মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা নির্বাচনের প্রভাব

সাম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হল। বহুদিক থেকেই এই নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির অভূতপূর্ব সাফল্যের পর, এই কয়েক মাসে শাসকদলের কর্মকান্ডের মূল্যায়নের নিরিখে এই নির্বাচন ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ওই নির্বাচনে মহারাষ্ট্রের 48 টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি- 23 টি, শিবসেনা- 18 টি, এনসিপি- 4 টি, কংগ্রেস- 1 টি, এমআইএম- 1 টি ও অন্যান্যরা 1 টি আসনে জয়লাভ করে। ভোটের শতাংশের বিচারে দেখা যায় বিজেপি শিবসেনা জোট প্রায়- 51% এর অধিক ভোট পায়। অন্যদিকে হরিয়ানার 10 টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি- 7 টি, কংগ্রেস- 1 টি ও আইএনডিএল- 2 টি আসনে জয়যুক্ত হয়। শতাংশের বিচারে দেখা যায় বিজেপি- 58.02% ও কংগ্রেস 28.10% ভোট পায়।

লোকসভা নির্বাচনে ফলাফলের নিরিখে দেখা যায়, বিধানসভা অনুযায়ী মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্রে মহারাষ্ট্রের মোট 288 টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি- 122 টি, শিবসেনা- 104 টি, কংগ্রেস- 22 টি ও এনসিপি- 23 টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, হরিয়ানার 90 আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি- 79 টি ও কংগ্রেস- 10 টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এই ফলাফল স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপিকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস জোগায়। সেইসঙ্গে মিডিয়ার প্রচার ও কর্পোরেট পুঁজির দৌলতে বিজেপি তাদের জয় নিশ্চিত বলেই ধরে নেয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন একজিট পোলের বেশিরভাগ সমীক্ষায় মহারাষ্ট্রে বিজেপি শিবসেনা জোট 200+ ও হরিয়ানাতে 75+ আসন পাবে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এবার দেখা যাক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কি? 2014 সালের বিধানসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রের 288 টি আসনের মধ্যে বিজেপি 122 টি (27.81%), শিবসেনা 63 টি (19.35%), কংগ্রেস- 42 টি (18.0%), এনসিপি- 41 টি (17.2%), এমএনএস- 1 টি ও অন্যান্যরা- 12 টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক 2019 সালের বিধানসভা নির্বাচনে দেখা যায় বিজেপি- 105 টি (25.75%), শিবসেনা- 56 টি (16.7%), কংগ্রেস- 44 টি (15.9%), এনসিপি- 54 টি (16.7%), এমএনএস- 1 টি (2.3%), সিপিএম- 1 টি, AIMIM- 2 টি ও অন্যান্যরা- 25 টি আসনে জয়লাভ করে (স্বতন্ত্র প্রার্থী 13 জন)।

হরিয়ানার ক্ষেত্রে দেখা যায় 2014 সালে 90 আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি- 47 টি (33.20%), কংগ্রেস- 15 টি (20.58%), আইএনএলডি- 19 টি (24.11%) ও অন্যান্যরা- 7 টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে, 2019 সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়। এই নির্বাচনে বিজেপি- 40 টি (36.49%), কংগ্রেস- 31 টি (28.08%), জেজেপি- 10 টি (15.08%), আইএনডিএল- 1 টি (2.44%), এইচএলপি- 1 টি ও অন্যান্যরা- 7 টি আসনে জয়লাভ করে।

