আমাদের পারিজাত দিনরাত্রি পর্ব : ৩ (শেষ পর্ব)

একদিন সাহস করে বলি

– রেবেকা তোমার ঘরে কোনদিন নিলেনা আমাকে!

– আমার তো ঘর নেই!

– না, মানে যে বাড়িতে থাকো!

– ওটাতো বাবার ঘর!

– বাবার ঘর মানেইতো তোমার ঘর!

– ওকে নেবো একদিন, যেদিন বাবা বাইরে থাকবেন!

কদিন পর রেবেকার আহবানে তার দেওয়ানহাটের বাড়িতে যাই। বিশাল চারতলা বাড়ি। নিচে কতগুলো বাণিজ্যিক দোকান। সম্ভবত ভাড়া। ৩-তলাতে ওরা থাকে। দামি কার্পেট বিছানো বিশালাকার ঝাড়বাতি দেখে বুক কেঁপে উঠলো আমার। ওদের সাজানো বাসার তুলনায় আমাদের কলোনির সরকারি বাসা কতইনা নগন্য। এই প্রথম কাঁচের ডাইনিং টেবিল দেখলাম আমি। চেয়ারগুলোও সম্ভবত কাঁচের। বসতে ভয় করছে আমার! যদি বসতে ভেঙে পড়ে।

:

কাজের মানুষ ছাড়া আর কেউ নেই ঘরে। বাবা ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে গেছে গতকাল। এই সুযোগে আমাকে ঘরে ডেকেছে রেবেকা। অনেক আইটেম এনে টেবিল সজ্জিত করে ফেলেছে কাজের মেয়ে দুটো। সব চিনিওনা আমি। দুজনে খেতে খেতে অনেক কথা হলো। রেবেকা বললো

– তোমাকে ঘরে আনার সুযোগ খুঁজছিলাম। কিন্তু বাবা বাইরে যাচ্ছিলনা, তাই আনতে পারিনি। কাল রাতে তার ফ্লাইট ছিল। তাই আজই তোমাকে ডেকে আনলাম। বলে ওর পা দিয়ে টোকা দিলো আমার পায়ে!

– রেবেকা আমি ছাড়া কলেজে তোমার আর কোন বন্ধু নেই?

– না! আমি গাড়ি থেকে নেমে ক্লাসে ঢুকি। আবার ক্লাসশেষে বাড়ি চলে আসি। কারো সাথে কথা বলতে, আড্ডা দিতে দেখেছো?

– না দেখিনি। মা বলে চমৎকার মেয়ে রেবেকা যদি আমার বউ হতো!

কথা শুনে মুচকি হাসে রেবেকা। বলে

– আর কে কি বলে?

– বোন আর ভাবীও বলে তোর বউটা খুব সুন্দর!

এসব শুনেও ঠোঁট উল্টে হাসে রেবেকা। কোন কথা বলেনা। রাগ করেনা !

খাওয়া শেষ হলে তার বেড রুমে ডাকে আমাকে। সেখানের সোফায় বসতে বলে। পুরো রুমের দেয়ালে নানাবিধ ফুল আর প্রজাপতির ছবি। কি সুন্দর করে যে সাজিয়েছে রুম! চোখ ঝলসে যায় আমার।

:

আকস্মিক কি যেন হয় আমার। রেবেকার দিকে তাকিয়ে মাথাটা কেন যেন চন করে ওঠে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে রেবেকার একদম কাছে চলে যাই। হাতটা টেনে নেই ওর বুকের কাছে। ওকে জড়িয়ে ধরার জন্য একদম কাছে যাই ওর বুকের। কিন্তু রেবেকা কেমন যেন শক্ত হয়ে যায়। গম্ভীর হয় তার চোয়াল। আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে

– যাও! ওখানে গিয়ে বসো!

– love u Rebeka !

– সাট আপ! আর একবারো বলবে না! এসব শুনলে গা জ্বলে আমার!

ঘর থেকে বের হয়ে যায় রেবেকা। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে রূঢ়কণ্ঠে বলে

– ড্রাইভার রেডি হয়ে বসে আছে। সে তোমাকে তোমার বাসাতে নামিয়ে আসবে যাও!

