কলকাতার মিতালী এবং সেন্টিনেল দ্বীপ পর্ব : ১

মিতালীর সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব আমার বছর দুয়েক হলো। কলকাতার এ স্বাধীনচেতা মেয়েটে এরই মাঝে দুবার এসেছে বাংলাদেশ দেখতে। ভারতের অধিকাংশ রাজ্য তার দেখা। পশ্চিম বাংলার কম স্থানই আছে যেখানে যায়নি সে। তার সাথে পরিচয়ের পর অনেক এলাকা দেখিয়েছে সে আমাকে। তার আগ্রহ আর উদ্যোগে মূলত পুরো পশ্চিম বাংলাটা দেখা আমার। এখন তার আগ্রহ এমন এক এলাকাতে যাওয়া, যেটা হবে দুসাহসিক ও বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়ার মত! গত শীতে তার সাথে প্রোগ্রাম করি আন্দামান নিকোবরে যেতে। যদিও এর মধ্যে বেশ কবার বিভিন্ন গ্রুপের সাথে আন্দামান ভ্রমণ করেছে সে একাকি। কিন্তু আমার যাওয়া এবারই প্রথম। বেশ কবার প্রোগ্রাম করলেও নানাবিধ কারণে আন্দামান যাওয়া হয়নি আমার। আন্দামান নিকোবরে গিয়ে দুসাহসিক এক অভিযানে যাবো আমরা দুজনে এমনই প্লান। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কলকাতা থেকে কতগুলো জিনিস কিনলাম আমরা। যাতে রাতে দেখার নাইট-ভিউ চশমা, নাইট ভিশন লাগানো ক্যামেরা ও বাইরোকুলার, প্লাস্টিক বোট, জীবনরক্ষাকারী আরো নানাবিধ জিনিসপত্র। সব জিনিসপত্র লাগেজে ভরে কলকাতা থেকে স্পাইস জেটে উঠে বসলাম পোর্ট ব্লেয়ার যেতে। যার ইকোনমিক ক্লাসে ভাড়া মাত্র নয় হাজার টাকা জনপ্রতি।
:
বিমান থেকে নেমে মাউন্ট হ্যারিয়ার ন্যাশনাল পার্কের কাছে ডায়মন্ড সিটি হোটেলে উঠলাম আমরা। এটা মাঝারি ধরণের মধ্যবিত্ত হোটেল। তবে সমুদ্র দেখা যায় বেশ মনোরম কাছেই। দুদিন এদিক সেদিক ঘুরলাম “ওংগি” আদিবাসির খোঁজে। ওংগিদের এ জন্য দরকার যে, তাদের নিয়ে আমি আর মিতালী এক অজানা দ্বীপ অভিযানে যাবো, যা ভাল করে চেনে এখানের আদি ওংগি আদিবাসির লোকেরা। বেশ কটি স্থানে খুঁজতে খুঁজতে বাজার করতে আসা দুজন ওংগি পুরুষকে পেয়ে গেলাম আমরা। কিন্তু ও দুজন ওংগি পুরোই আন্দামানিজ ‘জাত’ ওংগি। তারা তাদের ভাষা ছাড়া আর কোন ভাষাই বোঝেনা। তাই ওদের কিছু খাবার কিনে দিয়ে ওদের সাথে নিয়ে গেলাম ওংগি গাঁয়ে। সেখানে অনুমতি ছাড়া বিদেশি প্রবেশ নিষেধ হলেও, দুশ রুপি দেয়াতে ওদের গাঁয়ের ভেতরে নিয়ে গেল আমাদের। বেশ কজন ওংগি পেলাম গাঁয়ে, যারা ভাঙা ভাঙা হিন্দি জানে ও কিছুটা বোঝে।
:
গাঁয়ের পাশে এক বড় বৃক্ষতলে দুজন ওংগি বসলো আমাদের সাথে। যারা সমুদ্রে মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া, সাঁতারে বেশ দক্ষ। ওদের হেলপ চাইলাম সমুদ্র ভ্রমণে যেতে। দুহাজার টাকার বিনিময়ে ‘হাউলি’ আর ‘বাদুই’ নামের দুজন ওংগি জওয়ান পরদিন সমুদ্রে নিয়ে যেতে সম্মত হলো আমাদের। হোটেলে ফিরে মিতালী আর আমি নানাবিধ গোপন পরিকল্পনা করতে থাকলাম পরদিনের। যাতে বাদুই আর হাউলির সহায়তায় সফল হয় আমাদের আন্দামানের গোপন অভিযান। খুব ভোরে ওংগি দুজন উপস্থিত হলো আমাদের হোটেলের বাইরে। পোস্ট ব্লেয়ার থেকে ওয়ানদুর যাবো আমরা। সেখানে একঘন্টা থেকে তারমুগলি দ্বীপে রাত যাপন। তারমুগলি দ্বীপে গাঁয়ের কুঁড়েতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করবে ওংগি বাদুই আর হাউলি। এজন্য আলাদা এক হাজার টাকা দিলাম ও দুজনকে। সমুদ্রের অচেনা নানাপথে নৌকো চালিয়ে বিকেলের দিকেই আমরা পৌঁছে গেলাম তারমুগলি দ্বীপে। আমি মিতালী আর বাদুই এবং হাউলি। ওদের আদিবাসি ওংগি গোত্রের এক পুরনো জেলে বাড়িতে উঠালো আমাদের। সেখানে মাছ ভাত সবজি দিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম আমরা চার জনে।
:
বাদুই আর হাউলিকে দূরবর্তী সেন্টিনেল দ্বীপের কথা বলতেই ভয় দেখালো আমাদের। বললো – ‘যাওয়া যাবেনা ওখানে’। গেলে সেন্টিনেলরা মেরে ফেলবে আমাদের। হাজার টাকার নোট দেখিয়ে নানাবিধ লোভ দেখানোর পরও সেন্টিনেল যেতে অস্বীকার করলো বাদুই আর হাউলি। সন্ধ্যার পরপরই ওদের নৌকা নিয়ে ওরা বিদায় নিয়ে চলে গেলো ওদের গাঁয়ের উদ্দেশ্যে। আমি আর মিতালী বসে রইলাম তারমুগলি দ্বীপের সমুদ্রঘেরা অন্ধকার ঘরে। এ দ্বীপে নাকি অনেক জেলেরা থাকে। কিন্তু আমরা দেখা পেলাম না একজনেরও। যেখান থেকে সারাক্ষণ কানে বাজতে থাকলো সমুদ্রের শোঁ শোঁ আওয়াজ। অনেক রাত অবধি নিচে সমুদ্র আর আকাশে নক্ষত্র দেখতে থাকলাম আমরা। আর গুণতে থাকলাম কখন ভোর হবে! কখন যাত্রা করবো আমাদের কাংখিত গন্তব্যে!
