অভিজিত রায়ের মৃত্যু এবং সৃজনশীল নাস্তিকের ভূমিকা

গতকাল দাঁড়িপাল্লা স্মৃতিচারণ করে ব্লগ-অনলাইন জীবন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটের অনেক কাহিনী তুলে ধরেন। যদিও অর্ধসত্য। তার স্ট্যাটাস পড়ে আমার অনেক কাহিনী মনে পড়ে যায়। আমি ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত (বাঙলাদেশ ছিলাম) অসংখ্য ভয়ংকর ও নোংরা ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষী। বিশেষ করে ২০১৩-২০১৫ সালের শাহবাগের আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্লগার নিয়ে রাজনীতি, জেল, ব্লগারদের মধ্যে শয়তানী-হারামিপনা, প্রতিবাদসভা, টেলিভিশনে উপস্থিত হওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী। যেহেতু আমি কোন সময়ই কোন নাস্তিক দল, আস্তিক দল, আওয়ামী দল, বিএনপি দল, নারীবাদী দল, ছাগু দল, বা সিন্ডিকেটে বিশ্বাসী এবং অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না এবং নই, তাই আমার সামনে এবং আমাকে অনেকেই অনলাইন ও অফলাইনের অসংখ্য কাহিনী বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি। আমি যে অন্যদের মতন গুটিবাজ টাইপের মানুষ নই তা সকলেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিল। এবং এটাও সত্য যে, অনেকেই আমাকে নানা ধরণের নোংরামি থেকে দূরে রেখেছিল এবং আমি অনেক নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ, মুক্তমনা, আওয়ামীলীগ (ছাত্রলীগ) ও বামপন্থী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আর্থিক ও রাজনৈতিক এবং আরও নানাভাবে নানা ধরণের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলাম।

যাই হোক, দাঁড়িপাল্লার স্ট্যাটাস নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করব। আমারও একটা কাহিনী মনে পড়ে গেছে।

২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৫, এই দিনটি কি বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন আছে? ওই দিনে অভিজিত রায়কে আল্লাহ্‌র রাস্তার সৈনিকেরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মেরেছিল। ওই সময় আমি কোথায় ছিলাম? আমি বইমেলায় ‘শব্দশৈলী’ স্টলে ইফতেখার আমিনের সাথে ছিলাম। সন্ধ্যার দিকে, জীবনে প্রথমবারের মতন জোবায়েন সন্ধি আমাকে ফোন করে বইমেলায় দেখা করার ইচ্ছাপোষণ করেন এবং এটাও বলেন যে, তার সাথে ১২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বর্তমানের সৃজনশীল নাস্তিক আরিফুর রহমানও আসবেন, আমার কি তাতে কোন আপত্তি আছে কী না? আমি জোবায়েন সন্ধিকে আমার স্টলের সামনে আসার আমন্ত্রণ জানাই এবং তারা দুজনই আমার স্টলের সামনে আসেন। পরবর্তীতে আমরা শব্দশৈলী স্টলের ডানদিকে উন্মুক্ত একটি স্থানে আইনভঙ্গ করে বইমেলার প্রাঙ্গণেই ধূমপান করতে করতে কথাবার্তা বলতে থাকি। সে সময় জোবায়েন সন্ধি ও আরিফুর রহমানের সাথে দুই একটি ছবিও তোলা হয়। কিছুক্ষণ পরেই আমাদের সাথে যুক্ত হন সিলেট টুডের সম্পাদক কবীর য়াহমদ। এটাই ছিল এদের সাথে আমার প্রথম দেখা। আমরা সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে কথাবার্তা বলি। তারপর আমার প্রকাশক এসে আমাকে জানান যে, টিএসসিতে নাকি ঝামেলা হয়েছে, কাকে নাকি মারা হয়েছে। আমি প্রকাশককে মূল ঘটনা জেনে আমাকে জানানোর জন্য অনুরোধ করি।

আমি জোবায়েন সন্ধি, আরিফুর রহমান, ও কবীর য়াহমদকে টিএসসির উদ্দেশ্যে হাঁটার জন্য বলি এবং বইমেলা থেকে বের হয়েই লক্ষ্য করি যে রাস্তার বাতিগুলো বন্ধ। আমরা টিএসসিতে রুবেলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কী ঘটনা ঘটল, কোথায় ঘটল- তা বোঝার চেষ্টা করি এবং ওখানের দোকানদারদের জিজ্ঞেস করি কাহিনী কী হয়েছে? এটাও লক্ষ্য করি যে, টিএসসিতে অস্বাভাবিক এক বেদনা ভর করেছে। বলা যেতেই পারে যে, টিএসসি হয়ে উঠেছিল জনমানব শূন্য একটি ক্ষতবিক্ষত দ্বীপ। আমার প্রকাশক আমাকে ফোন করে জানান যে, অভিজিত নামের একজন লেখককে টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়েছে। আমি এই খবরটি জোবায়েন সন্ধি, আরিফুর রহমান, কবীর য়াহমদকে জানাই।

