ক্ষুধার্ত পিতামাতা

আমাদের সমাজের পিতামাতারা নিজেদের খুব জ্ঞানী মনে করে। পিতামাতারা নাকি সন্তানের জন্য সব কিছু বিসর্জন দিয়ে দেয়- এই ধরণের গল্প শুনতে শুনতে আমরা বড় হই, কিন্তু পিতামাতাদের কারণে সন্তানের স্বপ্ন, ইচ্ছা, আগ্রহ, উদ্দীপনা, পরিকল্পনা যে বিসর্জন দিতে হয় সেই গল্পগুলো আর কেউ বলে না। পিতামাতারা ভুল করলেও বলতে হবে তারা সঠিক করেছে, ভালোর জন্যে করেছে। কিন্তু সন্তানেরাও যে পিতামাতার সম্পর্কের জন্য, সংসারের জন্য, ভালো রাখার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমিকা পালন করতে করতে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ফেলে সে-দিকে সমাজ লক্ষ্য ও গুরুত্ব দেয় না।

আমাদের সমাজের পিতামাতারা প্রশংসা কুঁড়িয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভিক্ষুকের মতই ক্ষুধার্ত। তাদের অবদানকে কেউ অস্বীকার করে না, কিন্তু, তারপরও, তারা আগ বাড়িয়ে ঢাক ঢোল পিটিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে বলেই যায় যে, ‘এত কিছু করি তারপরও মন পাই না।’

আমাদের দেশের মানুষ তথা পিতামাতাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ হলেও তাদের মন মানসিকতা, চিন্তাধারা অষ্টম শ্রেণীর অশিক্ষিত মানুষের মতই। পৃথিবী কোথায় পৌঁছে গেছে আর আমাদের দেশের মানুষ তথা পিতামাতাদের ধারণা যে, ছোটরা শুধু বড়দের থেকেই শিখতে পারে কিন্তু ছোটদের থেকে বড়রা কোন কিছু শিখতে ও জানতে পারে না। আমাদের সমাজে এমন হাস্যকর ও জঘন্য চিন্তাধারা প্রবলভাবে বিস্তার করে আছে যে, কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করলেই তাকে বেয়াদব হিশেবে চিহ্নিত করা হবে। বয়সের সাথে অভিজ্ঞতার কোন সম্পর্ক নেই কিন্তু আমাদের মানহীন শিক্ষাব্যব্যস্থা ও কুৎসিত সমাজব্যবস্থা আমাদের শিখতে ও মানতে এবং ভাবতে বাধ্য করেছে যে, যার বয়স যতো বেশি, তার বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা ততো বেশি।

একটা মানুষের পক্ষে সকল বিষয়ে জ্ঞান রাখা সম্ভব নয় এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের যে কাউকেই যে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করলেই কোন না কোন উত্তর পাওয়া যাবে। ‘না’ শব্দের সাথে বাঙালিদের কোন সম্পর্ক নেই। ‘না’ অপমানজনক শব্দ। আমাদের দেশে যতো মানুষ, ততোই বুদ্ধিজীবী। আইন হোক, অর্থনীতি হোক, ফিজিক্স হোক, মানবাধিকার হোক- সব বিষয়ে তাদের জ্ঞান লক্ষণীয়। যে দেশের মানুষ সকল বিষয়ে মতামত রাখতে পারে, সে দেশের মানুষ কখনোই শিক্ষিত নয়। তারা অনুমানের উপর বেঁচে থাকে এবং মৌলিকতার সাথে তাদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন।

মাঝে মাঝেই পিতামাতারা নিজেদের মধ্যের সমস্যা, ঝামেলা, অশান্তি ও ক্ষোভ সন্তানের উপর চাপিয়ে দেয়। সন্তানের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এমন অশান্তি যে চরম মাত্রায় বিঘ্ন ঘটায় তা তারা জানেই না। বছরের পর বছর, তারা- মানুষ কী বলবে এই আতংকে সংসার ভেঙে ফেলার চিন্তাও করতে পারে না। সঙ্গমেও তারা তৃপ্তি পায় না। চল্লিশ ঊর্ধ্ব নারীদের উত্তেজনা বাড়তেও সময় লাগে, স্ত্রীর শরীরে প্রবেশ করেও জামাই অন্যের শরীর কল্পনা করে থাকে আর স্ত্রী লাশের মত পড়ে থাকে। বাইরে থেকে সবই সুন্দর, ভিতরে সত্যি কেউ সুখী নয়। যে ব্যক্তি ‘না’ শব্দটি আয়ত্ত করতে পারে সে সুখী হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে অমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। একটি পরিবারে যখন কোন সন্তান পিতামাতার এমন সম্পর্ক দেখে বড় হয়, সে নিজের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আত্মবিশ্বাস পায় না।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of