এখন প্রশ্ন হল এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে কি বোঝা যায়? 2014 ও 2019 সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই নির্বাচনে বিজেপি ও শিবসেনা অনেকটাই খারাপ ফল করেছে সেই তুলনায় কংগ্রেস ও এনসিপি অনেক ভালো ফল করেছে। কিন্তু এখানে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এই উত্তর দিলে তা সঠিক হবে না; কারণ এখানে প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব যখন পাঁচ মাস পূর্বের লোকসভা নির্বাচন ও সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের তুল্যমূল্য বিশ্লেষণ হবে। এই নির্বাচনে সুস্পষ্ট মহারাষ্ট্রে বিজেপি ও শিবসেনা জোটের যেখানে 220+ এর অধিক আসনে জয়লাভ করার কথা সেখানে তাঁরা 150+ আসনে আটকে পড়েছে। অন্যদিকে, হরিয়ানায় যেখানে 79 টি আসনে বিজেপির জয়লাভের কথা সেখানে বিজেপি 40 টি আসনে সংকুচিত হয়ে যায়। তাই বিজেপির এই ফলাফলকে বিরোধীরা বিজেপির নৈতিক পরাজয় বলে উল্লেখ করেছেন। এবার প্রশ্ন হল বিজেপি জোটের এই অভূতপূর্ব বিপর্যয়ের কারণ কি?

বিজেপির এই খারাপ ফলাফল বহু দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ কারণ লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সর্বত্র বিজেপির শোচনীয় পরাজয় হয় কিন্তু পুলওয়ামা ঘটনার পর মোদী বালাকোটে এয়ার স্ট্রাইক করে। এই যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, পাকিস্তানের উপর আক্রমণ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী চিন্তা চেতনার ফল হিসাবে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। এখন প্রশ্ন হল এই উগ্র জাতীয়তাবাদের ফলে দেশের আপামর জনসাধারণ কি পেল? তাদের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো জীবনের মৌলিক চাহিদা কতটা পূরণ হল? সেইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরে 370 ধারা হাটিয়ে বিজেপি এক অভূতপূর্ব কাজ করেছে। 370 ধারা হাঁটিয়েছে ভালো কথা কিন্তু দেশের জনসাধারণের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য মোদী সরকার কি করেছে?

অথচ বাস্তব হল গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ক্রমাগত নীচের দিকে নেমে চলেছে। দেশে এখন তীব্র বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে। সেন্টার ফর মনিটারিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই) জানিয়েছে, অক্টোবর মাসে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে 8.5%, যা 2016 সালের আগস্ট মাসের (9.59%) পর সর্বাধিক। চলতি অর্থবছরে প্রথম ত্রৈমাসিকে জিডিপি 6% এর নীচে নেমেছে, যদিও নিন্দুকেরা বলে এই জিডিপি নির্ধারণের পদ্ধতিটি সঠিক নয় তাই প্রকৃত জিডিপি আরও কম। তাহলে বুঝুন দেশের কি অবস্থা?

মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল প্রতি বছরে দুই কোটি চাকরির ব্যবস্থা হবে অথচ বাস্তবতা হল একটি গবেষণা থেকে জানা যায় 2011-12 থেকে 2017-18 এই 6 বছরে নতুন চাকরির সংখ্যা বিশেষ বাড়েনি বরং এই ছয় বছরে দেশে 90 লক্ষ চাকরির সংখ্যা কমেছে! অনেকে মনে করেন পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি ভয়াবহ যেমন- জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক হিমাংশুর দাবি 2011-12 থেকে 2017-18 পর্যন্ত ভারতে প্রতি বছর 26 লক্ষ মানুষ চাকরি খুইয়েছে। এই হচ্ছে মোদীর আমলে ‘আচ্ছে দিন’! নতুন চাকরির কোন ব্যবস্থা নেই বরং প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে। একদিকে চাকরি নেই, তীব্র বেকারত্ব অন্যদিকে গ্যাস, তেল, কেরোসিন প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভর্তুকি মুক্ত যে গ্যাসের দাম ইউপিএ আমলে 350 টাকার কাছাকাছি থাকত, সেই গ্যাসের দাম বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় 950 টাকা।

