লতা এবং ভালবাসার বৃক্ষ (পর্ব : ৪) শেষ পর্ব

পুরো শরীর ভেজা থকথকে কাদা মাখা ওর। দুপা দিয়ে রক্ত ঝরছে। ধরাধরি করে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলাম ওকে। শরীরের জামা পাজামা ছেঁড়া বেশ কয়েক স্থানে। মেয়েটি কি তবে ধর্ষিতা হয়েছে! ওর মা আর বোন ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিলো ওর। হাত পা ও পিঠের তিন চার স্থানে মাংস ছিঁলে গেছে! রক্ত ঝরছে ক্রমাগত। ছেঁড়া কাপড়ের পট্টি বেঁধে দিলো তাতে। যাতে রক্ত পড়া বন্ধ হলো কিছুক্ষণ পর। মুখে বার কয়েক জলের ঝাপটা দিতে চোখ খুললো লতা। মা বাবা বোনের দিকে তাকালো চোখ বড় বড় করে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো – ‘দাদা আমি কি আমার বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছি? আপনি কি আমাদের বাড়ি’? চিনি আর নুনের জল খাওয়ানোর পর উঠে বসলো লতা। জানতে চাইলাম কি ব্যাপার রাত ১২-টা বাজলো কেন? আর তার কোন বিপদ হয়নিতো! মা বাবা বোনকে জড়িয়ে কান্নার পর ক্রমে খুলে বললো লতা তার বর্ডার পার হওয়ার রোমহর্ষক আতঙ্কিত কাহিনি!

:

‘যেখান দিয়ে পার হয়েছিলাম আমি বাংলাদেশ যেতে, সেখানে সন্ধ্যাকালে এসে দেখি উজ্জ্বল সার্চ লাইট লাগানো হয়েছে এবং টহল দিচ্ছে ভারতীয় অংশে বিএসএফের লোকজন। সম্ভবত তাদের কোন অনুষ্ঠান চলছিল তখন। ওখান দিয়ে পার হওয়া সম্ভব নয় মনে করে আরো পশ্চিম দিকে যেতে থাকলাম। কিন্তু পুরো এলাকাটা জল কাদা আর জঙ্গলে পূর্ণ। কাদাতে হাঁটতে গিয়ে জলে পড়ে গিয়ে মোবাইলটা ডুবে গেল জলে। তা আর পেলাম না। অনেক কষ্টে কাঁটাতারের বেড়া পেলাম কিন্তু তা দিয়ে ঢুকতে পারছিলাম না। অন্ধকারে কাঁটাতার একটু ফাঁক করে কাটতে চেষ্টা করলাম। তার ভেতর দিয়ে কোনরকমে মাথা ঢুকালাম। কিন্তু মাথা এপারে এলেও তাতে জামা কাপড় সব আটকে গেল। হাত পা ছিঁড়ে অনেক কষ্টে এপারে আসতে পারলাম। এপারে বানানো পাকা রাস্তা দিয়ে তখন বিএসএফয়ের গাড়ি টহল দিতে দেখলাম। তারা অনেক দূর চলে গেলে খোড়াতে খোড়াতে রাস্তা পার হয়ে চ্যাংড়াবান্দার জঙ্গলে ঢুকলাম। রাস্তা বাদ দিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে কিভাবে যে বাড়ি পৌঁছলাম এ রাতে তা আমি বলতে পারবো না’! এটুকু বলে আবার কাঁদতে থাকলো আহত লতা। তার সাথে কান্নায় যোগ দিলো মা, বোন আর বাবাও!

:

সকালে প্রচন্ড জ্বর উঠলো লতার। আমি বিদায় চাইলে চোখ ভিজিয়ে বললো – আপনার গাঁ থেকে এতদূর নিয়ে এসে এভাবে ফেলে চলে যাবেন? মা অম্বিকা হাসপাতালে নিয়ে গেলাম লতাকে ওর মা-বাবাসহ। রাতে ছিঁড়ে যাওয়া ঘায়ে মলমপট্টি করে হাই এন্টিবায়োটিক দিলো ডাক্তারবাবু। বললো – ঘায়ের ব্যথায় জ্বর উঠেছে। সাপোজিটরী দিলে কমে যাবে দুপুর নাগাদ। এবং জ্বর ছেড়ে দিলো দুপুরের আগেই। ওর ঔষধপত্র কিনে বাড়ি ফিরলাম আমরা দুপুরের মাঝেই! কাল থেকে কারো খাওয়া হয়নি। তাই ফেরার পথে দুপুরের খাবার কিনে আনলাম হোটেল থেকে। ঘরে ফিরে সবাই একসাথে খেলাম লতাদের রান্নাঘরে বসে। লতাও সামান্য মুখে দিলো আমাদের সাথে! মারাত্মক প্রাণশক্তি লতার। ৩-দিনের মাথায় বলতে গেলে সুস্থ্য হয়ে গেল সে। কেবল পায়ের ঘা তখনো কিছুটা কাঁচা রইল! তাই পা টেনে হাঁটতে হয় তাকে। ওর বাবা আবার কাজে যাওয়া শুরু করলো। মা যোগ দিলো স্কুলের ‘মিড ডে মিল’ রান্নার পাচিকা হিসেবে। যার মাসিক বেতন মাত্র দেড় হাজার টাকা।

