সৌদি থেকে ফিরছে নির্যাতিত শ্রমিক, ফিরছে লাশ

দুই বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যায় খুলনার আবিরন বেগম। সম্প্রতি তার গৃহকর্তার বিরুদ্ধে তাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। তিন মাস নানা চেষ্টার পর অবশেষে গত ২৪ অক্টোবর ফেরত আনা গেছে অবিরনের লাশ। এর একদিন পরই সৌদি থেকে এসেছে আরেক গৃহকর্মী মানিকগঞ্জের মেয়ে নাজমা বেগমের লাশ। তার বড় বোন মাকসুদা জানিয়েছেন, ক্লিনিকে কাজ দেওয়ার কথা বলে নাজমাকে গৃহকর্মীর ভিসায় দশ মাস আগে সৌদি আরবে পাঠায় স্থানীয় দালাল সিদ্দিক। সেখানে গৃহকর্তার অমানবিক নির্যাতনের কথা টেলিফোনে বার বার জানিয়েছিল সে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমোতে পাঠিয়েছিল তার শরীরে আঘাতের চিহ্নের ছবি। নির্যাতনে গত ২ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে তার মৃত্যু হয়।

শুধু আবিরন বা নাজমা নন, প্রায় প্রতি মাসেই কোন না কোনো প্রবাসী শ্রমিকের স্বপ্ন এভাবে কফিনে মুড়ে ফিরছে নিজ দেশে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসে গিয়ে শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের পাশাপাশি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় মেটাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় তাদের। এতে তারা প্রচÐ মানসিক চাপে থাকে। ফলে বেশিরভাগ প্রবাসীর মৃত্য হয় স্ট্রোকে, হৃদরোগ আর দুর্ঘটনায়। আর নারীদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয় নির্যাতন অথবা আত্মহত্যায়।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত ১৪ বছরে ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের লাশ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ৬১ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশের মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকে এসেছে ৩১ শতাংশ শ্রমিকের লাশ। হযরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাবে, গেল দশ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৯) ২৯ হাজার ৩৩৮ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে ফিরেছে। সবচেয়ে বেশি লাশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এর মধ্যে সৌদি আরবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গেল বছর হাজারেরও বেশি শ্রমিক দেশটিতে নানাভাবে মারা যায়। দিন দিন এই মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। সুখের আশায় প্রবাসে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা।

এদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ফিরে এসেছেন প্রায় ১৮ হাজার কর্মী। এর আগে ২০১৭ সালে ফিরেছেন ১৬ হাজার ও ২০১৮ সালে ফিরেছেন ২৪ হাজার কর্মী। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে কাজ করা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দেশটি থেকে শূন্য হাতে ফিরে এসেছেন ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, অবৈধ শ্রমিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে সৌদি পুলিশ। গত আড়াই বছরে বিভিন্ন দেশের প্রায় ১০ লাখ কর্মীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

দেশে ফেরা অনেকে জানিয়েছেন, তাদের কাজের বৈধ অনুমোদন (আকামা) থাকা সত্তে¡ও সবজি, খেজুর ও পানি বিক্রিসহ ভিক্ষা করার মতো মিথ্যা অভিযোগ এনে দেশে পাঠানো হচ্ছে। ২৬ অক্টোবর ফেরত আসাদের মধ্যে ছিলেন দুই ভাই নড়াইলের নয়ন ও শুক্কুর মোল্লা। এর মধ্যে নয়ন চার বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন রং মিস্ত্রির কাজ নিয়ে। মাত্র দুই মাস আগে ছোট ভাই শুক্কুর মোল্লাকে একই কাজে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুইজনকে শূন্য হাতে গতকাল দেশে ফিরতে হয়েছে। নয়নের অভিযোগ, ছোট ভাই বাজার করতে বের হলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেন। এ খবর শুনে ছুটে যান তিনি। কিন্তু সে দেশের পুলিশ কোনো কথা শোনেনি। তাদের দুই ভাইকে ধরেই দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

ভোলার ফুয়াদ হোসেন দু বছর আগে ছয় লাখ টাকা খরচ করে ফ্রি ভিসার নামে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তিনি জানান, বৈধ আকামা থাকার পরেও তাকে গ্রেফতার করা হলো তিনি বুঝতে পারছেন না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে কথা বললে তাকে বলা হয়েছে, আপনারা এভাবে আসেন কেন? যেভাবে আসছেন, সেভাবেই সমাধান করেন। মুন্সিগঞ্জের মহিউদ্দিন জানান, গত ১০ বছর ধরে তিনি সৌদি আরবে কাজ করেছেন। আকামাসহ বৈধভাবেই ছিলেন। সম্প্রতি নামাজ পড়তে মসজিদে যাবার পথে সৌদি ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। আকামা থাকার পরও আটকের কারণ জানতে চাইলে তাকে মারধর করা হয় ও দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ফেরত আসা কর্মীরা যেসব বর্ণনা দিচ্ছেন সেগুলো মর্মান্তিক। সাধারণ ফ্রি ভিসার নামে গিয়ে এক নিয়োগকর্তার বদলে আরেক জায়গায় কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লে অনেক লোক ফেরত আসত। কিন্তু এবার অনেকেই বলছেন, তাদের আকামা থাকার পরেও ফেরত পাঠানো হচ্ছে। বিশেষ করে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই অনেককে ফিরতে হচ্ছে যারা খরচের টাকার কিছুই তুলতে পারেননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে দ্রæততার সঙ্গে বিষয়টি আমলে নিতে হবে। সৌদি সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। দেশের ভেতর থেকে যারা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে শ্রমিকদের পাঠাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও জোরদার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তবে নির্যাতিত শ্রমিক ও নারী শ্রমিকের লাশ আসাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এখন বাংলাদেশে একটি ইস্যু হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানোর বিরোধিতা করছেন। এটাকে অনেকে দাবি করছেন যৌনদাসী প্রেরণের মতোই। নারীবাদীরা এর অবসান দেখতে চাইছেন। সমাজবিদরা মনে করছেন, এভাবে সৌদিতে নারী শ্রমিকরা নির্যাতিত হতে থাকলে সরকার যে উন্নয়নের গল্প বলে, তার ওপর মানুষের কোনো আস্থা থাকবে না। উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেশেই এসব নারীর কর্মসংস্থানের পথ সরকারকে সৃষ্টি করতে হবে। এর পাশাপাশি সৌদি আরবে শ্রমিকদের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনায় সোচ্চার হতে হবে এবং তাদের জবাবদিহিতে বাধ্য করতে হবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of