এই সংবাদটি শোনার পর আমরা সকলেই বিচলিতবোধ করি। এরপর আরিফুর রহমান কয়েকজনকে ফোন করেন কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেন না যে, কাকে কোপানো হয়েছে। আরিফুর রহমান আমাদের জানান যে, টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজে বলা হচ্ছে, টিএসসিতে এক দম্পতিকে চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। আমি ততোক্ষণে খবর পেয়ে যাই যে, ঢাকা মেডিক্যালে অভিজিত রায়কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি তাদের জানাই যে, আমি ঢাকা মেডিক্যালে যাচ্ছি, আপনারা কি আমার সাথে যেতে চান কি না? তারা আমার সাথে গাড়িতে ওঠেন এবং আমরা মেডিক্যালে পৌঁছে জানতে ও দেখতে পাই যে- অভিজিত আর নেই। আমাদের পূর্বেই অজয় রায় উপস্থিত হয়েছিলেন কিন্তু তাকে তখনও জানানো হয় নি যে, তার ছেলে আর জীবিত নেই। আমাদের চোখের সামনেই অজয় রায়কে জানানো হয়েছিল তার পুত্র আর বেঁচে নেই। (অজয় রায়কে নিয়ে আরও বিস্তারিত লেখা সম্ভব কিন্তু লিখতে ইচ্ছে করছে না।) আমি অভিজিত রায়ের মৃতদেহ ছুঁয়ে দেখি। তার মুখমণ্ডল থেকে সাদা কাপড়টি তুলে দেখি মাথার পিছনের অংশ নেই। মগজ আছে আবার নেই, রক্তের দাগ লেগে আছে ঘাড়ে, গলায় ও হাতে। আমি একটি রুমে ঢুকে দেখি বন্যা আহমেদ বিড়বিড় করে নার্সদের কিছু একটা বলছে। বন্যা আহমেদের মাথায় ব্যান্ডেজ। দুজন নার্স বন্যা আহমেদের রক্ত মুছছে আর ইনজেকশন দিচ্ছে। বন্যার মনোবল তখনও শক্ত ছিল। আমি সাহস করে বন্যার কাছে গেলে শুনতে পাই ‘অভিজিত কই, অভিজিতকে দেখতে চাই।” একজন নার্স আমাকে দেখে বলেন, রোগীকে এখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবো, আপনি এখন যান।

রাত হতে থাকে। হঠাৎ করে পাঁচ ছয়টি বোমার শব্দ শুনতে পাই। মানুষজন কমতে থাকে। আতংক ছড়াতে থাকে। ভীতি বাড়তে থাকে। মানুষজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। মেডিক্যাল জনমানব শূন্য হতে থাকে। শাকিল অরণ্য ও খান আসাদুজ্জান মাসুদের নেতৃত্বে মেডিক্যাল থেকে দশ বারজন বামপন্থী ও সৃজনশীল মানুষেরা স্লোগান দিতে দিতে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

জোবায়েন সন্ধি এসে জানান যে, আরিফুর রহমান খুব ভয় পাচ্ছেন। আরিফুর রহমানের ধারণা যে, তার উপরও আক্রমণ করা হবে। বোমার শব্দই তার পূর্বাভাস। আমি যেন আরিফুর রহমানকে তার বাসায় নামিয়ে দেই। আমি তাকে অপেক্ষা করতে বলি। বাকিবিল্লাহর সাথেও তখন দেখা হয়। ঝান্ডুবাম থেকে হেফাজতের রক্ষিতাও সেখানে উপস্থিত হন। জার্মানি থেকে আসিফ মহিউদ্দীন মেসেজের পর মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছিলেন। জোবায়েন সন্ধি দ্বিতীয়বারের মত আমাকে এসে অনুরোধ করেন যে, আমি যেন আরিফুর রহমানকে বাসায় নামিয়ে দেই। আরিফুর রহমানের বাসার মানুষজন ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে। আরিফুর রহমানও ভীত, সন্ত্রস্ত। কিছুক্ষণ পর আরিফুর রহমান এসে আমাকে অনুরোধ করেন, আমি যেন তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি। তিনি স্বস্তিবোধ করছেন না, তিনি জানান। আমি আরিফুর রহমানের চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাই। আমার খুব মায়া হয়। আমি তাকে দ্রুত বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসি। যাত্রাপথে তিনি একটি বাক্যও ব্যয় করেন নি। বাসায় মানুষজনকে ফোন করে তিনি জানিয়েছিলেন যে তিনি মেডিক্যাল থেকে রওনা দিয়েছেন। তিনি এতটাই আতংকিত ছিলেন যে, তার বাড়ি কোনটা তা স্পষ্ট করে আমাকে বলতেও চাচ্ছিলেন না। আমি জোরজবরদস্তিও করি নি। গাড়ি থেকে নামার সময় শুধু বলেছিলেন, আপনাকে অনেক থ্যাংকস, আমি খুব নার্ভাস। ঢাকা থেকে বিদেশ যাওয়ার দিন আরিফুর রহমান আমাকে প্রথম ও শেষবারের মত ফোন করে ভয়, আতংকের কথা জানান এবং সেই রাতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন।

