বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ৪

হাজী তিতুমীরকে কলকাতায় দেখা যায় ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে। সেই বছরেই যশােহরের মােক্তার ফৈদ-আল-দ্বীনের সঙ্গে কলকাতায় তিতুর পরিচয় হয়। ফৈদ-আল-দ্বীন তিতুর ভক্ত হয়ে ওঠে। ১৮২৭ খৃষ্টাব্দে তিতু জেহাদের কাজ শুরু করে। বেলায়েৎ ও এনায়েৎ আলী জেহাদের রসদ এবং সৈনিক বা মুজাহিদ সংগ্রহ করতো, কারণ বেরিলবীর দেখানো পথটাই ছিল জেহাদের পথ। কোনো শিষ্য অন্য পথে হাঁটলে বেরিলবী তাকে কঠোর শাস্তি দিত। সরকারী কাগজপত্রে উল্লেখ আছে ‘তরিকা-ই-মহাম্মদীয়া’ জেহাদের বছর তিনেক আগে থেকেই তিতু তার নিজ গ্রাম হায়দরপুরে এসে বসবাস করতে শুরু করে। ওই সময়ে তার বয়স ছিল বছর পঁয়তাল্লিশের মত। ভারত ভূমির তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষের ইতিহাস লিখে বিখ্যাত রণজিৎ গুহ লিখেছেন :
‘কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস যখন কোনও লেখক লেখেন তখন অবচেতন ভাবে হলেও লেখক তাঁর শ্রেণী চেতনা দিয়েই বিদ্রোহটিকে দেখেন। ফলে কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস যথার্থ হয় না। বিদ্রোহের মূল চরিত্র কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা ইতিহাসই যথার্থ ইতিহাস।’

যাইহোক পাঠক, এগোনো যাক। আগের পর্বগুলোতেই জানিয়েছি যে, তিতুমীর এক সম্পন্ন কৃষক পরিবারের সন্তান ছিল । সে নিজহাতে কোনোদিনও চাষ আবাদ করেনি, বরং পড়াশোনা করেছে এবং শরীর চর্চা করেছে । এরপর সে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে সাঈদ আহমদ বেরিলবীর মত একজন ইসলামী তত্ত্ববিদের। হ্বজ করেছে তারই সঙ্গে। তিতুর মত একজন আশ্রফ মুসলমান সন্তান ছোটবেলায় কী শেখে ? জানা নেই পাঠক ? আসুন শরণাপন্ন হই গত শতাব্দীর বিখ্যাত প্রাচ্যতত্ত্ববিদ টমাস পাট্টিক হিউজের :
‘যত শীঘ্র সম্ভব শিশুকে কলেমা উচ্চারণ করতে শেখানাে হয়। এরপর তাকে শেখানাে হয় ইসলামের নানা গৌরব গাঁথা। সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণা করতে শেখানাে হয় অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়কে। এরপরে মক্তবে মাদ্রাসায় আরবী বর্ণপরিচয়—শ্লেটে লিখে লিখে শেখান মৌলভীরা। বর্ণপরিচয়ের পর শেখানাে হয় আল্লাহর নিরানব্বইটা নাম। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছােটখাটো আরবী পদও। তারপর শেখানাে হয় কোরাণের প্রথম অধ্যায়টা পড়তে ও লিখতে। পরে গােটা কোরাণটা–একটা লাইনও না বুঝেই। কোরাণ লেখার পর কিছু কিছু ব্যাকরণ ও অঙ্ক। এরপর হিন্দুস্থানী বা ফার্সী ভাষায় কিছুটা দক্ষতা। গুলিস্তান এবং বােস্তান উভয়ই পড়তে পারলে ধরে নেওয়া হয় ফার্সী ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতা জন্মেছে।’

তাহলে হিউজের উপরোক্ত লেখা থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে ছোটবেলায় তিতুও এই একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিল। তিতুর শিক্ষা কোরাণ-হাদিশ ভিত্তিক শরিয়তী শিক্ষা, যার মধ্যে আছে ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভ, দার-উল-ইসলাম, দার-উল-হারব এবং অবশ্যই জেহাদ। সেই শিক্ষা নিয়ে মধ্য বয়সী তিতু হায়দরপুরে জেহাদের রসদ এবং জেহাদী সংগ্রহ করতে এসে কী দেখল ? দেখলেন গ্রামের মােমিনদের (মুসলমানদের) বাহ্যিকভাবে বা মানসিকভাবে প্রতিবেশী পৌত্তলিক হিন্দুদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছেনা। মুসলমান ইতিহাস লেখকরা ব্যাপারটিকে মুসলমান সমাজে হিন্দুয়ানীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে বর্ণনা করেছেন এবং সেকুলাঙ্গার বেশ কিছু ইতিহাস লেখকেরাও সেই বক্তব্য মেনে নিয়েছেন। স্বপন বসু বিহারীলালের গ্রন্থের সম্পাদনা করতে গিয়ে লিখেছেন : ‘তিতুমীরের সমকালে বাঙ্গালী মুসলমান সমাজে হিন্দুয়ানীর ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে।’ প্রশ্ন হচ্ছে, কে কার মধ্যে প্রবেশ করেছিল, হিন্দুয়ানীর মধ্যে মুসলমানী না, মুসলমানীর মধ্যে হিন্দুয়ানী ? বঙ্গ ভূমি আগে হিন্দু অধ্যুসিত ছিল না, মুসলমান অধ্যুসিত ছিল ? জবাবটা স্বপন বসু নিজেই দিয়েছেন, ঠিক তার পরের লাইনে : “অনেক নও মুসলমান দুর্বলতা ও অশিক্ষার কারণে পূর্বের দেবদেবীর পূজায় ও কুসংস্কার পালনে অভ্যস্ত থাকে।”

গৃহস্থের বাড়ীতে চোর ঢুকলে গৃহস্থের অনুপ্রবেশ হয় না, চোরেরই অনুপ্রবেশ হয়। হিন্দুসমাজে অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ইসলামেরই। সুতরাং তিতুমীর ‘তরিকা-ই-মহাম্মদীয়া’ জেহাদের মানসিকতা নিয়ে গ্রামে এসে প্রথমে এই সকল তথাকথিত আধা মুসলমানদের পাকা মুসলমান করার প্রচেষ্টায় হাত লাগালো । এ প্রচেষ্টায় তার অস্ত্র হলাে শরিয়তের যাবতীয় শিক্ষা। ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ কোনও পুণরুজ্জীবন আন্দোলন নয়, পূর্ণ ইসলামায়নের আন্দোলন।

(ক্রমশঃ প্রকাশ্য)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of