ধর্ম-অধর্ম (২) : ’শোনো গো দখিনো হাওয়া’

ইহুদী, খ্রিস্টান এবং ইসলাম এই অন্যতম তিনটি ধর্মের মানবসৃষ্টির ইতিহাস খুব কাছাকাছি। আমরা জানি, মানব সৃষ্টির যে গল্প বানিয়েছে এইসব ধর্ম, সেখানে আদম নামের পুরুষটার মনোরঞ্জনের প্রয়োজনে বানানো হয়েছে হাওয়াকে। কিন্তু মানবসৃষ্টির ধর্মীয় গল্পগুলিতে আমরা কখনো এমন হতে দেখি নি যে, কোন নারীকে সৃষ্টি করার পর তার মনোরঞ্জনের জন্যে আদমের দরকার পড়েছে।

গল্প কেন এমন পুরুষতান্ত্রিক হল?
এমন গল্পের কারণ বলতে এটাই যে, ধর্মীয় গল্পগুলি যাদের মস্তিষ্ক থেকে উদগীরণ ঘটেছে তারা প্রত্যেকেই পুরুষ মানুষ। সাধারণভাবে, একজন পুরুষ মানুষের জৈবিক তাড়না জুড়ে নারী থাকাটাই স্বাভাবিক, আবার একজন নারীর ভাবনায় পুরুষকে ঘিরে তার জৈবিক ক্ষুধার তাড়না আবর্তিত হতে পারে।

এই বিষয়টি সাধারণ একটি ঘটনা।
তবে আমরা যখন দেখি যে, রসিয়ে রসিয়ে উদ্ভট বর্ণনা সমৃদ্ধ গল্পে উল্লেখ করা হয়েছে বেহেশতী হুরী বা বেহেশতী নারীর উদ্ভট রূপ, তখন আমরা বুঝতে পারি যে, স্বাভাবিক মস্তিষ্ক থেকে রচিত হয় নি এইসব উদ্ভট গল্প। এদিকে, ধর্মের ধর্মপ্রবর্তকের বিকার এতটাই বেশি যে, বেহেশত নামের ফ্যান্টাসীতে সেক্স করার নিমিত্তে ’পুরুষাঙ্গ’ সদা প্রস্তুত থাকার উদ্ভট স্বপ্ন তিনি লালন করেছেন; শুধু তাই নয়, অবিশ্রান্তভাবে যৌন-কর্ম চালিয়ে যাবার উদ্ভট স্বপ্নও তিনি দেখেছেন!

যদি বলেন, এই সব গল্প কথিত ঈশ্বরের মাস্টার প্ল্যান, তবে আমি অবাক হচ্ছি যে, ঈশ্বর নামের বিশালতার ধারণাটি শেষ পর্যন্ত ’উত্তিত-পুরুষাঙ্গতে’ গিয়ে স্থির হয়ে গেছে অবিশ্বাস্যভাবে! কিন্তু আমি অবাক হতে চাইছি না, আমি বরং জানতে চেষ্টা করতে পারি যে, ধর্ম প্রবর্তন করা পুরুষ মানুষটি কি ’সেক্সচুয়াল ফ্যান্টসী’তে ডুবে থাকতেন?

বেহেশতে অনন্ত সময় ধরে অবিশ্রান্তভাবে যৌনকর্ম করার যে স্বপ্ন দেখেছেন পুরুষ মানুষটি তার কি কোন যৌক্তিকতা আছে? কথিত বেহেশতে নারীর অবস্থান কেবলই “সর্দারনী”? তাহলে একজন চির অবিবাহিত মুসলিম নারী যদি বিয়ে না করেই মারা যান, তবে কীভাবে তিনি বেহেশতের ৭২ হুরীর সর্দারনী হবেন? তবে, আমরা আশা করতে পারি যে, এইসব উদ্ভট গল্পের সাথে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার একজন নারী কখনোই কম্প্রোমাইজ করবেন না। তার চেয়েও বড় কথা, একজন নারী মানুষ নিজের ভালবাসার প্রিয় মানুষটিকে ৭২ নারীর সাথে অবাধ সঙ্গম করার লাইসেন্স দিয়ে সুখী হতে পারবেন কি?

পৃথিবীর সবগুলি ধর্মকে বাতিল ঘোষণা করা একমাত্র ধর্মটির নাম ইসলাম। এখানে সবকিছু আপডেটেড হিসেবে দাবি করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ এই ধর্মটি সবগুলি ধর্মের আপডেট! তো কী আছে এই আপডেটে?