:

আমায় এবার ফিরতে হবে ঢাকা। নানাবিধ জরুরী কাজ ফেলে আকস্মিক এসেছি লতার সাথে! এ কদিনে লতার জন্য মায়া হয়ে গেছে খুব। বিদায় নিতে গেলে লতার চোখের দিকে তাকিয়ে ভালবাসাময় বিলুপ্ত পাখির ঠোঁটে যেন জেগে থাকতে দেখি এক শুদ্ধাচারের প্রতিরূপ। জগতের অচেনা মানুষের এসব ভালবাসা যেন অন্তত আকাশের তারাহীন নীল অন্ধকারে ক্ষীয়মান আলোকবর্ষ হয়ে ভেসে থাকে আমার মননে। আমাদের জীবনের এসব ট্রাজিক শিলালিপি পাঠ করে যাই অনন্ত কাল যেন! বিদায় নিতে গেলে আমার হাত চেপে ধরে লতা। ওর অব্যক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মৃত তিতিরের ঠোঁটে যেন জেগে থাকে লতাময় এক পূর্ণতার জীবন। এবার সত্যি আমি কোন কথা না বলে অন্তহীন স্তব্ধতায় চেয়ে থাকি লতার দিকে! আসলে আমাদের জীবনের এসব না বলা শব্দরাশি অকথিত থেকে যায় অনাদিকাল হয়তো। লতা যেন মুক শব্দহীন সেই শ্রাবন্তির গ্রামীণ নদী। লতার ক্রমাগতিক কান্নার মাঝে পথে নামি আমি। ওদের বাড়ি থেকে দশ পনের মিনিটের পথ চ্যাংড়াবান্দা চেক পোস্ট। পথে নেমে আবার পেছনে ফিরে তাকাই এ গাঁয়ের প্রতারিত লতার দিকে। আর মনে মনে বলি –

 

“পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক

আমরা তখন প্রেমে পড়বো

মনে থাকবে?

বুকের মধ্যে মস্তো বড় ছাদ থাকবে

শীতলপাটি বিছিয়ে দেব;

সন্ধে হলে বসবো দু’জন।

একটা দুটো খসবে তারা

হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,

কান্ত কবির গান গাইবে

তখন আমি চুপটি ক’রে দুচোখ ভ’রে থাকবো চেয়ে…

মনে থাকবে?

 

এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব

এই জন্মের চুলের গন্ধ পরের জন্মে থাকে যেন

এই জন্মের মাতাল চাওয়া পরের জন্মে থাকে যেন

মনে থাকবে?

 

আমি হবো উড়নচন্ডি

এবং খানিক উস্কোখুস্কো

এই জন্মের পারিপাট্য সবার আগে ঘুচিয়ে দেব

তুমি কাঁদলে গভীর সুখে

এক নিমেষে সবটুকু জল শুষে নেব

মনে থাকবে?

পরের জন্মে কবি হবো

তোমায় নিয়ে হাজারখানেক গান বাঁধবো।

তোমার অমন ওষ্ঠ নিয়ে

নাকছাবি আর নূপুর নিয়ে

গান বানিয়ে__

মেলায় মেলায় বাউল হয়ে ঘুরে বেড়াবো…

মনে থাকবে?

 

আর যা কিছু হই বা না হই

পরের জন্মে তিতাস হবো

দোল মঞ্চের আবীর হবো

শিউলিতলার দুর্বো হবো

শরৎকালের আকাশ দেখার

অনন্তনীল সকাল হবো;

এসব কিছু হই বা না হই

তোমার প্রথম পুরুষ হবো

মনে থাকবে?”

[ ৪ পর্বে শেষ হলো ]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3