মোদীর রাজত্বকালে একের পর এক পুঁজিপতি শিল্পপতিদের ঋণ খেলাপির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁরা সেই অর্থ নিয়ে বিদেশে পলায়ন করছে (বিজয় মালিয়া, নীরব মোদী, মেহুলা চকোসি প্রভৃতি)। মোদীর আমলে দেশে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ প্রায় 10 লক্ষ কোটি টাকার অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল ঋণের অর্থের বোঝা সাধারণ মানুষকেই বইতে হবে। এই পরিস্থিতিতে আরবিআই এর উপর চাপ প্রয়োগ করে প্রায় 1.5 লক্ষ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের কাছ থেকে সরকার আদায় করেছে। অন্যদিকে, আবার সরকার দেশের মন্দা কাটিয়ে ওঠার নামে কর্পোরেটদের ট্যাক্সের পরিমাণ বহুঅংশে কমিয়ে দিয়েছে। কর্পোরেট ট্যাক্স 30% থেকে কমিয়ে 22% করা হয়েছে, নতুন উৎপাদন শিল্পের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ 25% থেকে কমিয়ে 15% করা হয়েছে। সারচার্জ ও সেস সমেত কোম্পানি ট্যাক্স 35% থেকে কমিয়ে 25.17% করা হয়েছে।

স্বভাবতই এর ফলে কর্পোরেটদের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছে এরফলে 1.5- 2.15 লক্ষ কোটি টাকা সরকার রাজস্ব হারাতে পারে। অর্থাৎ বকলমে সরকার এই 1.5- 2.15 লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেটদের আত্মস্থ করার সুযোগ করে দিল। সরকার আশাবাদী এরফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্বব্যাপী পুঁজি ভারতে আসবে। এতে দেশের অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে, ফলে সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এভাবে অর্থনীতির চক্র সম্পন্ন হবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কিন্তু সরকারের ভাবনা ও বাস্তবের মধ্যে অনেক তফাত রয়েছে। বিশ্বের ইতিহাস বলে এভাবে পুঁজি একীভূত হয়ে ‘চুঁইয়ে পড়ার তত্ব’ (Trickle down effect) সব সময় কার্যকর হয় না, কারণ এখানে মানুষের ব্যক্তিগত ভাবনা চিন্তা অনেকটাই প্রভাব বিস্তার করে। এখন যদি কোন কর্পোরেট উক্ত সুবিধা নিয়ে বিনিয়োগ না করে সেক্ষেত্রে কি হবে? যদি তাঁরা অন্যদেশে সম্পদ কিনে বা অন্যদেশে বিনিয়োগ করে বা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় তখন কি হবে? উক্ত সম্পদ থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বপ্ন কি পূরণ হবে?

বরং সরকার যদি সমপরিমাণ অর্থ দেশের সরকারি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করত, তা থেকে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হত, চাহিদা বৃদ্ধি পেত, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হত। কিন্তু তা না করে সরকার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে হাঁটতে ব্যস্ত- রেল, বিএসএনএল, এয়ার ইন্ডিয়া, ওনজিসি, সেল, গেল ইত্যাদি সংস্থাগুলিকে বিক্রি করে বেসরকারি পুঁজিপতিদের দেশের সম্পদ অবাধে লুঠ করার সুযোগ প্রদান করছে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়ের মত মানুষ মনে করেন দেশকে অনেক বেশি সামাজিক খাতে খরচ করা উচিত এতে গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং চাহিদার সৃষ্টি হবে, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটবে। অথচ মোদী সরকারের সামগ্রিক নীতি হল সামাজিক খাতে খরচ কম কর ও কর্পোরেটদের সুবিধা দাও এর ফলে গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় না এবং দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে থাকে।

আসলে এই সরকার ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করে না, 1929 সালের ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দা’ (world Economic Great Depression) এর বহুবিধ কারণ যা বর্তমান সময়ের সঙ্গে অনেকটাই প্রাসঙ্গিক; যদিও এটা সত্য আমেরিকার অর্থনীতি এত বড় ছিল যে তার প্রভাব গোটা বিশ্বে অনুভূত হয়েছিল, সেদিক থেকে ভারতীয় অর্থনীতির এই সমস্যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী পড়ার বিশেষ কোন কারণ নেই। তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ‘হারবার্ট ক্লার্ক হুভার’ (1929-33) মনে করেন মার্কিন অর্থনীতির এই সমৃদ্ধি চিরকাল বজায় থাকবে তিনি- “প্রতিটি পাত্রে মুরগি এবং প্রতিটি গ্যারেজে দুটি করে গাড়ির” কথা বলেন।(“president Hoover spoke of ‘a chicken in every pot and two cars in every garage”.)

