বাংলাদেশের ফেরেশতারা

ফেরেশতারা আর স্বর্গে নাই, সব ফেরেশতারা এখন বাংলাদেশের ফেসবুকে।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন।
বাংলাদেশের ফেসবুকারদের দেখলে মনে হয় সব ফেরেশতাদের আনাগোনা শুধু বাংলাদেশেই।
এই ফেরেশতারা ভাঁজা মাছ উলটে খেতে জানেনা। এরা একাধারে মানবতাবাদী, সত্য প্রকাশে নির্ভীক, এদের চোখ ভরা সমুদ্রের পানি, এদের মত ভাল মানুষ আপনি দুনিয়াতে খুঁজে পাবেন না।
তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ”ভাইরাল” হওয়া। ফেসবুকে ভাল ভাল কথা বললেই তাদের পোস্টে শেয়ার এবং লাইক হবে, এই ভেবে তাদের হৃদয়ে বীর্যপাত হয়। তখনি তারা একেকজন ফেরেশতার রুপ ধারন করেন।
যেসব ঘটনার ভিডিও আছে, সেগুলি নিয়েই তাদের যত চিন্তা। ভিডিও নাই, তো এদের চিন্তাও নাই।
এরাও এক ধরনের সাংবাদিক টাইপের আর কি, জনগন কে খাওয়াতে পারলেই হল। মাঝখান থেকে যদি কিছু ফলোয়ার আর লাইক পাওয়া যায় তাতেই তাদের আনন্দ। এরা সবাই চায় ফেসবুক সেলেব্রিটি হতে। এদের ফেসবুক পোস্ট দেখলে মনে হয় বাংলাদেশের সব সমস্যার মূল কারন হচ্ছে সরকার এবং বাকি ১৯ কোটি মানুষ সব ফেরেশতা। এই ফেরেশতারা মানবতার ঠিকাদারি নিয়েছেন, সুতরাং বি কেয়ারফুল।
এরা বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার খুন হলেও সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই, আবরার হত্যাকাণ্ডে তাদের চেতনাদন্ড দাড়িয়ে যায়। তারা আবরারকে নিয়ে গান লেখেন, কবিতা বানান, নাটক বানান, কার্টুন বানান। এদের মানবতার ফেনা যেন উপচে পড়ছে। আবার এরাই রাস্তায় কোন চোর, ছিনতাইকারী দেখলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে দ্বিধাবোধ করেনা। নাস্তিক, সমকামীদের মেরে ফেললে মনে মনে খুশি হয়। এরাই ধর্ষণকারীদের ফাঁসি চায়, আবার এরাই রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করে, নিজেকে মনে করে কবির সিং।
আমি লিখে দিলাম, আবরার কে নিয়ে এদের চিন্তা বড়জোর ৬ মাস। তারপর যেই লাউ, সেই কদু। নতুন কোন ঘটনা, নতুন আলোচনা। ফেরেশতাদের নতুন নতুন স্ট্যাটাস প্রসব করার ব্যস্ততা, পুরনো জিনিস ঘাটার সময় কই?
”বাঙ্গালির ব্রেইন হল বাংলা সিনেমার নায়কের মত, একবার মাথায় বাড়ি খেলে ভুলে যায়, আবার বাড়ি খেলে স্মৃতিশক্তি ফিরে আসে”।
এই ফেরেশতারা আবার খুবই আবেগী। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিয়ে এদের আবেগের শেষ নেই। ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশ ছাড়া খেলোয়াড়দের নিয়ে পুরো পৃথিবীতে কেউ এত মাতামাতি করেনা। এই ফেরেশতারা আবার মুসলিম ক্রিকেটারদের খুব পছন্দ করে। মুশফিক যখন ইমামতি করে ক্রিকেটারদের নিয়ে নামাজ পরে, তখন এরা গোলাপফুল মার্কা কমেন্ট দেয়। কিন্তু সৌম্য সরকার, লিটন দাসদের এরা দলে চায়না। মাশরাফির একের পর এক বাজে পারফরম্যান্সের পরেও এরা তাকে মাথায় তুলে নাচে। তাকে নিয়ে গান বানায়, তাকে এম পি বানায়। কিন্তু হিন্দু ক্রিকেটারদের কেন দলে রাখা হয়েছে তা নিয়ে তাদের প্রশ্নের অন্ত নেই।
