আমাদের পারিজাত দিনরাত্রি পর্ব : ১

ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে। প্রথমে ঢাকা টু সিঙ্গাপুর। সেখানে পাঁচঘন্টা ট্রানজিটের পর সিঙ্গাপুর টু সিডনি। ইকোনমিকে ক্লাসের টিকেট। আমার পাশের সিট নবীউল্লাহ নামের এক গ্রাম্য ছেলের। দালালের মাধ্যমে সে “গুয়াম” যাচ্ছে চাকুরী নিও। সেও আমার মত সিঙ্গাপুর থেকে প্লেন বদল করে প্যাসিফিক দ্বীপ গুয়ামে যাবে। বাংলাদেশ থেকে গুয়ামে লোক যায় জানতাম না আমি। জীবনে প্রথম বিমান ভ্রমণ তার। তাই ছাড়ার পর থেকেই কন্টিন্যু বমি করে যাচ্ছে সে। একবার বমি করতে করতে কিছুটা বমি ছিটকে এসেছে আমার সিটে। সিঙ্গাপুরের বিমান বালা সব দেখে আমাকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো সামনের “বিসনেস ক্লাসের দিকে”! ওখানে যার পাশে আমাকে বসানো হলো, সেই ভদ্রমহিলাকে বেশ পরিচিত মনে হলো আমার। কিন্তু স্মরণ করতে পারছিলাম না কে এই ফর্সা সুন্দরী ছফুট লম্বা মহিলা! সেও তাকিয়ে রইল আমার দিকে!

:

মিনিট খানেক তাকানোর পর বলো উঠলো সে

– এক্সকিউজ মি? আর উ মি: জাহাঙ্গীর?

‘ইয়েস’ বলতেই উৎফুল্ল হলো সে! বিস্মিত হয়ে বললো

– আরে তুমি? কেমন আছো তুমি জাহাঙ্গীর?

– আমি ভাল কিন্তু ধরতে পারছিনা আপনাকে? তবে পরিচিত মনে হচ্ছে খুব?

– রেবেকাকে চিনতে না? চট্টগ্রামে কলেজের ইন্টারে?

আকাশ থেকে ভূপাতিত হওয়ার বিস্ময় নিয়ে বললাম

– রেবেকা আপনি?

– আবার আপনি? আমাকে তুমি বলতে তো তুৃমি?

পাশের ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললো

– পরিচয় করিয়ে দেই! আমার হাজব্যান্ড এইচ কে চোধুরী। আর এ হচ্ছে মি: জাহাঙ্গীর। ত্রিশ বছর আগের আমার ইন্টারের ক্লাসমেট।

হাত মেলালেন মি: চৌধুরী, হাত মেলালো রেবেকা।

– তারপর কই যাচ্ছো্ তুমি? প্রশ্ন রেবেকার!

গর্ভমেন্ট সার্ভেন্ট আমি। তাই একটা প্রশিক্ষণে যাচ্ছি সিডনি! তুমি?

– সিঙ্গাপুর থাকি আমরা ব্যবসা সূত্রে। দেশে গিয়েছিলাম। এখন সিঙ্গাপুর যাচ্ছি।

খুব উচ্ছ্বসিত রেবেকা। বললো

– আমার সিঙ্গাপুরের বাসাতে চলো আজ। সিডনি দুয়েকদিন পর যাবে!

একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম আমি ত্রিশ বছর আগেকার রেবেকার দিকে। যখন একই ক্লাসে একই শাখাতে পড়তাম আমরা! সেই রেবেকা!

:

১০০% গাঁয়ের ছেলে ছিলাম আমি। এসএসসি পাশের আগে কোনদিন শহরে বসবাস করিনি। দুচার মাস পর পর মাঝে মধ্যে শহরে এলেও ঐদিনই কিংবা এক রাত কোথাও থেকে পরদিনই গায়েঁ ফিরে যেতাম। তাই শহর বা শহুরে মানুষের চালচলন, আদব-কায়দা খুব একটা জানতাম না আমি। পুরো জীবন গাঁয়ে থেকে হঠাৎ করে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হয়ে মনে হলো, ছোট পুকুরের মাছ সমুদ্রে পড়েছে যেন। কত বড় ক্যাম্পাস, কত ছাত্রছাত্রী, কত শাখা প্রশাখা তার আর ইয়ত্তা নেই। আমার জন্ম মোটামুটি গাঁয়ের স্বচ্ছল পরিবারে হলেও, ঐ সময়ের গ্রামীণ রীতি অনুযায়ী পোশাক আশাকে তেমন স্বচ্ছলতা ছিলনা আমার। আমাদের স্বচ্ছলতা বলতে গরু, মহিষ, ধান, চাল, দুধ, মাছ, তিল, মরিচ এসব বোঝাতো। আমাদের গাঁয়ের সবচেয়ে বেশী ধনী ছিলেন যে ব্যক্তি, তারও মাত্র একটা জামা-ই ছিল। যদিও তার গরু, মহিষ, চর জমির অভাব ছিলনা। বাজারে এলেও ঐ লোকটা তার একমাত্র সার্টটি কাধে ফেলে বাজার করতো। কদাচিৎ তা গায়ে দিতো।