কোন কথা না বলে রেবেকার গাড়িতে বসলাম আমি। ড্রাইভার নি:শব্দে আমার সিজিএস কলোনির বাসাতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো।

:

পর পর ৩-দিন ক্লাসে এলোনা রেবেকা। চতুর্থ দিল ক্লাসে এলো ক্লাস শুরু হওয়ার পর। ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র বেরিয়ে গেল সে। বেশ কবার তার সামনে পড়লাম। সরি বলতে চাইলাম কিন্তু কোন সুযোগ দিলোনা সে। এভাবে ৩-মাস কাটলো। এ ৩-মাসে একটা কথাও রেবেকা বললোনা আমাকে। আজ শেষ ক্লাস। এরপর পরীক্ষা। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি কলেজের সামনে। রেবেকার গাড়ি থামলো আমার কাছাকাছি। জানালার গ্লাস খুলে ড্রাইভার একটা খাম দিলো আমার হাতে। খুলে দেখি তাতে রেবেকার চিঠি। তাতে লেখা —

জাহাঙ্গীর, ছমাস থেকে লক্ষ্য করেছি, একটা মাত্র রঙচটা সার্ট আর প্যান্ট পরে ক্লাসে আসো তুমি। কারো সাথে তেমন মেশোনা, কেউ মেশেনা তোমার সাথে। তাই কি কারণে যেন মায়া লাগলো তোমার প্রতি। একদিন ঠিক করলাম তোমার পরিচয় জানবো। যখন জানলাম তুমি চিটাগনিয়ান নও, তখন তোমার প্রতি মায়া আরো বাড়লো আমার। আমার মা নেই এবং কোন ভাই নেই। তাই তোমাকে ভাই বানাতে চেয়েছিলাম আমি। তোমার মাকে মা। কিন্তু অন্য কামুক পুরুষদের মত খালি ঘরে হাত বাড়িয়েছিলে তুমি আমার প্রতি। সেইদিন থেকে তোমার প্রতি সব মায়া উঠে গেছে আমার। ঘৃণা জন্মেছে অন্যদের মতই। মনে কষ্ট নিওনা। সম্ভবত তুমি গ্রামের দরিদ্র ছেলে। তোমাদের বাসাতেও দারিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট! তাই ঠিকমত পড়ালেখা করে পাস করার চেষ্টা করো। আমার কথা মনে রেখোনা। কোন পুরুষের হতে চাইনা আমি। কারণ সব পুরুষদের ঘৃণা করি আমি। ইতি রেবেকা!

:

আর দেখা হয়নি রেবেকার সাথে। কদিন পর আমি আমার দ্বীপগাঁয়ে চলে আসি। পরীক্ষার সময়ও ওর সিট কোথায় পড়েছিল জানিনা আমি। খোঁজও নেইনি। আমি পরীক্ষার একুশ দিন হোস্টেলে থেকে আবার চলে আসি আমার গাঁয়ে। তারপর চট্টগ্রাম খুব একটা যাওয়া হয়নি। রেবেকা খোঁজ নেয়নি আমার। আমিও নেইনি তার। আজ এতো বছর পর সিঙ্গাপুর এয়ারের এ ফ্লাইটে দেখা হবে রেবেকার সঙ্গে চিন্তাও করিনি কখনো।

:

খুব ভোরে ফ্ল্যাইট থামে আমাদের চ্যাঙ্গী এয়ারপোর্টে। রেবেকা হাত ধরে টানে আমার। দুদিন থেকে যেতে বলে তার ফ্ল্যাটে সিঙ্গাপুর। কিন্তু কি এক দলিত ভালবাসা অন্ধকার আকাশ হাৎড়ায়ে হাৎড়ায়ে ডুবতে থাকে যেন। আমি কেবল চেয়ে থাকি রেবেকার দিকে। মহাপৃথিবীর এসব লাল নীল ধূসর পান্ডুলিপি পাঠে ছিড়ে যায় আসলে কতনা হৃদয় তন্ত্রী, তা কি বোঝেনা রেবেকা! আমাদের এসব ক্লেদময় জীবনের একাকীতম অন্তরঙ্গতার মহাকাব্যপাঠ কখনো কি শেষ হয়? জীবনের ধূসরতম কালো নক্ষত্ররাজির ক্ষয়ে পরার মত আমরা কতবারই না ক্ষয়ে যাই! সূর্যতামসী প্রেমজ হৃদয় আমি তাকিয়ে থাকি পৌঢ়ানিক রেবেকার দিকে। ওরা হাঁটতে থাকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে। আর আমি ট্রানজিট ক্যাম্পে। আমার হলুদাভ হৃদয়ে করুণ উন্মত্ত সিন্ধুর সুর বাজতে থাকে। আমি জানিনা অগণিত নক্ষত্রমাঝে কালপুরুষেরা জেগে থাকে কিনা। নাকি সব হারিয়ে যায় আমাদের প্রেমজ মহাশ্মশানের গর্ভাঙ্কে জ্বলতে থাকা কয়লার মতো! ওরা চলে যায় আমি অপেক্ষা করতে থাকি হৃদয় ভাঙা সুরের করোজ্জ্বল দুপুর পর্যন্ত একাকি!

[৩ পর্বে শেষ]

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of