কলকাতার মিতালী এবং সেন্টিনেল দ্বীপ পর্ব : ২

আন্দামান সাগরের ঝিলিমিলি নীল স্বচ্ছ জল কেটে আমরা ফেনিল বঙ্গোপসাগরের দিকে যাচ্ছি। চারদিকে ঝলমলে রূপোলি আলো ঝিকিমিকি করছে। দূরে ভারতীয় নৌসেনার টহল জাহাজ দেখা যাচ্ছে। ইস! যদি ধরে ফেলে তারা আমাদের! কাক চোখের মত নীলাভ জলরাশিতে হাঙরগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। দুয়েকবার ঢু মারলো আমাদের হাওয়া ভরা প্লাস্টিক বোটে। যদি গুতো দিয়ে ফুটো করতে পারে এ বোট, তবে সাঁতরাতে হবে আমাদের আন্দামান সাগরের এ নীলজলে। স্রোত আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেন্টিনেলের দিকে। কিন্তু আমরা এখনই পৌঁছতে চাইছি না ও দ্বীপে। আমাদের প্লান যখন দ্বীপবাসীরা গভীর ঘুমে থাকবে, তখন অন্ধকার রাতে ঢুকবো আমরা দুজন ও দ্বীপে। কারণ জানা সব তথ্যমতে, ওরা খুবই হিংস্র। কদিন আগেও ‘জন অ্যালেন চাও’ নামের একজন আমেরিকান যাজককে ওরা হত্যা করেছে ওদের এলাকাতে যিশুর বাণী প্রচার করতে গিয়েছিল বলে। আশ্চর্য়ের বিষয় – ঈশ্বর নামের কেউ যদি থেকে থাকেন, তিনি কি ওদের মনে ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা পয়দা করে দিতে পারলেন না! যাতে অত দূর থেকে যাওয়া ধর্ম প্রচারক অ্যালেন চাওকে হত্যার পরিবর্তে ভালবাসে ওরা! কিন্তু হায়! সবই অলিক মিথ্যে হাস্যকর!

:

শুনেছি সেন্টিনেলরা আনুমানিক ২৫০-জন থাকে ওখানে। কম বা বেশীও হতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে সেন্টিনেলীদের জনসংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ধারণা অনুযায়ী, এদের সংখ্যা সর্বনিম্ন ৩৯ থেকে ২৫০-এর মধ্যে এবং সর্বোচ্চ ৫০০ পর্যন্ত। যাদের মাঝে অন্তত ২১ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী ধরা পড়েছে স্যাটেলাইট ক্যামেরায়। কিন্তু বড়ই দুর্ভাগা এ আদিবাসি সম্প্রদায়। এই ২০১৯ সনেও এরা আগুনের ব্যবহার, কৃষিকাজ জানেনা। জামাকাপড় বানাতে বা এর ব্যবহার শিখেনি তারা। স্যাটেলাইন, ড্রোন, সরাসরি সব ক্যামেরার ছবিতেই বস্ত্রহীন এসেছে তাদের নারী পুরুষ শিশু। এমনকি ৭২ বর্গকিলোমিটারের সেন্টিনেল দ্বীপে কলা ছাড়া কোন ফলবান বৃক্ষের ছবিও দেখা যায়নি। পার্শ্ববর্তী দ্বীপের মত কোন নারকেল গাছ নেই সেন্টিনেল দ্বীপে। এ দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনাকালে এসব তথ্যই সংগ্রহ করেছি আমরা দুজনে। সুতরাং আমরা চাইছি অন্ধকার রাত নামুক সেন্টিনেলের আকাশে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হোক এ দ্বীপের আদিম মানুষগুলো। এ সময় নাইট ভিশনে সব প্রত্যক্ষ করবো আমরা অতি গোপনে।

:

