নারী কি সর্বদাই নিপীড়িত নাকি নিপীড়কও

গত দেড় মাস ধরে আমি খুব বিব্রত অবস্থায় ছিলাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচে’ ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নামে সেক্সুয়াল হেরাসমেন্টের অভিযোগ উঠেছিল। আমি দুঃস্বপ্নেও কোন দিন ভাবি নি যে আমার বন্ধু তালিকায় এমন কোন মানুষ থাকবেন- যিনি অমন ঘৃণিত কাজটি করতে পারেন! আমি একজন নারীবাদী, এবং আমি যে পরিবার ও নব্বই দশকের ফুলার রোডের যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলাম, এবং যে চর্চা ও বন্ধুমহলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, তাতে নারীবাদ আমাকে মানুষের মতন মানুষ হিশেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছিল।

যে বন্ধুটির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, সে আমাকে নিজ হাতে মানবাধিকার বিষয়ে পড়াশোনা বুঝতে এবং নারীবাদের বিভিন্ন থিওরি ও রাষ্ট্রের পলিসি বুঝতে সাহায্য করেছিল। সুতরাং আমি তার কাছে নানা কারণে ঋণী। কিন্তু অমন অভিযোগ উঠার পরও কি আমরা একই সিঁড়িতে দুজন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি? আমি কি তাকে ভরসা দিতে পারি যে, আমি এখনও তার সঙ্গেই আছি? প্রায় দশ বছর ধরে নারীবাদ নিয়ে লেখালেখি, মুক্তচিন্তা, আমার নীতি ও আদর্শকে কি অস্বীকার করতে পারি? যে তন্ত্রের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান, যে পশুত্বের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান- সেই সকল কিছুকে নারিজ করে আমি কি বন্ধুর বেশে নিপীড়কের পাশে দাঁড়াতে পারি? আমি এক মানসিক পীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম।

আমার মস্তিষ্ক আমাকে নীতির প্রশ্নে আপোষ করতে সাঁয় দেয় নি। কিন্তু, এটাও সত্যি যে, আমার আবেগ আমাকে অনেকবারই বন্ধুর পাশে না দাঁড়ালেও তার সাথে কথা বলতে আগ্রহী করে তুলেছিল। বন্ধুটি আমাকে ওয়াটসআপে অনেকবার মেসেজ দিয়েছিল। কিন্তু আমি উত্তর দেই নি। বন্ধুটি আমাকে একটি ‘বিশেষ’ মেসেজ পাঠিয়েছিল; যা আমি উল্লেখ করতে চাই, কারণ ঐ মেসেজটি আমাকে অনেক রাত ঘুমোতে দেয় নি।

মেসেজটি এমন ছিল যেঃ- তোমার কি মনে হয়, প্রতিটি পুরুষই কোন না কোন ভাবে নিপীড়ক? তোমার কি মনে হয়, সকল পুরুষই শুধু শরীর চায়? তোমার কি মনে হয়, সেক্সুয়াল হেরাসমেন্ট ও ধর্ষণের অভিযোগ তুললেই তা সত্য হতে বাধ্য?

প্রথমে, এই মেসেজটি আমাকে খুবই উত্তেজিত ও আক্রমণাত্মক এবং পরবর্তীতে ভাবিত করেছিল। আমার অতীতের কিছু ঘটনা বারবার মনে পড়ছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০১৫ সালে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনার প্রেক্ষিতে আমি ডজন ডজন স্ট্যাটাস দিয়ে একটি নারীর পক্ষ নিয়ে আন্দোলন সচল রাখার বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলাম। কিন্তু, পরবর্তীতে জানতে পারি, সবই নাটক ছিল। তখন আমার মত বোকাচোদা অনেকেই হয়েছিল। অমন চরিত্রের কয়েকজন নারীকে আমি/আমরা অনেকেই চিনি, যারা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে মিথ্যে অভিযোগ তুলে সুবিধা আদায় করে। যদিও এমন ঘটনা/অভিযোগের পিছনেও মোটাদাগে পুরুষতন্ত্র জড়িত। তবে সকল ক্ষেত্রেই নয়।

একদিন আমি সেই অভিযোগকারী নারীর মুখোমুখি দাড়াই। এবং আমি অনুভব করতে পারি যে, আমার ভাষা বদলে গেছে। আমার নারীবাদী লেখক ক্যারল ক্যনের লেখা মনে পড়ে। তিনি খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ভাষা কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে শুরু করে সাধারণ ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রভাব ফেলে! আমি অভিযোগকারী নারীটিকে ধরেই নিয়েছিলাম যে তিনি একজন ভিকটিম। তার অপ্রাসঙ্গিক বাক্যও আমার কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কেনো প্রাসঙ্গিক হয়েছিল? কারণ যখন আমরা কাউকে আক্রমণের শিকার ধরেই নেই বা নিপীড়নের শিকার বা ভুক্তভোগী ধরেই নেই- তখন আমরা অবচেতনভাবে তার অপ্রাসঙ্গিক শব্দকেও যুক্তিযুক্ত ভাবতে শুরু করি। পূর্বে যদি তিনি কোন অঘটন ঘটিয়েও থাকেন- তাহলেও আমরা না জানার ভান করি বা আমরা অতীত নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমাদের কাছে বর্তমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অনেক তথ্যপ্রমাণ, অনুসন্ধান, ভিডিও ফুটেজ, জিজ্ঞেসাবাদের পর- গতকাল জানা গেছে যে, আমার বন্ধুটির বিরুদ্ধে নারীটি মিথ্যে অভিযোগ তুলেছিল। একদিকে আমি খুশি হয়েছি, আবার ধাক্কাও খেয়েছি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অমন মিথ্যে অভিযোগের পিছনে নানা কারণ জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু এখানে কেনো? মূল ঘটনা নাকি কোন দিনই প্রকাশ করবে না- এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম।

গতকাল রাত দুটোয় খুব অস্বস্তি নিয়ে বন্ধুর রুমে গেলে- বন্ধু জড়িয়ে ধরে বলে, “নারী মানেই যে ভিকটিম, এটা পুরনো তত্ত্ব; ‘ক্ষমতা’, নারী পুরুষ উভয়কেই সমানুপাতিক হারে অপরাধী করে তুলতে পারে।”

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of