বিশ্বে শরণার্থী ও বাস্তুহারা বাড়ছে!

২০১৮ সালে বিশ্বে গড়ে প্রতিদিন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এতে প্রতি দুই সেকেন্ডে বাস্তুচ্যুত হয়েছে একজন। সব মিলিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ১০ লাখ, যা এ যাবৎকালের রেকর্ড। এর মধ্যে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দেশের সীমান্ত পেরিয়ে পাশের দেশে গেছে। ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ নিজের দেশেই বাস্তুচ্যুত হয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গেছে। আর প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ ভিনদেশে গিয়ে আশ্রয় চেয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর স¤প্রতি এমন তথ্য জানিয়েছে।

যুদ্ধ, সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাই এত মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। গত ১০ বছরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী বিধ্বংসী যুদ্ধ বহু পরিবারকে নিজ এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আরও যেসব দেশের মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, এর মধ্যে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেন ও মিয়ানমার অন্যতম। মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও ব্যাপক গণহত্যার ঘটনায় ২০১৭ সালের আগস্টে সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজারে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম অবস্থান করছে।

Syrian refugees are seen at the Zaatari refugee camp, on the Jordanian border on 31 May 2017. It’s the second refugee camp in the world . The field of Zaatari grows and spreads in the middle of nowhere. Of temporary solution to being the second largest refugee camp in the world and the fourth largest city in Jordan. Besieged by concertinas and guarded by the Jordanian army, the settlement currently accommodates 85,000 Syrian refugees, half of them children. (Photo by Alvaro Fuente/NurPhoto via Getty Images)

বাড়ি ঘর হারানো মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো শরণার্থী, অন্যটি বাস্তুহারা। সংঘর্ষ, নিপীড়ন বা অন্য কোনো কারণে যেসব মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে অন্য দেশে গিয়ে আশ্রয় খোঁজে, তারা শরণার্থী। আর যেসব মানুষ নানা কারণে স্থানচ্যুত হয়ে নিজের দেশেই অন্য কোথাও নতুন করে আশ্রয় নেয়, তারা বাস্তুহারা। এদেরকে ‘ইন্টারনালি ডিসপ্লেসড পিপল’ বলা হয়, সংক্ষেপে যা আইডিপি নামে পরিচিত। বিশ্বে ‘আইডিপি’ লোকজন সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা যুদ্ধপীড়িত এমন জায়গায় রয়েছে, যেখানে ত্রাণসহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন। কখনো বা সরকারও তাদের নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে না।
বিশ্বে বর্তমানে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সিরিয়া আর কলম্বিয়ায় সবচেয়ে বেশি বাস্তুহারা রয়েছে। বাস্তুহারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের তথ্যমতে, বিরূপ বা চরম আবহাওয়াও বাস্তুহারার সংখ্যা বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে যেসব এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে, আবহাওয়া প্রতিক‚ল হয়ে উঠেছে, এসব এলাকায় অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারার সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাব বাস্তুহারার দল ভারী করছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত আর বস্তিতে এসব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো মানুষের মধ্যে শরণার্থীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘ বলছে, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ২ কোটি ৫৯ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এর অর্ধেকই শিশু। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া মানুষের মধ্যে প্রতি ১০ জনে একজনের কম শরণার্থী। প্রতি চারজনের একজন শরণার্থী সিরিয়ার নাগরিক। ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষের সবচেয়ে বড় দলটি সিরিয়ার। গত বছর বাস্তুহারা ও শরণার্থী মিলিয়ে ১ কোটি ১৩ লাখ সিরীয় নিজের বাড়িঘর ছেড়েছে। এর পরই রয়েছে কলম্বিয়া। গত বছর এ দেশের ৮০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। গত বছর সে দেশের ৫৪ লাখ মানুষ স্থানচ্যুত হয়ে অন্য কোথাও বা বিদেশ চলে গেছে।

গত বছর স্থানচ্যুত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ি ছেড়েছে যুদ্ধের কারণে। তাদের সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ, যা বিশ্বের অনেক বড় শহরের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। একই বছর নিজ দেশে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া মানুষ যে কখনো আপন ঠিকানায় ফিরে আসে না, তা নয়। গত বছর বিভিন্ন দেশে নিজের বাড়িতে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা বাস্তুহারা ও শরণার্থী মিলিয়ে ২৯ লাখ। তবে একই সময়ে ঘরবাড়ি ত্যাগ করা মানুষের তুলনায় এ সংখ্যা নিতান্তই কম।

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যায় এক নম্বরে রয়েছে ইথিওপিয়া। গত বছর সে দেশে প্রায় ৩০ লাখ লোক দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নতুন আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে এ আশ্রয়বদলের ঘটনা ঘটে। কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে একই কারণে বাস্তুচ্যুত হয় ১৮ লাখ মানুষ। গত বছর সিরিয়ায় অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

২০১৮ সালে বিদেশে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করা মানুষের মধ্যে এক নম্বরে রয়েছে ভেনেজুয়েলার নাগরিকেরা। এ সময় ৩ লাখ ৪১ হাজার ৮০০ জন আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে নতুন করে আবেদন করে। তাদের সমস্যাটা অবশ্য ভিন্ন। হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের সংকট ও দুষ্প্রাপ্যতা ভেনেজুয়েলার হাজারো মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করছে।

ভেনেজুয়ালার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। এর মধ্যে ব্রাজিল অন্যতম। একটু দূরে অবস্থিত পেরুতেও কম যাচ্ছে না। আরও যাচ্ছে আমেরিকা আর স্পেনে। ভেনেজুয়েলার উপক‚ল থেকে সাত মাইল দূরের দেশ ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোতে গত বছর সাত হাজারের বেশি ভেনেজুয়েলান আশ্রয় চেয়ে আবেদন করে। সে দেশের দ্বীপগুলোতে এর মধ্যে ৪০ হাজার ভেনেজুয়েলান আশ্রয় নিয়েছে। ভেনেজুয়েলা থেকে এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ লোক অন্য দেশে চলে গেছে।

শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদার দেশ জার্মানি। সেখানে পাঁচ লাখের বেশি সিরীয় শরণার্থী রয়েছে। আফগান শরণার্থী রয়েছে প্রায় দুই লাখ। জর্ডানেও রয়েছে প্রচুর শরণার্থী। প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া থেকে তারা এসেছে। জর্ডানে জনসংখ্যার তুলনায় শরণার্থী একটু বেশিই। সেখান প্রতি ছয়জনে একজন শরণার্থী। জর্ডানে আশ্রয় পাওয়া সিরীয় নাগরিকদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ মানবেতর জীবন যাপন করছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, আগামী দিনগুলোতে বাস্তুহারা ও শরণার্থীর সংখ্যা বাড়বে। এর মূল কারণ যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্থিতিশীলতা লেগে আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও অনেক দেশ এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of