আপডেটেড এই ধর্মে পুরুষ জাতকে পুণ্যমুখী করতে স্বয়ং ঈশ্বর বা আল্লা নারী মাংসের লোভ দেখিয়েছেন নির্লজ্জভাবে। যদিও ঈশ্বর ধারণার সাথে এমন নিম্নমানের গল্প যায় না, তবুও তর্কের খাতিরে প্রশ্ন করতে পারি, পুরুষবান্ধব একজন ঈশ্বর কি পুরুষ মানুষকে পুণ্য কাজ করানোর প্রয়োজনে নারীর লোভ দেখাতে পারেন? একজন ঈশ্বরের কথিত মহাপরিকল্পনায় অসীম সময় ধরে ডজনখানেক নারী-ভোগ করাটা স্বর্গ বা বেহেশতের সংজ্ঞা কি হতে পারে? না, ঈশ্বরের সাথে এইসব সস্তা গল্প কিছুতেই যায় না, অর্থাৎ পেট পুরে খাওয়া-দাওয়া আর বাদ বাকী সময় জুড়ে কাম; এমন সস্তা গল্পের সাথে ঈশ্বরের নাম উচ্চারিত হতে পারে না।

সুতরাং উদরপূর্তি আর জৈবিক ক্ষুধাকে ঘিরে বেহেশত নামক ফ্যান্টাসীর যে গল্প আমরা শুনে থাকি, তা সঙ্গত কারণেই রক্ত-মাংসের মানুষের তৈরি। একজন পুরুষ মানুষের সেক্স ফ্যান্টাসীতে সাজানো বেহেশত যে মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনের ধ্যান ধারণার ফসল, তা আমরা প্রমাণ সাপেক্ষভাবে জানতে পারি।

নবী মুহম্মদ কুমারী নারীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন, সাহাবীদেরকে তাদের বিয়ে ব্যাপারে কুমারী মেয়ে বেছে নিতে পরামর্শ দিতেন। কুমারী নারীর প্রতি নবীর এই ’ফ্যাসিনেশন’ জায়গা করে নিয়েছে হুরীদের বর্ণানার গল্পে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে নবী উল্লেখ করেছেন ’কুমারী’ শব্দটি অর্থাৎ কুমারী নারীর প্রতি নবীর যে ফ্যান্টাসী কাজ করেছে, বেহেশতী নারীতে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। আমরা নিচের হাদীসটি দেখতে পারি:

[ নিচের হাদীসটি নেয়া হয়েছে: সহীহ বুখারী ৮ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৯১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত]

বেহেশতি গল্পের হুরীদের গায়ের রঙ কালো হলে সমস্যাটা যে কোথায় ছিল; তা আমি ভেবে পাই না। আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষটি কি তার কালো চামড়ার সঙ্গীকে ভালবাসছে না? তারা কি পরিবার গঠন করছে না? তাহলে, সাদা-কালোতে ঈশ্বরের কী আসে যায়! ঈশ্বর কি তবে বর্ণবাদী? কথিত ঈশ্বর বর্ণবাদী না হলেও রক্তমাংসের মানুষটার কালো রঙের প্রতি কিছুটা যে অপছন্দ ছিল তা তো মিথ্যে নয়। কালো কুকুর দেখামাত্র হত্যার করার মতো আদেশ কতটা অমানবিক তা কি বলার কিছু অপেক্ষা রাখে?

আবার, নবী মুহম্মদ সুন্দরী নারীর সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ পেলে যে হাতছাড়া করতেন না তা আমরা জানতে পারি খাইবারের ইহুদী বসতি অবরোধের সময়ে সাফিয়্যাকে ঘিরে ঘটনাটি পড়ে। আগ্রাসী মুসলিম বাহিনী কর্তৃক অতর্কিত খাইবার অবরোধের কারণে ইহুদী পরিবারগুলি শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

ইসলামে যুদ্ধবন্দী নারীকে বিবেচনা করা হয় গনিমতের মাল হিসেবে; অর্থাৎ যোদ্ধারা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিত যুদ্ধবন্দী নারীদেরকে এবং তাদের সাথে অবাধ যৌনকর্ম করার সুযোগ পেত তারা। অবশ্য এখনও একই রেওয়াজ আমরা দেখেছি কট্টর মুসলিমদের মধ্যে, যেমন: আই এস জঙ্গীরা ইয়েজেদী নারীদেরকে ইসলামিক যুদ্ধনীতি অনুযায়ী বন্দী করে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছে দিনের পর দিন!