সূর্য ডোবা পর্যন্ত সেন্টিনেলের কাছে গেলাম না আমরা। ভারতীয় নৌবাহিনির দৃষ্টি এড়িয়ে দ্বীপের ৩-কিলোমিটারের কাছাকাছি রইলাম আমরা অপেক্ষা করে। আকাশে নক্ষত্র ফুটলে ক্রমে অন্ধকার কেটে এগুতে থাকলাম আমরা শব্দহীন দ্বীপের দিকে। একটা ডুবন্ত কোরাল রিফে আটকালো আমাদের প্লাস্টিক বোট। তা ঠেলে হাঁটুজলে নেমে বোট টানতে থাকলাম সামনে। কতগুলো বড় পাথরের আড়ালে একটা হেলে পড়া বড় বৃক্ষের ডালের মাঝে লুকিয়ে রাখলাম বোটটি। ডাল ভেঙে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখলাম রঙিন বোটটি। যাতে জরুরী অবস্থায় পালাতে হলে বোটটি রেডি থাকে আমাদের জন্যে। পায়ে দৌঁড়ানোর জুতা আর সবুজ শ্যামলা বিশেষ ড্রেস পরলাম আমরা। যাতে প্রয়োজনে ক্যামোফ্লজ নিয়ে দ্বীপে লুকোতে পারি দুজনে। মিতালী দুবার দৌঁড়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কলকাতা স্কুল জীবনে। আমিও কৈশোরে ভাল দৌঁড় আর সাঁতারু ছিলাম। সুতরাং যে কোন বিপদে পালাতে পারবো দুজনে এমন মনোবল আছে আমাদের! নাইট ভিশন চোখে শক্ত করে বাঁধলাম দুজনে। যাতে সহজে তা খুলে না পড়ে। গলায় ঝুলালাম অন্ধকারে পরিস্কার দেখা যায় এমন পি৮৬ শক্তিশালী বাইনোকুলার। এনভিউ শক্তিধর লেন্স লাগানো ক্যামকর্ড রইলো মিতালীর কাছে। ছবি তোলার দায়িত্ব তার। পি৮৬ বাইনোকুলারে চোখ রেখে দূরে তাকালাম সাগরবক্ষে। ভারতীয় নৌবাহিনির জাহাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারত মহাসাগরে। তাতে নক্ষত্রের মত জ্বলছে হাজারো লাইট। আন্দামান দ্বীপের বসতিগুলো পরিস্কার দেখা যায় এ শক্তিধর বাইনোকুলারে। এর ক্লিয়ার রেঞ্জ ৫০০ কিমি হলেও, আন্দামানের মূল ভুখন্ড দুরত্ব মাত্র ৫০-কিমি এর বেশি নয়!

:

মিতালী পা রাখলো প্রথমে সেন্টিনেলের মাটিতে। আমরা দুজন হাত ধরে ক্রমে উঠে গেলাম বালির ডিবিতে। রাত দশটার মত বাজে এখন। এ দ্বীপে কোন শব্দ নেই আলো নেই। মনে হচ্ছে মৃত দ্বীপ। আকাশে চাঁদও নেই। অন্ধকার মরাকটালের রাত খুঁজে নিয়েছি আমরা, যাতে চাঁদের আলোতে দেখতে না পায় সেন্টিনেলরা আমাদের। আচ্ছা দ্বীপটা এতো শব্দহীন কেন? কোন শেয়াল কুকুরো নেই এ ভূখন্ডে! এক হিসেবে ভালই হয়েছে। কুকুর থাকলে ঘেউ ঘেউ করে জাগিয়ে দিতো দ্বীপবাসিদের। তাতে অভিযান ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আমাদের। অনেক পথ হাঁটলাম আমরা দুজনে ঘন্টাখানেক কিন্তু কোন কুঁড়ে বা বসতি চোখে পড়লো না আমাদের। কেবল মানুষের হাঁটার মত পথ পেলাম ঘন জঙ্গলে। বৃক্ষ ছাড়া কোন খোলা যায়গা নেই কি সেন্টিনেলে? চারদিকে চোখ রাখছি আমরা। চোখে লাগানো নাইট ভিউ চশমাতে ষ্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমরা বিশাল বৃক্ষরাজি। অতি সমপর্ণে পা রেখে শব্দহীনভাবে এগুচ্ছি আমরা। হ্যা একটু দূরে সমতল এক ভূমিতে কলাগাছের বন চোখে পড়লো আমাদের। সেদিকে হাঁটতে থাকলাম আমরা। ইয়েস! কলাগাছের পাশের উঁচু সমতল ভূমিতে পরপর অনেকগুলো কুঁড়ে। স্থানীয় লতাগুম্ম বা তালপাতার মত বৃক্ষপত্রে ছাওয়া চাল ভূমি স্পর্শ করেছে। কোন বেড়া নেই ঘরের। দরজাও নেই। কুঁড়েগুলোর একদিক খোলা। ঘরগুলো বেশ পুরনো। অনেকগুলোর চাল ভেঙে পড়েছে মাটিতে।