:

সুতরাং শহুরে কলেজে ভর্তির পর আমার একটা মাত্র জামা আর চল্লিশ টাকাতে কেনা একটা মাত্র প্যান্টই ছিল সম্বল। ছুটির দিনে জামা প্যান্ট ধুয়ে পুরনো জামা বা গেঞ্জি পরে সারাদিন বসে থাকতাম ঘরে। তাই প্রত্যেক দিন মূলত একটি সার্ট-প্যান্ট পরেই আমার কলেজে আসা-যাওয়া হতো। সিটি সার্ভিসের লোকাল বাসে আগ্রাবাদ থেকে উঠে কলেজ গেটে নামতাম ষাট পয়সা ভাড়াতে। আবার কলেজ ছুটির পর বাসে ওঠার জন্য “এ” লেখা বিশাল কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম বাস আসার অপেক্ষায়। যদিও আমার ক্লাসমেটদের অনেকে তখন রঙ-বেরঙয়ের জামা কাপড় এমনকি গাড়িতে চরেও কেউ কেউ আসতো। গ্রামের ছেল বিধায় প্রাইভেট কারে তখনো চড়িনি আমি। ছটি শাখা ছিল আমাদের। তার মধ্যে “ই” শাখাতে পড়েছিলাম আমি। আমার শাখাতে অন্তত ৭০-জন স্টুডেন্ট ছিল। যার মধ্যে ছেলে মেয়ে প্রায় সমানে সমান। আমাদের ক্লাসের অনেক মেয়ের মাঝে রেবেকা ছিল সবচেয়ে লম্বা, সুন্দরী এবং সম্ভবত অনেক ধনী। কারণ প্রত্যহ গাড়িতে চরে সে ক্লাসে আসতো, আবার ছুটির পর গাড়িতে ফিরতো সে তার বাসাতে!

:

একদিন ছুটির পর গ্যালারি থেকে বের হতেই রেবেকা বললো

– কই যাবে তুমি?

ঘাবড়ে গিয়ে বললাম

– কেন? আমার বাসাতে!

-মানে বাসা কই তোমার?

– আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনি, ভাইর বাসাতে থাকি!

– চাইলে আমার সাথে গাড়িতে যেতে পারো, কারণ আমিও ঐ দিকেই যাই!

ঘেমে গিয়ে বললাম

– আপনার গাড়িতে?

– আপনি বলছো কেন? আমি তোমার ক্লাসমেট!

একটু ঘেমে গিয়ে বললাম

– আপনি আমার চেয়ে লম্বা, গাড়িতে আসেন, ক্লাসে সামনে বসেন, স্যারদের সাথে চটপট কথা বলেন, তাই আপনাকে আপনি ছাড়া তুমি বলতে সঙ্কোচ লাগছে!

– তোমার খুশি! তবে তুমি চাইলে আমাকে তুমি বলতে পারো! আর আমি লম্বা হলেও সম্ভবত তোমার বয়সিই হবো। আমার বংশের গ্রোথ এমনই। পনের বছরে মনে হয় পচিশ! সেই থেকে রেবেকাকে তুমি বলছি আমি। সেও আমাকে তুমি বলে। আমি সকাল ৮:০০টায় আগ্রাবাদ বাসস্টান্ডে দাঁড়াই। সেখান থেকে সে তুলে নেয় আমাকে। আবার ফেরার পথে সেই বাসস্টান্ডে নামিয়ে ঘুরে যায় গাড়ি! প্রতিদিন ষাট পয়সা করে এক টাকা কুড়ি পয়সা বেঁচে যায় আমার। যদিও ভাই প্রতিদিন আমাকে ৩-টাকা দেয় বাসভাড়া ও কিছু খেতে।

[বাকিটা আগামীকাল]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 1 =