বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ৩

বেশ কয়েকদিন বাদে তিতুমীরকে নিয়ে বাঁশের কেল্লার তৃতীয় পর্ব লিখতে বসলাম। দ্বিতীয় পর্ব শেষ করেছিলাম লিখে যে, তাত্ত্বিক দিক দিয়ে শরিয়তী ও মারিফতী ইসলাম চুম্বকের দুটি মেরুর মত মনে হলেও প্রত্যেক সুফী সাধকই শরিয়ৎ সচেতন এবং তিতুমীরের আন্দোলনেই আমরা দেখবাে আন্দোলন কট্টর শরিয়তী হওয়া সত্ত্বেও তাদের দলে যােগ দিয়েছিলো স্থানীয় ফকিররা। চলুন আগে তিতুমীরের সাথে প্রাথমিক পরিচয়টা সেরে ফেলি :

তিতুমীরের নাম মীর নিসার আলী। ১৭৮২ খৃষ্টাব্দের ১৪ই মার্চ তখনের বারাসত জেলার হায়দরপুর গ্রামে এক বিত্তশালী কৃষক পরিবারে জন্ম তিতুমীরের। ওই হায়দরপুর এখন বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়া থানার অধীনে। তিতুমীরের বাবা মীর হাসান আলী, মা আবেদা রােকেয়া। তিতু ছাড়াও হাসান আলীর আরও একটি পুত্র ও দুটি কন্যা ছিল : মীর নিহাল আলী, হামিদা ও হাসিনা খাতুন। | ছোটবেলায় তিতু প্রায়ই জ্বরে ভুগত। জ্বর থেকে বাঁচার জন্য তাকে শিউলী পাতা বা ওই ধরনের তেতো ভেষজ-উদ্ভিদ খাওয়ানাে হতাে। ছোট্ট তিতু অনায়াসে খেয়ে ফেলতো তেতো ভেষজ আর সেই জন্যই তিতুর ঠাকুমা জয়নাব খাতুন আদরের নাতির নাম দিয়েছিলেন, তিতা মিঞা। গ্রামের মাদ্রাসায় তিতুর পড়াশোনা শুরু। সাথে চলতে থাকলো মাদ্রাসা সংলগ্ন আখড়াতে শরীর চর্চাও। একদিকে তিতু যেমন আরবী, ফার্সি, বাংলা, উর্দু ইত্যাদি ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠল, অন্যদিকে তেমনই আখড়ায় লাঠি-সড়কী চালনা ও কুস্তি শিখে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠল। যুবক তিতু ছিল বলিষ্ঠ, যদিও তাঁর উচ্চতা ছিল সে তুলনায় কিছু কমই। ভারতীয় উপমাদেশের ঐতিহাসিকরা প্রথমত রাজনৈতিক স্বার্থে ও দ্বিতীয়ত সামাজিক স্বার্থে প্রকৃত ইতিহাসকে বারেবারে বিকৃত করেছেন। তিতুমীরের জীবনীকার বিহারীলাল সরকারের ভাষায় : “সে দেহ ধর্মভাবদ্যোতক নহে, বীরত্ব-বীর্য ব্যঞ্জক।” আরো লিখেছেন :’ ইংরেজ শক্তির নিকট সাম্রাজ্য হারাণাের বেদনা অন্যান্য সচেতন মুসলমানের মত তিতুর হৃদয়েও বেদনার সুর বাজাতাে।’ এ সবই গল্প কথা। তিতুকে নিয়ে বিহারীলাল ও আবদুল গফুর সিদ্দিকীর বই দুটির ঐতিহাসিক সততা সম্বন্ধে প্রশ্ন রেখেছেন বিদগ্ধজনেরা। আসলে, বসিরহাটের এক অখ্যাত মুসলমান সন্তানের কৈশাের ও যৌবনের বিশ্বস্ত কাহিনী সমকালীন কোন লেখকই বা লিখে রাখবেন ?

যাই হোক, লেখা চলতে থাকুক। ১৮১৫ খৃষ্টাব্দ নাগাদ তিতুমীরকে দেখা যায় কলকাতায় পেশাদার কুস্তিগীর রূপে। পালােয়ান হিসাবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিল তিতু। প্রশ্ন হলো, এই সুনামী কুস্তিগীর পরবর্তী কালে কোন চাহিদায় যে নদীয়ার এক হিন্দু জমিদারের অধীনে লাঠিয়ালদের সর্দারী করতে গিয়েছিলে, তা জানা যায় না। কেবল জানা যায়, এক লাঠালাঠির ঘটনায় তিতু গ্রেপ্তার হয় এবং বিচারে কারাদন্ড ভােগ করে। কারাবাসের মেয়াদ যশােহর জেলে কাটিয়ে তিতু যখন কলকাতায় এসে পৌঁছালো তখন সাঈদ আহমদ বেরিলবী কলকাতায় এসে গেছে হ্বজ যাত্রার পথে। তিতু বেরিলবীর কাছে বায়াত বা দীক্ষা গ্রহণ করে সামিল হলো ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ আন্দোলনে। তিতু হ্বজ করতে গেল বেরিলবীর সঙ্গেই। তিতুমীর সংক্রান্ত রচনাবলীতে দেখা যায়, তিতুকে হ্বজ করতে পাঠানাে হয়েছে দিল্লীর এক রাজ পরিবারের সঙ্গে। এ ধারণার উৎপত্তি, সার্কিট কমিশনার বারওয়েলকে লেখা বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিষ্ট্রেট ডব্লিউ, এস, আলেকজান্ডারের এক প্রতিবেদন থেকে। আবদুল গফুর সিদ্দিকীর মতে দিল্লীর রাজপরিবারভুক্ত ব্যক্তিটি হলেন কলকাতার মির্জাপুরের জমিদার মির্জা গােলাম আম্বিয়া। বেরিলবীর দলের সঙ্গে হ্বজ করার ব্যাপারে হয় মির্জা নিজেই তিতুকে অর্থ জুগিয়েছিল, অথবা, তারই সুপারিশে বেরিলবী মুফতে তিতুকে হ্বজ করতে নিয়ে গিয়েছিল। বেরিলবী হ্বজ শেষ করে ১৮২৪ খৃষ্টাব্দের প্রথম দিকে কলকাতায় ফেরে। এরপর বেরিলবী, ১৮২৬ খৃষ্টাব্দের সতেরই জানুয়ারী জেহাদের উদ্দেশ্যে হিজরৎ করার জন্য উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের দিকে রওনা হয়। ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে, বেরিলবী উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করার জন্য কয়েকজন মুজাহিদকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পাঠায়। বাংলায় কাজ করার জন্য পাঠানো মুজাহিদদের মধ্যে পাটনার এনায়েৎ আলীর উল্লেখ পাওয়া গেলেও তিতুমীরের কোনো সঠিক উল্লেখ পাওয়া যায়না । তবে, কেয়ামুদ্দিন আহমদ ‘তারিখ-ই-আহমদী’ বলে একটি পুঁথির উল্লেখ করেছেন, তাতে নাকি নিশার আলীর কথা আছে।

 

পাঠক, একটা কথা এইখানে মনে রাখবেন, ‘দার-উল- হার্ব’ এ মুসলমানদের জেহাদী আন্দোলন গােপনেই সংগঠিত হয় এবং বেরলবীর ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ জেহাদী আন্দোলনের শুরু ১৮১৮ খৃষ্টাব্দে, আর তথাকথিত ভারতীয় ইতিহাসে ‘ওয়াহাবী’ আন্দোলন নামে পরিচিত, এই জেহাদি আন্দোলনের কথা জনসাধারণ জানতে পারে মাত্র ১৮৬৩ খৃষ্টাব্দের শেষে। ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’র সমসাময়িক শরিয়তী আন্দোলন ‘ফরাজী’ সম্পর্কে ফরিদপুর-মাদারীপুরের তৎকালীন মহকুমা শাসক নবীন চন্দ্র সেন লিখেছিলেন : ‘ফরাজী নেতারা যেন আয়নার ছবি, ধরিবার জো নাই, ধরিবে কী, তাহাদের নাম পর্যন্ত কেউ প্রাণান্তে প্রকাশ করিবে না’………………..

(ক্রমশঃ প্রকাশ্য)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 5 =