যা হোক, খাইবারের সেই অবরোধে অন্যান্য নারীদের সাথে সাথে আটক হয়েছিলেন সাফিয়্যা নামের নেতৃস্থানীয়ের এক সুন্দরী কণ্যা। এদিকে দিহায়া নামের একজন সাহাবী নবীর কাছে এসে বন্দী নারীদের মধ্য থেকে গনিমতের ভাগ হিসেবে একজন নারীকে চাইলেন।

নবীর ঘরে বহু নারী ইতোমধ্যে বিদ্যমান, সঙ্গত কারণেই নবী তার সাহাবী তথা দিহায়্যাকে পছন্দমতো যে কোন নারীকে বেছে নিতে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে দিহায়্যা সুন্দরী সাফিয়্যাকে বেছে নিলেন নিজের জন্যে। এদিকে নবীর সাঙ্গপাঙ্গরা নেতৃস্থানীয় ইহুদীকণ্যা সুন্দরী সাফিয়্যার ব্যাপারে নবীকে জানালে নবীর মন উতলা হয়ে ওঠে। তিনি দিহায়্যাকে সাফিয়্যাকে সহ উপস্থিত হতে আদেশ দিলেন। দিহায়্যা সুন্দরী সাফিয়্যাকে সাথে নিয়ে নবীর সামনে উপস্থিত হলে দ্বীনের নবী সাফিয়্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে তার প্রথম সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন এবং দিহায়্যাকে তিনি নতুন আদেশ দিলেন যে, সাফিয়্যাকে তার জন্যে রেখে অন্য যে কোন নারী বেছে নিতে!

যারা বলে বেড়ান যে, নবী দুস্থ অসহায় নারীদেরকে বিয়ে করে তাদেরকে উদ্ধার করেছেন, ব্যাপক মানবতা দেখিয়েছেন, ওপরের এই ঘটনা তাদের ডিফেন্সিভ চিন্তার বিপরীতে পরিষ্কারভাবে চপেটাঘাত। দেখুন, নবীর অনুমতি পেয়ে সাফিয়্যাকে প্রথমে বেছে নিয়েছিল সাহাবী দিহায়্যা, কিন্তু সাঙ্গপাঙ্গদের কাছে সেই সাফিয়্যার গল্প শুনে সাফিয়্যাকে নবী প্রথমে দেখতে চাইলেন। সামনে হাজির হওয়ার পর সাফিয়্যার রূপে মুগ্ধ নবী দেখে-শুনে দিহায়্যাকে উনার পথ থেকে সরিয়ে দিলেন!
[ নিচের হাদীসটি নেয়া হয়েছে: সহীহ বুখারী ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২১২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত]

’শোনো গো দখিনো হাওয়া’, যে পুরুষ মানুষ নারী ভোগের নেশায় নিজের কথাতে স্থির থাকতে পারে না, সেই পুরুষ তোমার আদর্শ হতে পারে, মানব সভ্যতার জন্যে অবশ্যই আদর্শ নয়! তার থেকেও বড় কথা, যে পুরুষ মানুষ, বিপর্যস্ত জনপদের নারীদেরকে ভোগের জন্যে নিজ দলের সাঙ্গপাঙ্গদের মাঝে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়, সে পুরুষ মানুষ মহা মানব হওয়ার যোগ্যতা হারায়।

উপরের এই ইতিহাসটুকু এটাও ব‌লে দেয় যে, কী কার‌ণে হুরীরা কেবল সাদা/স্বচ্ছ চামড়ার সুন্দরী হি‌সে‌বে আবির্ভূত; যেখা‌নে ব্রাউন অথবা কা‌লো চামড়ার নারীর গল্প বে‌হেশ‌তি গ‌ল্পে স্থান নেই!

সুতরাং, আমরা বরং উপসংহার টানি; ’ওহে দখিনো হাওয়া’, যে রূপকথার গল্পে কামের নেশায় মত্ত পুরুষের পুরুষাঙ্গ ছোটে ৭২ দিক, সেই গল্প যদি হয় তোমার পাথেয়, সে গল্পের প্রবর্তক যদি হয় তোমার আদর্শ, তবে অবশ্যই তোমার পঁচা নষ্ট গল্পের সাথে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ কিছুতেই যুক্ত থাকতে পারেন না।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of