চীনের দিকে আরো ঝুঁকছে নেপাল

একসময় নেপাল ছিল ভারতের অবিচ্ছিন্ন অংশের মতোই। নেপাল ছিল বিশ্বের একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র। তাই ভারতীয়রা নেপালের সঙ্গে আলাদা সম্পর্কও অনুভব করত। কিন্তু সেই নেপাল এখন আর নেই। নেপালে বামপন্থিদের জাগরণ রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে। আর ভারত বারংবার ভুল নীতি গ্রহণের ফলে নেপালের মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়তে চলেছে। কিছু ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, নেপাল নিজেকে ভারতের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন খাতে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে যাতে নেপালকে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে দূরে রাখা যায়।

৫ আগস্ট ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত করা হয়। পাকিস্তান ও চীন ছাড়া বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ভারতের এ পদক্ষেপকে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও ভুটান তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। কিন্তু নেপাল এখন পর্যন্ত এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেনি। খুব বেশি দিন হয়নি, যখন নেপালের কিছু নেতা সার্কে চীনের সদস্যপদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন, যদিও চীন দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ নয়। নেপাল সরকার ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়িটিভের সাথেও যুক্ত হয়েছে, যাতে এর অধীনে রেল ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে চীনের সাথে আরও বেশি করে সংযুক্ত হওয়া যায় এবং ভারতের উপর থেকে নির্ভরতা কমানো যায়।

সম্প্রতি নেপালের ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির একজন শীর্ষ নেতা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সাথে কাঠমাÐুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বলেছিলেন যে, ইন্দো-প্রশান্ত কৌশলের সাথে নেপালের সম্পর্ক নেই, যদিও জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এই কৌশলের সাথে ভারতও যুক্ত আছে। শুধু তাই নয়, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির (এনসিপি) দুই শতাধিক রাজনৈতিক নেতাকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি শি জিনপিংয়ের চিন্তাধারা সম্পর্কে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে, যেটা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।

২০১৯ সালে নেপাল সরকার ভারতীয়সহ সকল কর্মীর জন্য পার্মানেন্ট অ্যাকাউন্ট নাম্বার (পিএএন) থাকাটা বাধ্যতামূলক করেছে, যেটা ভারতীয় কর্মীদের উপর প্রভাব ফেলবে এবং নেপালে যে সব ভারতীয় ব্যবসায়ী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের সাথে জড়িত, তাদের উপরও প্রভাব ফেলবে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পূর্ব নেপালের বিরাটনগরে ভারতীয় দূতাবাসের যে ক্যাম্প অফিস ছিল, সেটাও ২০১৮ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। চলতি বছরের জুলাই মাসে কীটনাশক পরীক্ষার দোহাই দিয়ে ভারত থেকে সবজি ও ফলমুল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে নেপাল। অন্যদিকে ভারতের কোন যানবাহন যেন বছরে ৩০ দিনের বেশি নেপালের ভেতরে থাকতে না পারে, সেজন্য নিয়ম করা হয়েছে। এমনকি বাড়তি ফি দিয়েও যানবাহনগুলো সেখানে থাকতে পারবে না।

গেল অক্টোবর মাসের ১২ ও ১৩ তারিখ নেপাল সফর করে এসেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রায় দুই যুগের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম কোনো চীনা নেতার নেপাল সফর। এতে দুই দেশের নেতারা কানেকটিভিটি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক তৎপরতা, নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করার জন্য ২০টি চুক্তিতে সই করে। চীন ও নেপাল তাদের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও একমত হয়। শি ঘোষণা করেন, তিনি ভূবেষ্ঠিত নেপালকে ভূসংযুক্ত দেশে পরিণত করার স্বপ্নটি বাস্তবায়নে সহায়তা করবেন। চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে, নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বতের সাথে সংযুক্তকারী ৭০ কিলোমিটার রেলওয়ে নির্মাণ পরিকল্পনা, কাঠমান্ডু ও চীনা সীমান্তের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস করার জন্য একটি সড়ক সুড়ঙ্গ নির্মাণ। এছাড়া একটি শিল্প পার্ক উন্নয়ন, চীন-নেপাল সীমান্তজুড়ে রাস্তার উন্নয়ন, পানি সরবরাহ প্রকল্প।

কাঠমান্ডুর কাছে নয়া দিল্লির বিকল্প হলো বেইজিং। নেপাল তার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। আর ভারত মনে করে নেপাল হলো তার ঐতিহ্যবাহী প্রভাব বলয়ের দেশ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেপালের চীনের দিকে হেলে পড়াটা আর গোপন কিছু নয়। ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধান সংশোধনকে কেন্দ্র করে ভারতের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ ও বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর নেপালে চীনের অবস্থান জোরদার হয়। ওই অবরোধের ফলে ভূমিকম্পবিধ্বস্ত নেপালে জ্বালানি, গ্যাস, ওষুধের মারাত্মক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর থেকে নেপাল ক্রমাগত বেইজিং-এর দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of