স্বর্ণা, ওয়াসিফ ও নাস্তিকতার গল্প !

গোপালগঞ্জের নতুন সরকারি মেডিকেল থেকে ‘এমবিবিএস’ পাস করে ‘বিসিএস’ না দিয়ে, কোন চাকুরিতে না ঢুকে ঢাকার স্বর্ণা ‘পোস্ট ডক্টরাল’ কোর্সে বাইরে যেতে মরিয়া হয়ে উঠলো। সারাক্ষণ নেট ঘাটতে থাকলো সে নরওয়ের যে কোন ভার্সিটির। অবশেষে University of Bergen-এ রাতজাগা অনেক চেষ্টা, আর অফুরাণ কষ্টে একটা স্কলারশিপ পেলো স্বর্ণা। ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানিতে বৃত্তি নিয়ে অনেক সহজেই পড়তে পারতো অত্যন্ত মেধাবি মেডিকেল স্টুডেন্ট স্বর্ণা। কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা, “সে নরওয়ের যে কোন ভার্সিটিতেই পড়বে, আর কোথাও না”। কারণটা অন্য কেউ না জানলেও স্বর্ণার ‘লেংগুটিয়া ইয়ার’ অভি ঠিকই জানে। আসলে স্বর্ণার মেঘবাতাসের স্বপ্নপুরুষ প্রায় পাঁচ বছর আগে ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছিল নরওয়ে। আর ফেরেনি সে ঢাকাতে একটি বারের জন্যেও। অনেকবার ফেসবুকে নক করেছিল স্বপ্না ওয়াসিফকে। কিন্তু একবারো জবাব দেয়নি সে ওসব ম্যাসেজের। মোবাইল নম্বর জোগার করে ‘হটসআপে’ বেশ কবার কলও দিয়েছিল স্বর্ণা ‘অসলো’তে। কিন্তু স্বর্ণা কথা শুরু করলেই এক মিনিটের মাথায় ব্যস্ততার কথা বলে প্রত্যেকবারই ফোন কেটে দিয়েছিল ওয়াসিফ। তারপরো হাল ছাড়েনি স্বর্ণা। ওয়াসিফকে পেতে প্রতিজ্ঞা করেছিল সে, অবশ্যই একদিন নরওয়ে যাবে এবং ওকে না জানিয়েই ওর বাড়িতে উঠবে স্বর্ণা একদিন ‘সারপ্রাইজ গিফট’ হিসেবে।

 