:
ভোর হতেই ব্যাগে ভাজ করে রাখা “প্লাস্টিক-বোট” বের করলো মিতালী। সোলার চালিত রিচার্জেবল পাম্প দিয়ে হাওয়া ভরে বোট তৈরি করে তা জলে নামালাম আমি। আমাদের সাথে আনা নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র, ক্যামেরা, বাইনোকুলার, ঔষধপত্র. খাবার ইত্যাদি সাজিয়ে বোটে বসলাম দুজনে সূর্য আকাশে ওঠার সাথে সাথে। মোবাইল সাথে থাকলেও নেট নেই এখানে। ইস! ‘গ্রামীণ’ যদি থাকতো আন্দামানে তবে কি ভালই না হতো। মনে পড়লো – বাংলাদেশের মনপুরা আর নিঝুম দ্বীপ সন্নিহিত সব দ্বীপগুলোতে “নেট” দিয়ে রেখেছে ঢাকার গ্রামীণ। সমুদ্রে যেখানেই গিয়েছি সব সময় নেট থাকতো মোবাইলে! এমনকি ফেসবুকে পোস্ট পর্যন্ত দেয়া যায় সরাসরি!
:
ম্যাপ দেখে সোজা পশ্চিম দিকে ইতালি নির্মিত প্লাস্টিক বোট চালাচ্ছি আমরা। প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্টিনেল দ্বীপ। আজ পর্যন্ত ঐ দ্বীপে যেতে পারেনি কেউ। যখনই কেউ সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করেছে, আদিবাসি নিগ্রোয়েড কালো সেন্টিনেলরা আক্রমণ করে হত্যা করেছে তাদের। কোন সভ্য আধুনিক মানুষকে পছন্দ করেনা সেন্টিনেলরা। এমনকি ওদের মতো নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকেও নিজ দ্বীপে প্রবেশাধিকার দেয়নি কখনো। পচিশ বছর আগে একজন ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক সেন্টিনেলদের সাথে বন্ধুত্ব করতে মূল আন্দামান থেকে “ওংগি” জনগোষ্ঠীর দুজনকে নিয়ে গিয়েছিল ওখানে। কিন্তু গায়ের রং ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় অনেকটা এক হলেও, সেন্টিনেলরা গ্রহণ করেনি ভারতীয় কিংবা ওংগি কাউকে। এমনকি ২০০৪ সনের ভয়াবহ সুনামির পর চারদিকে সমুদ্রবেষ্টিত অরক্ষিত সেন্টিনেলবাসীদের অবস্থা দেখা ও তাদের জীবন ও খাদ্য সহায়তা নিয়ে যখন ভারতীয় বিমান বাহিনির হেলিকপ্টার নামার চেষ্টা করে সেন্টিনেল দ্বীপে, ওখানের আদিম আদিবাসিরা এ বিপদসংকুল অবস্থায়ও তীর ধনুক দিয়ে আক্রমণ করতে থাকে হেলিকপ্টারের লোকজনকে। তাই সম্ভব হয়নি কোন সহায়তা সেখানে দেয়া। বরং বিমান বাহিনির লোকজন কোন রকমে ঐ আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করে ফিরে আসে ভারতের মূল ভূখন্ডে!
:
সেই সেন্টিনেল দ্বীপে যাচ্ছি বাংলাদেশের আমি যে কিনা বড় হয়েছি গ্রামীণ এমন এক অন্ধকার দ্বীপে। আর ভারতীয় মিতালী ব্যানার্জী – যে কিনা বড় হয়েছে কলকাতা, লেখাপড়া করেছে কলকাতা এবং তার চৌদ্দ পুরুষ কলকাতার বাসিন্দা। দুদেশের দুই বাঙালি এক দুসাহসিক অভিযানে বের হয়েছি একাকি বাঙালির সাগর পারি দিয়ে। এবং সমুদ্রের নীল জলরাশি কেটে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের আকাঙ্ষিত দ্বীপ সেন্টিনেের দিকে। সূর্য উঠে গেছে মাঝ আকাশে। খালি চোখে দেখা যাচ্ছে ধোয়াশা সেন্টিনেল দ্বীপ অনেক দূরে!
[পরের বাকি অংশ কাল]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of