সাকিবকে যদিও তার দোষের কারনে ব্যান করা হয়েছে, কিন্তু এই ফেরেশতারা সেটা মানতে নারাজ। সব দোষ পাপনের। আগারওয়াল সাকিবকে টাকার অফার করলে, সাকিব যে আগারওয়ালের সাথে দেখা করতে চেয়েছিল সেটা এই ফেরেশতারা পড়েনা। তারা শুধু বলে টাকাতো নেয়নাই, কুমিরের খাঁজকাটা খাঁজকাটা গল্প আর কি। একি অপরাধে বিশ্বের ৮ জন ক্রিকেটারকে যে আরো বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেটা এই ফেরেশতারা পড়েনা। সানাথ জয়সুরিয়াকে এই একই কারনে ২ বছর শাস্তি দেওয়া হয়েছিল সেটা তারা জানেনা।
এই ফেরেশতারা আবার মা বাবার খুব ভক্ত ( শুধু ফেসবুকে )। মা বাবা দিবস এলেই এরা পাগল হয়ে যায় এরা মা বাবাকে কত ভালবাসে সেটা প্রমান করার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এরা মা বাবার সাথে কেমন আচরণ করে তা বলাই বাহুল্য। ঐ যে লাইক এবং শেয়ার, ওটাই দরকার।
রিফাত হত্যার কথা মনে আছে? সবাই মিন্নিকে নিয়ে তোলপাড়। এখানেও ভিডিও আছে তাই ফেরেশতাদের চোখে পড়েছিল ঘটনাটা। নিজের স্বামীর জীবন বাঁচাতে মিন্নি কি চেষ্টাই না করেছে। আহারে! ফেরেশতাদের চোখ বেয়ে যেন পানির ঝরনা পড়ছিল। পরে আরেক ভিডিওতে যখন দেখা গেল, মিন্নি নিজেই এই হত্যার ষড়যন্ত্রকারী, তখনই ফেরেশতাদের আচমকা চোখপলটি। মিন্নির মত মেয়েরা এই সমাজের কলংক… হ্যান ত্যান। আবার এই মিন্নিই যখন বঙ্গবাজারে যায় তার সাথে ফেরেশতারা সেলফি তোলে, পোশাক কিনতে ডিসকাউন্ট দেয়। মাঝখান দিয়ে নয়ন বন্ড জেলের ভাত খায়।
এই দুইদিন ধরে বাংলাদেশি ফেরেশতারা আবার খুব একটিভ। মিথিলা আর পরিচালক ফাহমির কয়েকটা ব্যাক্তিগত ছবি ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই দেখেছে, আমিও দেখেছি। কিন্তু আচমকা কিছু ফেরেশতাদের মানবতাদন্ড উত্থিত হয়ে গেলো। এরকম পারমিশন ছাড়া কার ছবি শেয়ার করা গুনাহ, এদের কোন লজ্জা নেই। এটা করা ঠিক না, যারা এগুলি শেয়ার করবে তারা আর ফেরেশতা নয়, তারা হল শয়তান হ্যান ত্যান…
আবার এই ফেরেশতাদের সবাই কিন্তু প্রভার ভিডিও দেখেছে, গুগলে সার্চ করেই দেখেছে। কারো কারো কালেকশনেও আছে হয়তো। যে ফেরেশতারা কারো ব্যক্তিগত ছবি প্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার, আমি তাদেরকেই দেখেছি বিদেশি মেয়েদের যৌনউদ্দীপক ছবি তাদের অনুমতি ছাড়াই শেয়ার করতে। এই ফেরেশতাদের সার্চ হিস্টোরি দেখলে আপনার ৩ বার অজু করা লাগবে। হার্ডডিস্কের হিডেন ফোল্ডারের কথা নাইবা বললাম। এরা এমন কোন পর্ণস্টার নাই যাকে চেনেনা, কিন্তু ফেসবুকে এরা সবাই আল্লামা শফির মত নিষ্পাপ। (pun intended)
এই ফেরেশতাদের নিয়ে আমার যত দুশ্চিন্তা। এরা সবাই যদি ফেরেশতা হয় তাহলে বাংলাদেশে এত দুর্নীতি কেন? বাংলাদেশে এত সমস্যা কেন? এরা যদি সেক্সকে এতই খারাপ মনে করে আমাদের জনসংখ্যা ২০ কোটির কাছাকাছি কেন? এই ফেরেশতারা কেন শুধু খারাপ জিনিস নিয়েই চিন্তা করে, বাংলাদেশের ভাল দিক নিয়ে এদের কেন চিন্তা নেই? এই ফেরেশতারা কেন শুধু বাংলা মুভির পুলিশের মত ঘটনার পরে এসেই ” আইন হাতে তুলে নিবেন না ” টাইপের ডায়লগ দেয়? আগে এরা কোথায় থাকে? এরা সব কিছুর জন্যেই কেন শুধু সরকার কে দোষারোপ করে, এরা কি জানেনা, ”যে দেশের জনগন যেমন, সেই দেশের সরকার তেমনই হয়” ?
এই ফেরেশতাদের সিলেক্টিভ মানবতাদন্ড নিয়ে আমি যারপরনাই বিরক্ত।
আল্লাহ ( যদি থাকে ) যেন এই ফেরেশতাদের ফেসবুকিয় হেদায়াত দান করে। সবাই বলুন ” আমেন ”।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of