বলাইবাহুল্য, এই সমৃদ্ধি চিরকাল বজায় থাকেনি। এই সময় বহু ছোট ছোট ব্যাঙ্ক, শিল্প সংস্থা গুলিকে শেষ করে একচেটিয়া বাজার গড়ে ওঠে। গুজব রটে বাজারের তেজী ভাব দ্রুত কমে আসছে এবং এইজন্য সবাই শেয়ার কিনতে তৎপর হয়ে ওঠে। 24 শে অক্টোবর ‘কালো বৃহস্পতিবার’ নামে পরিচিত, ওইদিন 30 মিলিয়ন শেয়ার কেনাবেচা হয় (1 মিলিয়ন= 10 লক্ষ), যদিও বেশিরভাগ মানুষই শেয়ার বিক্রি করতে থাকে। মানুষের মনে হয় ব্যাংকে টাকা রাখার থেকে বাড়িতে টাকা রাখা বেশি নিরাপদ। লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ছোটে ব্যাংক গুলির কাছে এত টাকা না থাকায় ব্যাংকগুলি চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়। 1929-1932 এর মধ্যে 5700 টি ব্যাংক ফেল করে ও 3500 টি ব্যাংক তাদের কাজকর্ম বন্ধ রাখে। শিল্পগুলি ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়, এর ফলে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় এবং শ্রমিকরা বেকার হয়ে যায় এবং বেকারত্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান মোদী সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে কি কিছু মিল পাওয়া যাচ্ছে? প্রতিদিন একের পর এক ব্যাংক দুর্নীতি, অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল করে তোলা, জিএসটি, বিমুদ্রীকরণ, কর্পোরেটদের তোষামোদী ইত্যাদির ফলে প্রতিদিন অর্থনীতির রক্তক্ষয় হচ্ছে। এরফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা ক্রমশ কমছে, শিল্পগুলি উপযুক্ত ঋণ না পেয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দিচ্ছে, বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আমেরিকা এই অবস্থা থেকে রেহাই পায় পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘ফ্রাঙ্কলিন ডিলিনো রুজভেল্ট’ এর (1933- 1945) নেতৃত্বে, তিনি দেশে ‘নতুন ব্যবস্থা’ বা New Deal প্রবর্তন করেন। এতে সরকার ব্যাংকের গ্যারান্টি নিয়েছিল যাতে মানুষ নির্ভয়ে টাকা রাখতে পারে। শেয়ার বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ এনেছিল, কৃষকদের বিপুল ঋণ প্রদান, ‘সিভিলিয়ান কনজারভেশন কর্পস’ গঠন করে লক্ষ লক্ষ বেকারদের নির্মাণ কাজে যুক্ত করে চাকরি প্রদান, আট ঘন্টার অধিক কাজ নিষিদ্ধ করেন এবং নূন্যতম মজুরির হার নির্ধারণ করেন, এরফলে অতিরিক্ত বহু কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এভাবে রুজভেল্টের প্রচেষ্টায় আমেরিকা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার করালগ্রাস থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত হয়। যদিও অনেকে মনে করেন এই মহামন্দার কারণেই হিটলার ও মুসোলিনীর মতো একনায়কের পক্ষে ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। তাঁদের অনেকেই মনে করেন প্রকৃতপক্ষে মন্দা শেষ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের মধ্যে দিয়েই। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে উৎপাদিত দ্রব্যের দাম কিছুটা কমিয়ে, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করে ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সরকার অনায়াসেই এই মন্দা আটকাতে পারত কিন্তু কর্পোরেট বন্ধু সরকার সেদিকে বিশেষ কর্ণপাত করেনি। যার ফল মানব সভ্যতাকে মহামন্দা ও বিশ্বযুদ্ধ রূপে ভোগ করতে হয়!