তুর্কি এয়ারে ‘ঢাকা’ টু ‘ইস্তাম্বুল’ টু ‘বেরগান’ পৌঁছার ধকল না কাটতেই দুদিনের মাথায়ই প্লান করলো স্বর্ণা ‘অসলো’ যাবে সে ওয়াসিফের কাছে। এবং সত্যি একদিন দ্রুতগামি Raileurope-এ উঠে বসলো স্বর্ণা একাকি ‘অসলো’ যেতে। ‘বেরগান সেক্টোরাম’ থেকে অসলোর ‘অপেরা-হাউজেট’ পর্যন্ত ৯-ঘন্টার এ নতুন জার্নিতে সব শেতাঙ্গ অচেনা যাত্রীর মাঝে ব্লাঙ্কেট গায়ে তুলে লাইট অফ করতেই স্বর্ণা হারিয়ে গেল তার ইন্টারের কলেজ জীবনে। যখন এথিস্ট ‘অভি’ই ছিল তার ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ তথা খুব কাছের বন্ধু। মেধাবী হলেও খুবই ধার্মিক ছিল স্বর্ণা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো সে নিয়মিত। মসজিদে আযান হলে মাথায় ওড়না টেনে দিতো স্বর্ণা তাৎক্ষণিক। সব ব্যাপারেই অভির সাথে মিলতো স্বর্ণার, কেবল ধর্মীয় চিন্তা ছাড়া। মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও ইসলামের কোন রীতিনীতিই মানতো না অভি। বরং স্বর্ণাকে বানাতে চাইতো পুরো নাস্তিক! কিন্তু ধর্মভীরু স্বর্ণা কখনো নাস্তিকতার কথা শুনতে চাইতো না অভি থেকে, পাছে সে না আবার নাস্তিক হয়ে যায়! পরকাল, মৃত্যু, আল্লাহ, নবী, কোরানে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল স্বর্ণার, যা সে পেয়েছে তার পরিবার তথা মা থেকে। এ বিশ্বাসেই আঁকড়ে থাকতে চাইতো পড়ালেখায় জেলাস ব্রিলিয়ান্ট স্বর্ণা।
:
সময়ের পেন্ডুলামে ‘এইচএসসি’তে ঈর্ষণীয় রেজাল্ট করে মেডিকেলে এ্যাডমিশন নেয় স্বর্ণা-অভি দুজনেই। এর মধ্যে শুরু হলো ‘শাহবাগ গণজাগরণ আন্দোলন’। ঐ মঞ্চের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে একদিন আক্রান্ত হলো ওয়াসিফ। গভীর রাতে শাহবাগ থেকে ঘরে ফেরার পথে মুক্তমনা নাস্তিক ওয়াসিফকে চাপাতি দিয়ে আক্রমন করলো মৌলবাদী জঙ্গীরা রাতের আলো-আঁধারিতে। মৃত মনে করে রাস্তায় গভীর রাতে ওয়াসিফকে ফেলে যখন পালালো জঙ্গীরা দ্রুত, তখন পথচারীরা ধরাধরি করে হাসপাতালে নিলো তাকে একটা বাইকে। এবং সত্যিই মরলো না মারাত্মক জীবনদ্রোহি ওয়াসিফ। তাৎক্ষণিত শাহবাগের কর্মীরা ৪-ব্যাগ রক্ত দিয়ে এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিলো তাকে। কিন্তু মেডিকেলের বেডে শুইয়েও মুক্তমনা পোস্ট দিতে ভুল হতোনা ওয়াসিফের প্রতিনিয়ত প্রতিক্ষণে।
:
বন্ধু অভি মুক্তমনা ওয়াসিফকে আক্রমনের পুরো বৃত্তান্ত একদিন শোনালো স্বর্ণাকে। ধর্মভীরু কিন্তু মানবিক স্বর্ণা বিস্মিত হলো ওয়াসিফের আক্রমনের ঘটনা শুনে। পুরো ঘটনা জানতে সে ঢুকলো ওয়াসিফের ফেসবুক আর ব্লগে। বন্ধু অভি মেনটর হিসেবে কাজ করলো স্বর্ণার। সে ওয়াসিফের লেখাগুলোর যুক্তির ঝাঁঝালতা তুলে ধরে ছিন্নভিন্ন করতে থাকলো স্বর্ণার বিশ্বাসের খুঁটি-গুলোকে। ক্রমাগত সত্যি ওয়াসিফের আক্রমন-কিসসা, ধর্ম আর বিবর্তন বিষয়ক তার লেখার তীক্ষ্নতা, যৌক্তিকতার ঝঙ্কারে মুগ্ধ হলো স্বর্ণা। এবং এর ধারাবাহিকতায় যুক্তি, বিজ্ঞান, মানবিক বোধ আর যৌক্তিকতার কাছে ধুসর হতে থাকলো স্বর্ণার ধর্মবিশ্বাসের অলৌকিকত্বের সিঁড়ির পিচ্ছিল নড়বড়ে ধাপগুলো। এবার মেডিকেল পড়ার ফাঁকে পবিত্র ধর্মপুস্তকগুলো পড়ে ফেললো সে দুমাসেই। এবার নাড়া দিলো ওর বোধে তীব্রভাবে ধর্মচিন্তা। ওয়াসিফের ব্লগের পুরো আটিক্যালগুলো অনুপুঙ্খভাবে পড়লো সব, বিশেষ করে “ছোটকালে আমি’, ‘এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটে” নামের নিবন্ধ দুটো পড়ে বিমোহিত হলো স্বর্ণা। নরওয়ে থেকে দেয়া নতুন পোস্টগুলো অভি আর স্বর্ণাকে ট্যাগ করতে থাকলো ওয়াসিফ। এবং এসব পাঠান্তে সত্যিই ধর্মপ্রেমিক স্বর্ণা বিস্ময়করভাবে রূপান্তরিত শিলার মতো আকস্মিক রূপান্তরিত হলো পুরো নাস্তিকে। এবং গলে গেলো স্বর্ণা থকথকে জলদ শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা নরম মাটির মতো। ভূগভীরে অভ্যন্তরীণ প্রচন্ড তাপ আর চাপে যেমন গ্রাফাইট কালাতিক্রমে রূপান্তরিত হয় ‘কোয়ার্টজ’ কিংবা ‘হীরকে’, হ্যা ওয়াসিফই তার প্রচণ্ড লজিক্যাল দহনে স্বর্ণাকে পুড়িয়ে পুরো নাস্তিকে পরিণত করে দিলো এক বাসন্তি ঝড়ো বাতাসে! এবং এতোদিনের তার লালিত বিশ্বাস আর দৃঢ়তা কেবল অসত্য নয়, হাস্যকর মনে হতো লাগলো স্বর্ণার কাছে, যা ক্রমশ ঋজু থেকে লীন হতে সময় লাগলো না স্বর্ণার। ধর্মান্ধ স্বর্ণা মাত্র কদিনেই পরিণত হলো পরিপূর্ণ নাস্তিকে। ওয়াসিফের হত্যা প্রচেষ্টাকেই স্বর্ণাকে মুলত আস্তিক থেকে নাস্তিকে নামিয়ে আনলো।