বন্যা আহমেদ সুস্থ হাওয়ার পর আরিফুর রহমানের সাথে একটি লাইভ ভিডিও করেন। সেখানে আরিফুর রহমান ২৬শে ফেব্রুয়ারিতে নিজের অবস্থান এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন এবং আমার নামটি খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সাথে উল্লেখ করেছিলেন- যা দেখে আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। জোবায়েন সন্ধির নামটি তো উচ্চারণই করেন নি।

গত চার বছর বছর আমি এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সাড়াশব্দ করি নি। আমার আসলেই কিছু যায় আসে না কেউ যদি আমাকে প্রতাখ্যান করে নিজেকে হিরো হিশেবে উপস্থাপন করতে চায়! পল্টি মারার ক্ষেত্রে আরিফুর রহমানই যে একমাত্র তা নয়, ইউরোপে অবস্থানরত অনেক কথিত ব্লগারের জন্য আমি যা করেছি তা তাদের বাবামাও করেন নি- এই বাক্যটি তাদেরই মুখের কথা ছিল।

সে যাই হোক না কেনো, কিছুদিন আগে নাদিয়া ইসলামের সাথে আরিফুর রহমানের লাইভ ভিডিওটিতে তিনি আবারও অভিজিত রায়ের ঘটনা উল্লেখ করে নিজেকে বীর প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। তখন আমার খুব হাসি পেয়েছিল। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় যে, ১২ বছর ধরে একটি বিষয়ে অংশগ্রহণ করার পরেও যখন কেউ আপনাকে গোনায় ধরবে না তখন নিজের মার্কেটিং নিজেরই করতে হবে। গতকাল দাঁড়িপাল্লায় স্ট্যাটাস পড়ে আরিফুর রহমান যেভাবে সিন্ডিকেট সিন্ডিকেট বকছিলেন তা দেখে কিঞ্চিত বিরক্ত হয়েছি।

সত্যি কথা বলতে, নাস্তিক হলে বা নাস্তিকতার চর্চা করলেই যে শুদ্ধ ও সত্যবাদী মানুষ হবেন এমন ধারণা বহুপূর্বেই অনলাইনের মানুষজনের সাথে পরিচিত হওয়ার পর বদলে গিয়েছিল। আমি শুধু ইতিহাস তুলে ধরলাম।

3
Leave a Reply

avatar
3 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
3 Comment authors
জ্যাক পিটারশহিদুজ্জামান সরকারপৃথু স্যন্যাল Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
পৃথু স্যন্যাল
পথচারী

বলার আছে আমারও কিছু। কিন্তু বলে কী হবে ভেবে ক্ষান্ত দিই।

শহীদুজ্জামান সরকার
পথচারী

একটা বিষয় মনে হইলো,
বাংলাদেশের নাস্তিকতার আন্দোলনটা কতদূর আগায়ে নিয়ে গেছে আমাদের এইসব ব্লগার স্যাররা।
আরিফুর স্যার তো সারাদিন পড়ে আছেন সিন্ডিকেট ট্রল চরিত্র নিয়া।
তিনি তো ঘোষনা দিয়াই দিছেন যারা ট্রল করবে তাদের তিনি তার ফেসবুক লিস্টে রাখবেন না।
তবে একটা বিষয় উপলব্ধি সবাই একাই এই আন্দোলনটার ক্রেডিট নিতে চায়।

নুরনবী স্যারের মতো আমিও একজন শুধু দর্শক মাত্র শুধু দেখেই যাইতেছি।

জ্যাক পিটার
পথচারী

অনেক অজানা সত্য তুলে ধরার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ ।