পবিত্র দেশ থেকে নাজমার লাশ হয়ে ফেরত আসা ও আমাদের আশ্চর্যজনক নীরবতা!

কবিগুরুর ‘জীবিত ও মৃত’ ছোটগল্পটি মনে আছে? শেষোক্ত কয়েক লাইন বলি দেখুন মনে পরে কি-না!
“বিদায় লইয়াছ তখন এ মায়াবন্ধন ছিঁড়িয়া যাও — আমরা তোমার যথোচিত সৎকার করিব। ”
তখন কাদম্বিনী আর সহিতে পারিল না; তীব্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “ ওগো, আমি মরি নাই গো, মরি নাই। আমি কেমন করিয়া তোমাদের বুঝাইব, আমি মরি নাই। এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি। ”
বলিয়া কাঁসার বাটিটা ভূমি হইতে তুলিয়া কপালে আঘাত করিতে লাগিল, কপাল ফাটিয়া রক্ত বাহির হইতে লাগিল।

তখন বলিল, “ এই দেখো, আমি বাঁচিয়া আছি। ”

শারদাশংকর মূর্তির মতো দাঁড়াইয়া রহিলেন; খোকা ভয়ে বাবাকে ডাকিতে লাগিল; দুই মূর্ছিতা রমণী মাটিতে পড়িয়া রহিল।

তখন কাদম্বিনী ‘ ওগো আমি মরি নাই গো, মরি নাই গো, মরি নাই ‘ – বলিয়া চীৎকার করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া, সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া অন্তঃপুরের পুষ্করিণীর জলের মধ্যে গিয়া পড়িল। শারদাশংকর উপরের ঘর হইতে শুনিতে পাইলেন ঝপাস্‌ করিয়া একটা শব্দ হইল।

সমস্ত রাত্রি বৃষ্টি পড়িতে লাগিল; তাহার পরদিন সকালেও বৃষ্টি পড়িতেছে, মধ্যাহ্নেও বৃষ্টির বিরাম নাই। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।”

আর নাজমা’রা যখন বিদায় নেয় তখন তাদের মায়াবন্ধন ছেরে দিতেই হয়। আরে আমরা তো আছিই উপযুক্ত সৎকার করার জন্য!
প্রবাস জীবন, সেকি খুব সুখের সাগরে ভেসে যাওয়ার জীবন, নাকি অনেক কষ্ট মনের গভীরে চেপে রেখে বেছে নেয়া একটি জীবন, একমাত্র প্রবাসীরাই ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারেন।

মানুষ প্রবাসে কেন যায়? হয়তো কোনো আর্থসামাজিক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অথবা একটু ভালো থাকার আশায়। নিজের জন্মভূমি, পরিচিত পরিবেশ, পরিজন ছেড়ে প্রবাস জীবন বেছে নেয়া, নিশ্চয়ই খুব সহজ কিছু নয়। জীবনের অনেক কষ্ট, বেদনা ধামাচাপা দিয়ে প্রবাসীকে জীবন যাপন করতে হয়।ভাগ্য ফেরাতে যখন একগাদা ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে একজন মানুষকে দেশের বাইরে পা রাখতে হয় শুধু সেই ভুক্তভোগী জানে তার মর্ম বেদনা। আর তার কষ্টে উপার্জন করা টাকা যখন রেমিট্যান্স হিসাবে দেশে আসে, দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করে তখন আমরা গর্ব করি বাহঃ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে!

টেলিফোনে পরিবারের লোকেদের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়ে আত্মসম্মান নিয়ে দেশে ফিরতে চাওয়া সেই নাজমাদের দেশে ফিরতে হয় লাশ হয়ে! মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিয়মিত বিরতিতে নির্যাতিত, লাশ হয়ে ফেরত আসা মানুষগুলোকে নিয়ে ফেসবুকে সুশীল, জ্ঞানী বোদ্ধাদের আশ্চর্জনক নীরবতার কারন কি? কারন হলোঃ
১. ঘটনাগুলোর কোনো ভিডিও নেই আজকাল আবার লাইভ ভিডিও ছারা ফেসবুক পাড়া সরব হয় না।
২. ঘটনার শিকার নারীরা সমাজের নিন্মবিত্তের মানুষ।
৩. ওই সকল নারীরা ক্রিকেটার না তাই আবেগ একটু কম।
৪. ঘটনাটি ঘটার স্থান পার্শ্ববর্তী কাফেরদের দেশে না।
৫. এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে! একটা দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা এইগুলা নিয়া হাউকাউ করা ঠিক না।
৬. ভালো মেয়েরা কি স্বামী সন্তান সংসার ফেলে কি বিদেশে যায়?
৮. এসব ঘটনা পাক পবিত্র দেশে ঘটেছে এখানে ধর্ষিত হয়ে মরলেও বেহেস্ত নিশ্চিত!…..
এই কয়েকটি পয়েন্ট যথেষ্ট, আমাদের ফেসবুক বোদ্ধাদের বিবেককে বিবেচনা করার জন্য

আর বাংলাদেশ সরকারের ‘শ্রম জনশক্তি মন্ত্রনালয়ের’ কাছে আমার একটাই অনুরোধ দয়া করে বন্ধ করুন এ নীরব হত্যা। ঠুটোঁ জগন্নাথ হয়ে আর কতদিন দেখবেন আপনারা? এভাবে আর কত চলতে দিবেন? আরোও কতগুলো ভাগ্যন্বেষনীর লাশ ফেরত আসলে আপনাদের টনক নড়বে?

আর এখানে একটা কথা না বলেই পারছি না।
আমার এক কলিগ প্রায়শঃই ধর্ম বিষয়ক আলোচনায় জোর গলায় বলে যে *দি আরবীয়রা সবার আগে বেহেশতে যাবে। উনি জানেন না যে আমি নাস্তিক। রেফারেন্স সহ বলতে পারি যেখানে নবী মুহাম্মদ নিজেই জানতো বা যে সে তার কল্পিত আল্যার বানানো জান্নাতের বাসিন্দা হবেন কি-না! আর সেখানে শুধু তার(মুহাম্মদের) দেশের জন্ম নেবার জন্য পাষন্ড নরপিশাচ, সভ্য সমাজের কলঙ্ক, বর্বর, হিংস্র জানোয়ার গুলো না-কি সবার আগে চ্যালচ্যালিয়ে বেহেস্তে যাবে! 😤

আর কোন নাজমা’কে যেন নির্যাতিত ভাগ্যের লাশ হয়ে দেশে ফেরত আসতে হয় এ কামনা করছি।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 8 = 16