প্রিয়া সাহা জিতে গেলেন !!!

প্রথম দিন আমিও বিরক্ত হয়েছিলাম।

দেশের ভাবমূর্তির কথা ভেবে। প্রিয়া সাহা এই ভাবে কেন আমেরিকাতে গিয়ে নালিশ করতে হবে? আমাদের দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা এখন জাদের,তাদের ত হিন্দু ভোট বেশী। তারা নিশ্চয়ই হিন্দুদের অভিযোগগুলো সুরাহা করতো।

একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলাম।আমার গ্রামের বাড়ির সাথে মিলানোর চেষ্টা করলাম। এখন আর শনির মা নাই,যে মাসি কিনা ছুটে আসতো আমরা গ্রামে গেলে। অসম্ভব ভালবাসত আমাদের । শাড়ির আচলে বেঁধে আনত নাড়ু আর চিড়া ভাঁজা । শনিরা ছিল ঋষি ,হিন্দুদের মতে অনেক নিচু জাঁতের ।এখন বুঝি আগে বুঝতাম না ।তবে তখন মুসলিমদের বাড়িতে হিন্দুদের যাতায়াত ছিল স্বাভাবিক ।আমার বাবা যেহেতু সরকারি চাকুরী করতো তাই আমাদের বাবার সাথে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে হত। তবে আমরা প্রতি বছর বার্ষিক পরীক্ষার পর গ্রামে যেতাম এক মাসের জন্য । আমাদের আশে পাশে অনেক হিন্দু বাড়ি ছিল। বলাই দা জেলে ছিল ।গ্রামে গেলে বলাই দা আমাকে কোলে করে নদীতে নিয়ে যেত ।আমার মা মোটেও  ভয় পেতো না ।বলাই দা এর কাছে আমি থাকা মানে আমি নিরাপদে থাকবো এটা আমার মা জানতেন ।আমি টো টো করে ঘুরে বেড়াতাম । গণেশ দার জন্য ডাহুক পাখি শিকার করা ,বিলে মাছ ধরা, তর তর করে নারিকেল গাছে উঠতে পরা এসব আমার জীবনে সম্ভব হয়েছিল আমার গ্রামের হিন্দু দাদাদের জন্য।

আমার ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা আর চাকুরীর জন্য দীর্ঘ সময়ের বিরতিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়েছিল ১৫ বছর পর ২০০৯ এ । আমি দেখলাম হিন্দু কেউ আর আমাদের  বাড়িতে আসল না। পরের দিন আমি  হিন্দু পাড়াতে গেলাম । দেখলাম নাই কোন বাড়িঘর। পুরানা ছোট মন্দিরটি দেখতে পেলাম কিন্তু জঙ্গলে পরিপূর্ণ, বোঝা যাচ্ছিল এখন আর এখানে পূজা হয় না ।পরে বাড়িতে এসে আমি জানার চেষ্টা করলাম। জানলাম সবাই  কোথায়  যেন চলে  গেছে। আমার চাচা যখন গ্রামের মেম্বার হয়েছিলেন তারপর ওরা চলে যায় ।কারণটা যদিও কেউ বলে নাই, তবে শুনেছিলাম আমার চাচা তাদের সব বাড়ি ঘর কিনে নেয় । পুরা বিষয়টি এখনো আমার কাছে রহস্য।

এখন আসি আমাদের দেশে সংখ্যা লঘুরা কি ভাল আছে ?কেন প্রিয়া সাহা নালিশ করতে গেলো?

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের সামাজিক চাপ ছাড়াও গুজব ছড়িয়ে একটি ডিজিটাল ছক প্রণয়ন করা হয়েছে ৷ ধারাবাহিক ভাবে এমন ঘটনা ঘটছে সংখ্যালঘুদের বিতাড়িত ও দুর্বল করার জন্য ।

২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রামুর বৌদ্ধ পল্লিতে হামলার পেছনেও ডিজিটাল কৌশল অবলম্বন করা হয়৷ উত্তম বড়ুয়া নামে একজনের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা করে ফেসবুক পোস্ট-এর গুজব ছড়িয়ে চালানো হয় সেই হামলা৷  হামলার পর থেকে উত্তম নিখোঁজ আছেন৷ তাঁর স্ত্রী রীতা বড়ুয়া এক সন্তান নিয়ে এলাকা ছেড়ে এখন অন্য জায়গায় চলে গেছেন৷