অথচ দুঃখের বিষয় ভারতের মোদী সরকার ইতিহাস থেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে শুধু পুঁজিপতিদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতেই ব্যস্ত। তাই প্রকৃতপক্ষে দেশের যুবদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এই যুব সমাজকে কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিয়ে রাম মন্দির- বাবরি মসজিদ, হিন্দু মুসলমান, ধারা 370, এনআরসি ইত্যাদিতে বুঁদ করে রাখা হচ্ছে, এর ফলে যুবসমাজের চিন্তাশক্তি লোপ পাচ্ছে। এই ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি সাধারণ যুবকদের দাঙ্গাকারিতে পরিণত করছে! একদিকে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, শোষণের পরিমাণ বৃদ্ধি, অন্যদিকে অমেরুদণ্ডী সাংবাদিককুল ও বুদ্ধিজীবীরা শাসকদলের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে।

ঠিক এই আবহে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার এই নির্বাচন অতি প্রাসঙ্গিক। অর্থনৈতিক প্রশ্নে মোদী সরকার সর্বদা ইউপিএ সরকারকে দোষরোপ করলে ও মনমোহন সিং এর সময় যখন তেলের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি 145 ডলার তখনও ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটের উপর ভালো ছিল। 2008 সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যায় তবুও এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভারতের জিডিপি 8-10% বৃদ্ধি পেয়েছিল। ওই সময় বিশ্বের অর্থনীতি এই মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য ভারতের উপর বহু অংশে নির্ভরশীল ছিল। অন্যদিকে বর্তমানে মোদী সরকারের আমলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় 50 ডলার প্রতি ব্যারেলের কাছাকাছি এই অবস্থাতেও দেশ তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঝুঁকছে, প্রতিদিনই ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম ক্রমশ কমছে। ইহাই মোদীর আচ্ছে দিনের নমুনা? এথেকেই বোঝা যায় মোদী মুখে হ্যান কারেঙ্গা ত্যান কারেঙ্গা বললে ও কাজের বেলায় ফলাফল বিশেষ কিছু দেখা যায় না। অপ্রিয় সত্যটি হল- মোদী বাকপটু হলেও ও কর্মপটু নয়!

তাই সরকারের মূল লক্ষ্য হল নিজের ব্যার্থতা স্বীকার না করা এবং কোন বিরোধী কন্ঠস্বর উঠলে তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার কঠোরভাবে বিরোধী দলগুলিকে দমন করার চেষ্টা করছে। এই সরকার বিরোধী দলের নেতাদের বিভিন্ন ভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে এবং সেইসঙ্গে বিরোধী শূন্য রাজনীতি করার উদগ্র বাসনা যা গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর! বিভিন্ন স্বাধীন সংস্থা আরটিআই, ইডি, সিবিআই, আরবিআই, সুপ্রিম কোর্ট, ইলেকশন কমিশন এদের ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার চেষ্টা চলছে যা গণতন্ত্রের সুস্থিতির পক্ষে অতীব বিপজ্জনক! বিরোধীরা একে অঘোষিত জরুরি অবস্থা বলে উল্লেখ করছে।

মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচনে একদিকে ছিল মোদী শাহর শক্তিশালী জুটি, অন্যদিকে দুর্বল বিরোধী প্রতিপক্ষ, পুঁজিপতিদের সহযোগিতা, মিডিয়ার বিপুল সমর্থন, বিজেপির বিরাট প্রচার, এনআরসি, হিন্দুত্ব, ধারা 370 সমস্ত কিছুই বিজেপির পক্ষে অনুকূল ছিল ছিল। কিন্তু এই বিজেপিই আবার দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় নিয়ে একটি ও কথা বলেনি। বিরোধীরা যদি প্রশ্ন করে দেশের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ কেন? বিজেপির জবাব 370 ধারা বিলুপ্ত। কেন এত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে? 370। কেন দেশের সামাজিক প্রকল্প গুলি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে? 370। প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহী আখ্যা দেওয়া ও এখন নতুন ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ বিজেপি কার্যত মানুষের জীবন যন্ত্রণাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি তাঁরা কর্পোরেট সর্বস্ব মিডিয়া, উগ্রজাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্বের উপর নির্ভর ছিল। তাঁরা মনে করে উগ্রজাতীয়তাবাদ ও উগ্র হিন্দুত্ব দিয়ে মানুষকে মূর্খ বানিয়ে রেখে একের পর এক নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব। তাই কার্যত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণার কথা বিজেপির কাছে বিশেষ কোন গুরুত্ব নেই, তাদের ধ্যান জ্ঞান সমস্ত কিছুই কর্পোরেট পুঁজি ও উগ্র হিন্দুত্ববাদের উপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে দুর্বল সংগঠন নিয়েও কংগ্রেস মানুষের সমস্যা কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তাই নির্বাচনে যেখানে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে নির্বাচনের ময়দানে নামতেই দেখা যায় নি সেখানে কংগ্রেসের এই অভূতপূর্ব সাফল্য বহু বার্তা প্রেরণ করে। এ থেকে একটা বিষয় নিশ্চিত এবারের নির্বাচন ছিল বিজেপি বনাম মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার জনসাধারণের নির্বাচন এবং জনগণ বিজেপিকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে একথা বুঝিয়ে দিয়েছে একই জনগণকে চিরকাল বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। জনগণ ঠিকই তাঁর অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে এবং এটি সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে খুবই জরুরি। এই নির্বাচনে একটি বার্তা স্পষ্ট মানুষ এবার প্রশ্ন করতে শিখছে। এই ফলাফল থেকে একথা নিশ্চিত কংগ্রেস যদি ভালো করে এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত, তাহলে হয়তো ফল আরও অনেক ভালো হতো। হয়তো কিছু রাজ্যে জিততে ও পারত।

তবে এই নির্বাচনের ফলাফল থেকে একথা নিশ্চিত আগামী দিনের বিধানসভা নির্বাচনগুলি বিজেপি পক্ষে খুব একটা সুখকর না ও হতে পারে। দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ সমেত দেশের যেখানেই শক্তিশালী কংগ্রেস বা বিরোধী নেতা উপস্থিত থাকবে সেখানেই বিজেপিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। এই নির্বাচনে স্পষ্ট জনগণ ধীরে ধীরে সচেতন হচ্ছে। এই নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক নির্বাচনে ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। একদিকে মানুষ মমতা ব্যানার্জির কুশাসনে জর্জরিত, অন্যদিকে বিজেপির বিভাজনের রাজনীতি বহু মানুষের পচ্ছন্দ নয়, অন্যদিকে বাম- কংগ্রেস শক্তি যদি আন্দোলনের মাধ্যমে লড়াইয়ের ময়দানে আসতে পারে তাহলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে প্রবাহিত হবে তা বলা বেশ মুসকিল। অবশেষে এটা উল্লেখ করতেই হবে এই নির্বাচন বিরোধীদের অবস্থান অনেকটাই মজবুত করল যা সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন। এই নির্বাচনের ফলাফল দেশকে একদলীয় কুশাসন ও একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কুফল থেকে কিছুটা রক্ষা করল। তাই প্রকৃতপক্ষে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার জনগণকে, ভারতের জনসাধারণকে ও সংসদীয় গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা জানায় কারণ তাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই মহান কার্যে অংশগ্রহণ করেছিল!

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এই সময়।
3. আনন্দবাজার পত্রিকা।
4. গণশক্তি।
5. আধুনিক ভারত ও বিশ্ব- জীবন মুখোপাধ্যায়।
6. The hindu.
https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/two-elections-and-a-dent-to-a-jingoist-edifice/article29789964.ece

https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/do-voters-differentiate-between-state-and-national-polls/article29846024.ece

7. Economic Times.

https://www.google.co.in/amp/s/m.economictimes.com/news/economy/policy/corporate-tax-cut-issue-of-carrying-forward-losses-vexes-companies-in-red/amp_articleshow/71321427.cms?espv=1

8. First post.

https://www.firstpost.com/assembly-elections-2019

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of