে জঙ্গলে পড়ে থাকবে মেয়েটির লাশ!

:

লতার বাবা কাছের বিএসএফ ক্যাম্পে যেতে চাইলো। তাকে নিষেধ করলাম আমি। বরং লতার ব্যাপারে আরো ‘এ্যালার্ট’ হতে পারে তারা। লতাকেতো সব টেকনিক শিখিয়ে দিয়েছি আমি। কেবল টহলরত সেনা দেখলে ঘাপটি মেরে থাকবে সে, ওরা যখন অন্যদিকে চলতে শুরু করবে এই ফাঁকে ভারতে ঢুকবে লতা। ভারতীয় মেয়ে সে। এপারে ধরা পড়লেও ছাড়া পাবে সে, যদিনা রাতে তাকে গুলি করে অন্ধকারে। রাস্তাঘাটে থাকা নিরাপদ নয় মনে করে হাঁটতে থাকলাম লতাদের বাড়ির দিকে। দশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম ওদের অন্ধকার বাড়িতে। ঘরে বোন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। বর্ডার এলাকা সোজা পথে বাংলাদেশ এক কিলোমিটারের বেশি না! তাই এখানেও বাংলাদেশি সিমে নেট পেলাম আমি। কিন্তু ফোন বন্ধ কেন বুঝতে পারলাম না। দারুণ দুশ্চিন্তায় পড়লাম আমরা। লতার বাবা মন শক্ত করে রাখলেও, মা আর বোন কাঁদতে থাকলো মেয়ের শোঁকে। রাত ১২-টা বেজে গেল। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা ছায়ামূর্তি হেঁটে আসছে আমাদের দিকে। খোড়াতে খোড়াতে আমাদের কাছাকাছি হতেই চেতনা হারালো ছায়ামূর্তি। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি কর্দমাক্ত আহত রক্তাক্ত নিথর লতা!

:

[শেষপর্ব আগামী কাল]

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of