:
সেই থেকেই মুলত ওয়াসিফে ফিদা স্বর্ণা। অদেখা অচেনা অজানা ওয়াসিফের এ লেখাগুলোই এক শ্রদ্ধাবনত ভাললাগা, ক্রমশ প্রেমে রূপান্তরিত করে বাইশ বছরের সুন্দরি-মেধাবি-রোমান্টিসিজমে প্লাবিত তরুণি স্বর্ণাকে। এর মধ্যে মেডিকেল ও সোস্যাল নেটওয়ার্কে অনেক ভাল বন্ধু জোটে স্বর্ণার কিন্তু নিজেকে সে একান্তই সংরক্ষণ করে গুরু, টিচার, প্রেমিক ওয়াসিফের জন্যে। তার দৃঢ়তা জন্মে অবশ্যই এথিস্ট ওয়াসিফকে একদিন পাবে সে ইউরোপের নরওয়েতে গিয়ে।

:
ঢাকার এসব কথা কল্পনা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে স্বর্ণা নরওয়ের বরফ জমা শীতার্থ ট্রেনের ৪৬৩-কিমি দীর্ঘতর পথে মনে নেই তার। অন্ধকার রাতে ট্রাকে জমা ক্রিমি আইস কেটে-কেটে সকালের দিকেই ‘অসলো’ পৌছে যায় ইউরোপা-রেলের অত্যাধুনিক ট্রেন। স্টেশন থেকেই একটা ট্যাক্সি নেয় সরাসরি ‘ভিসপিরুদ’ যেতে। অসলোর ভিসপিরুদেই একটা ফ্লাটে থাকে ওয়াসিফ। ঢাকা থেকে আসার আগে তার বোন থেকে ফ্লাটের পুরো ঠিকানাটাই নিয়ে এসেছে স্বর্ণা, যাতে ওয়াসিফকে ‘সারপ্রাইজ’ দিতে কোন অসুবিধা না হয় স্বর্ণার। ট্রেনে এক ইংরেজি ভাষিক নরওয়েজিয়ান ভদ্রলোক পেয়ে, তাকে দিয়ে ওয়াসিফের পুরো ঠিকানাটা ইংরেজি থেকে নর্জ ভাষাতে লিখিয়ে নিয়েছে স্বর্ণা। ট্যাক্সিওয়ালার যাতে বুঝতে বা বোঝাতে কোন প্রবলেম না হয় স্বর্ণার। এবং ঠিকানামত ট্যাক্সি একদম ওয়াসিফের ভিসপিরুদ প্রধান সড়কের ১৬৭/বি ফ্লাটের সামনে এসে দাঁড়ায়।

:
দরজার পাশেই নর্জ ভাষাতে দুটো নামের একটিতে ওয়াসিফের নাম দেখে এক ভাললাগা কৈশোরিক প্রেমের সৃষ্টিক্ষণের প্রাণজ প্রেমতায় ডুবে যায় স্বর্ণা। ঠান্ডা জমে যাওয়া কাঁপা হাতে বেল টিপতেই সামনের টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এক শেতাঙ্গ নারীর ছবি। নর্জ ভাষায় সে জানতে চায় স্বর্ণার পরিচয়। স্বর্ণা ইংরেজিতে বলে ঢাকা থেকে এসেছে সে ওয়াসিফের বন্ধু!
:
দরজা খোলে শেতাঙ্গিনী কথিত নর্জ নারী। হেসে করমর্দন শেষে নিজের নাম ‘ব্রিদ’ বলে ভেতরে বসায় স্বর্ণাকে। নিজের পরিচয় দেয় ব্রিদ ওয়াসিফের স্ত্রী হিসেবে। সেও জব করে ওয়াসিফের সাথে একই অফিস অসলোতে। কিন্তু মাত্র দুমাস আগে ‘বেবি’ হয়েছে তাদের, তাই ‘ম্যাটারনিটি’ লিভে আছে ব্রিদ। ওয়াসিফ একটু আগে অফিসে গেছে বেবিটাকে আদর করে বলেই হেসে ওঠে ব্রিদ স্বর্ণালী আকাশে রূপোলি মেঘের মত। স্বর্ণা তাকায় ওয়াসিফ আর ব্রিদের দুমাস বয়সি নীলাভ চোখের ছোট বেবিটার দিকে। নাম জানতে চায় সে বেবিটার। ‘ক্যামিলা ব্রিদ ওয়াসিফ’ নাম বেবিটার, নিক নেম ‘ক্যামিলা’।