২০১৬ সালের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলাও হয়েছিল ঠিক একই পদ্ধতিতে৷ রসরাজ নামের একজন ফেসবুকে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে পোস্ট দিয়েছিল বলে গুজব ছাড়ানো হয়েছিল৷ পরে জানা যায় রসরাজ সেই পোস্টই দেয়নি৷ ফেসবুক সম্পর্কে তার কোন ধারণাও ছিল না৷ কিন্তু তথ্য প্রযুক্তি আইনে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে৷ পেশায় জেলে রসরাজ তিনমাস কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পায়৷ কিন্তু এক্ষেত্রেও পুলিশ আগাম কোন ব্যবস্থা নেয়নি৷ অথচ কয়েক দিন ধরেই ওই কথিত ফেসবুক পোস্ট নিয়ে উত্তেজনা চলছিল।

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ২০১৭ সালের নভেম্বরে হিন্দুদের বাড়িঘরেও একই পদ্ধতিতে হামলা করা হয়৷ টিটু রায় নামে একজনের  বিরুদ্ধে ফেসবুক ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়৷ পরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷ কিন্তু তদন্তে জানা যায়, ফেসবুকে পোস্ট দেয়া তো দূরের কথা সে লেখা পড়াই জানে না৷ টিটুর ছবি দিয়ে আরেকজন তার নামে ফেসবুকে আইডি খুলেছিল ৷

কদিন আগে ভোলাতে বিপ্লব চন্দ্র নবী মোহাম্মাদকে কটূক্তি করার জন্য গুজব ছড়ানো হল। আসলে বিপ্লবের আইডি হ্যাকের কথা জানিয়ে বিপ্লব চন্দ্র নিজেই থানায় হাজির হয়েছিলো। তারপরও বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়া হয়। পুলিশের অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করলে পুলিশ এমনিতেই সমাবেশ পণ্ড করে দিতে পারে। তবু পুলিশ ‘তৌহদী জনতার’ ঈমানদন্ডের কথা চিন্তা করে তাড়াতাড়ি সমাবেশ শেষ করে দিতে বললেও উসকানি দেয়া শুরু হল। পুলিশের উপর ইটপাটকেল ছুড়ে নিজেরাই হাঙ্গামা বাধিয়ে রণক্ষেত্র বানানো হল। অর্থাৎ লাশ পড়ার জন্যই সমাবেশ এবং  হিন্দুদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মন্দির এবং বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটার জন্যই পরিকল্পনা ৷

 

ফেসবুকে  ধর্ম অবমাননার গুজব ছাড়িয়ে রামু, উখিয়া, টেকনাফ, পাবনা, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুরসহ আরো অনেক জায়গায় আমরা সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা দেখেছি৷ যার সর্বশেষ ঘটনা দেখলাম ভোলার বোরহানউদ্দিনে৷ প্রতিটি ঘটনায় হামলার আগে পরিবেশ নানাভাবে উত্তপ্ত করা হয়৷ পুলিশ নির্বিকার থাকে৷ এমনকি যারা এই গুজব ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধেও পরে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি ৷ আর হামলাকারীরা তো বিচারের আওতায় আসেই না৷ তবে এবার ভোলায় একমাত্র ব্যতিক্রম আমরা দেখেছি৷ যারা ফেসবুক হ্যাক করে অপকর্ম করেছে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ কিন্তু তারপরও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় সংঘর্ষ এবং হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

আমাদের দেশে এখন ধর্মীয় উন্মাদনা এতই প্রখর যে আমরা এখন ১০০ % মুসলিম রাষ্ট্র বানানোর উন্মাদনায় ব্যস্ত। নাগরিক অধিকার  নিশ্চয়তা করতে  আমাদের রাষ্ট্রও এখন  আর মগ্ন না । রাষ্ট্র ধর্ম রক্ষার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। রাজনৈতিক দল গুলো এখন ধর্মীয় দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করছে। ধর্মকে এখন প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো কেউ নাই । আসলে  এখন জোড় যার মুল্লুক তার । ধর্মকে আগে মুক্ত চিন্তকরা প্রশ্নবিদ্ধ করতে  পারত কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ট পোষকতায় এখন ব্লগার হত্যা ও ৫৭ ধারা বাস্তবায়ন করে প্রগতিশীল ও বুদ্ধিজীবীদের বাকরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সেক্যূলার রাষ্ট্র ঠিক উল্টা পথে হাঁটছে ব্লাসফামি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

এখন পাঠকদের কাছে প্রশ্ন যারা প্রিয়া সাহাকে গালাগালি করছিলেন তারা কি  প্রিয়া সাহার কাছে ক্ষমা চাবেন? আপনার মাফ চাওয়া এখন জরুরি না এখন সারা পৃথিবীর কাছে  প্রিয়া সাহা জিতে গেলান।

ফেসবুক মন্তব্য

২ thoughts on “প্রিয়া সাহা জিতে গেলেন !!!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 3