:

প্রথম কুঁড়েতে প্রবেশ করলাম আমরা দুজনে। ছজন ঘুমিয়ে রয়েছে বৃক্ষপাতার বিছানায়। বালিশ জাতীয় কিছু ব্যবহার করেনি ওরা। কাচা মাটিতে গাছের বড় পাতা বিছিয়ে তার উপর পাতা হয়েছে সজ্জা। শীত নিবারণের জন্য পাটের ছালার ছেড়া চট গায়ে দিয়েছে ওরা। ওদের মধ্যে দুজন বয়স্ক নারী পুরুষ জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। সম্ভবত স্বামী স্ত্রী ওরা। একটু দূরে ২-মেয়ে আর ২-ছেলে ঘুমিয়ে আছে এলোপাথারিভাবে। সম্ভবত এরা ওদের ৪-সন্তান। কারো পরনেই কাপড় নেই। তবে শীত থেকে বাঁচতে গাছের পাতা আর ছালার চট ব্যবহার করছে ওরা। সমুদ্র তার তীরে সব ভাসিয়ে আনে ক্রমে। তাই জলে ভাসমান চট সংগ্রহ করতে পারে ওরা। কুঁড়ের বাইরে তীর ধনুক রাখা দেখলাম। লাল রঙের ভাঙা প্লাস্টিক বালতি, সিংকের ভাঙা অংশে দেখলাম পানি রাখা। সম্ভবত সমু্দ্র উপকুল থেকে এগুলো পেয়েছে এরা কুড়িয়ে। দ্বিতীয় কুঁড়েতে শব্দ শুনলাম আমরা। হ্যা এ কুঁড়েতে দুজন অধিক বয়স্ক নারী পুরুষ। পুরুষটি সম্ভবত অসুস্থ্য। নারীটি তার শরীর ম্যাসেজ করে দিচ্ছে। যন্ত্রণায় কোকড়াচ্ছে পুরুষটি।

:

এখানে দুজন সজাগ বয়স্ক মানুষ থাকাতে দূরের কুঁড়ের দিকে সমর্পণে পা টিপে টিপে হাঁটতে থাকলাম আমরা। একদম শেষ মাথার ঘরটিও একই টাইপের পুরনো। এ ঘরে ৩-জন পেলাম আমরা। ছোট শিশু এ ঘরে সম্ভবত এক বছর বয়সি হতে পারে। মহিলাটিকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে তার ছোট শিশু। পুরুষটি একটু দূরে। তার পুরো শরীরে লাল রং মাখানো। যুবক পুরুষরা কি এখানে লাল রং মেখে থাকে? অন্ধকার রাতে ইশারায় কথা বলছি আমরা দুজনে। মিতালী ভিডিও করছে সব ঘুমন্ত মানুষদের দৃশ্যাবলী। রান্নার কোন উপকরণ পেলাম না কারো ঘরে। প্রায় সকল ঘরের কাছেই নানাবিধ কাঠ, লোহার এঙ্গেল, নৌকার ছেড়া পাল, প্লাস্টিকের নানাবিধ জিনিসপত্র, জলের বোতল দেখতে পেলাম। এমনকি ভারতের কিনলে পানির বোতলও অনেকগুলো খুঁজে পেলাম সেখানে। পচা মাছের গন্ধ নাকে এলো আমাদের। সম্ভবত কাঁচা মাছ খেয়ে তার পরিত্যক্ত অংশ ফেলেছে কোথাও, তারই দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কুঁড়ের ভেতরে পাতা ছাড়া আর কিছু নেই। পাতা আর লতাগুল্মের শুকনো ঘাসের ওমে ঘুমোচ্ছে সবাই। আকস্মিক “দিমুকু, দিমুকু” শব্দ এলো বুড়ো দম্পতির ঘর থেকে। দিমুকু শব্দ করে কান্নার মত আওয়াজ করছে বৃদ্ধা নারী। নীরব অন্ধকার রাতে “দিমুকু” আওয়াজে জেগে উঠলো সকল কুঁড়ের লোকজন। তারা সকলে একযোগে “দিমুকু” আওয়াজ তুলে বের হতে লাগলো। “দিমুকু” মানে কি শত্রু? ওরা কি টের পেয়েছে আমাদের আগমন?

[পরের বাকি অংশ কাল]

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of