:
বেবী সিটার থেকে কোলে নেয় স্বর্ণা ক্যামিলাকে। বুকের সাথে সেটে ধরে রাখে অনেকক্ষণ ক্যামিলাকে সে! একটু আগে ওয়াসিফ বুকে নিয়েছিল ক্যামিলাকে। ক্যামিলার শরীর থেকে ওয়াসিফের গন্ধ স্বর্ণার বুক বেয়ে হৃদপিন্ডে চলে যায় দ্রুত। ক্যামিলার দিকে চেয়ে চোখে জল নামে স্বর্ণার। কিছুই বলতে পারেনা স্বর্ণা ব্রিদকে। বিস্মিত চোখে ব্রিদ চেয়ে থাকে স্বর্ণার দিকে। সে বুঝতে পারেনা, তার মেয়েকে বুকে চেপে কেন কাঁদছে এ অচেনা বাংলাদেশ থেকে আসা মেয়েটি এ ক্লেদময় তুষারঝড়া অসলোতে।

:
চারদিকে পেজা তুলোর মত প্রচন্ড তুষারপাতের মাঝেই দরজা খুলে বাইরে বেড়োয় স্বর্ণা। ব্রিদ বুঝতে পারেনা, সুদুর ঢাকা থেকে ওয়াসিফের বন্ধু দেখা করতে এসেও, প্রচন্ড তুষারপাতের মাঝে দেখা না করেই কেনইবা চলে যাচ্ছে সে! ভাল ইংরেজি জানেনা ব্রিদ, তাই সে কেবল তার নীল চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে তুষারে ভেজা রাস্তায় নামা স্বর্ণার দিকে। নর্জ ভাষা জানেনা স্বর্ণা, তাই কিছুতেই বলতে পারেনা সে ব্রিদকে যে, “ব্রিদ তুমি যার সন্তান পেটে ধরেছো, তার জন্যেই পাঁচ বছর তপস্যা করে ওসলো এসেছিলাম আমি, কেবল তার জন্যেই ব্রিদ!

:
তুষারপাতের সাথে এবার ঝড়ো বাতাস শুরু হয় অসলোর সাদা ধবধবে ভেজা সড়কের পিচ্ছিল রাস্তায়। তল-আঁধারি ঝালোডাঙার নদী পেরিয়ে এ ঝড়ের মাঝেও স্বর্ণা নেমে আসে পেজা তুলোর মত বরফ ঢাকা পথে। তার চোখের স্তিমিত রক্তের দলিত লাভারা এবার বের হতে চায় ভিসুভিয়াসের মত বেদনার জল হয়ে। কিন্তু আদ্যোপান্ত জীবনের দুখবাতাসে কাঁপা কষ্টেরা অক্টোপাসের মত ঘিরে ধরে উড়তে থাকে স্বর্ণার চারপাশে। এক তৃষিত অনুমিতির বোধ, ভাললাগা, প্রজ্ঞা কিংবা প্রেমময়তায় ভাসতে ভাসতে স্বর্ণা এগিয়ে যায় অসলোর অচেনা রেল স্টেশনের দিকে। চিন্তনের ঋজুতার মাঝে এক সংহত প্রজ্ঞাময়তার গল্পমালা হয়ে ওয়াসিফ, ব্রিদ আর ক্যামিলা বেঁচে থাকে স্বর্ণার হৃদ-মেমব্রেনে! যা হয়তো প্রেম কিংবা হিংসায় ভরা এ ভোগবাদি মেধার বাইরেই থেকে যাবে অনন্তকাল স্বর্ণা কিংবা ওয়াসিফের কাছে !

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of