চীনের বিরুদ্ধে ‘তিব্বত কার্ড’ খেলতে পারে ভারত

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের ওপর চীন চাপ বাড়িয়েই চলেছে। লাদাখকে নিজেদের এলাকা দাবি করে, এ বিষয়ে ভারতের একক সিদ্ধান্তগ্রহণের বিরুদ্ধে সওয়াল করছে বিশ্বের দ্বিতীয় অথ্যনৈতিক শক্তি বনে যাওয়া দেশটি। তবে ভারতও বিষয়টি ছেড়ে দিতে রাজি নয়। চীনের এমন আচরণে তারা ক্ষুব্ধ। বিশ্লেষকরা তাই আশঙ্কা করছেন, চীন যেমন কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে উত্যক্ত করছে, ভারতও তেমনি তিব্বত ইস্যু ব্যবহার করে চীনকে চাপে ফেলতে পারে। সে রকম কিছু নজির ইতিমধ্যে দৃশ্যমান।

ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) এবং ভারত শাসনকারী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জময ভাইয়ের মতো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপির বেশির ভাগ রাজনীতিবিদই আরএসএস থেকে এসেছেন। এই আরএসএস-এর ম্যাগাজিন অর্গানাইজারে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে ‘স্বাধীন তিব্বত ভারতের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থার সৃষ্টি করবে’। যার অর্থ হলো, সঙ্ঘ পরিবার চাইছে বিজেপি তিব্বত ইস্যুকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করুক।

তিব্বতের প্রবাসী সরকার ও দালাই লামাকে বসবাসের সুযোগ দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মতো একটি কার্ড আছে ভারতের হাতে। কিন্তু ভারত এটি কঠোরভাবে ব্যবহার করেনি। ১৯৫০-এর দশক থেকে তিব্বতে বেইজিংয়ের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছে। মোদির আমলেও তা পরিবর্তিত হয়নি। ২০১৪ সালে মোদি সরকারের শপথ গ্রহণের সময় তিব্বতের প্রবাসী সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ২০১৯ সালে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তার পুনরাবৃত্তি হয়নি।

গত পাঁচ বছরে মোদি চীনের সাথে প্রত্যক্ষ সংঘাতে না গিয়ে কঠোরতর ও নরমতর দৃষ্টিভঙ্গির মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেছে। দোকলামে মুখোমুখি হওয়াটা ছিল ব্যতিক্রম। বেইজিংয়ের মোকাবিলায় নয়া দিল্লি আরো কিছু চাইলে করতে পারত, কিন্তু অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী প্রতিদ্ব›দ্বীকে ক্ষ্যাপাতে চায়নি। ২০১৮ সালের কয়েকটি ঘটনায় দেখা যায়, প্রবাসী তিব্বতি সরকার থেকে নয়া দিল্লি নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। অনেকেই মনে করেন, ইতিহাস ও নৈতিকতা তিব্বতের পক্ষেই আছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি নয়। ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে আছে। তাই ভারত সরকারও হিসেব নিকেশ করেই এই ইস্যুতে চুপ করে আছে।

কিন্তু তিব্বত ও চীনের ব্যাপারে কঠোর নীতি গ্রহণের ব্যাপারে আরএসএস-এর ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। আজকের আরএসএস-এর এই আগ্রহ এসেছে উত্তরাধিকার সূত্রেই। ১৯৬০ সালে আরএসএস-এর হিন্দি মুখপত্র পঞ্চজনা’র এক শিরোনামে বলা হয়, তিব্বতের স্বাধীনতায় ভারতের নৈতিক দায়দায়িত্ব রয়েছে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের তীব্র আবেগময় অবস্থায় আরএসএস নেতা এম এস গোলয়াকার সাহসে ভর করে ঘোষণা করেছিলেন যে, দালাইলামাকে তিব্বতের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে দাও। তাকে তার দেশকে স্বাধীন করার সংগ্রামে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সমর্থন দাও।

১৯৯৯ সালে আরএসএস শুরু করে ভারত-তিব্বত সহযোগ মঞ্চ। তবে স্বীকার করতেই হবে, এই সংগঠনটি অস্পষ্টই থেকে যায়। ২০১০ সালে আরএসএস-এর আরেকটি মুখপত্র অর্গানাইজার তিব্বতের পক্ষে এমনকি সামান্য আঙুল না তোলার জন্য দিল্লির তীব্র নিন্দা করে। ২০১৭ সালে আরএসএস দালাই লামাকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ভারতরত্ন প্রদানের প্রচারণা শুরু করে।

ধারণা করা হয় আরএসএস-এর এই সক্রিয়তা দুই দিক থেকে কাজ করে। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দৃশ্যমানভাবেই আরএসএস-এর সাথে যোগাযোগ করেন। সংগঠনটিতে ঘন ঘন তার উপস্থিতি দেখা যায়। দালাই লামা ও তিব্বতিরা বৈদেশিক কারণের জন্যই নয়, আদর্শগত কারণেও আরএসএস-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি বৌদ্ধধর্ম দক্ষিণ এশিয়ার ধর্ম। এশিয়ার বিভিন্ন মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ার আগে এটি ছিল ভারতীয় সভ্যতার অংশ। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা একে হিন্দু ধর্মেরই একটি রূপ হিসেবে উপস্থাপন করে। অধিকন্তু, অন্যান্য ধর্মকে ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু সংস্কৃতি প্রভাবিত করেছে, তার প্রমাণ হলো বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার। ফলে বৌদ্ধদের টিকিয়ে রাখা প্রাচীন ভারতের গৌরব গাঁথার জন্য আরএসএসের ভিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঐতিহাসিক কানেকশনের ওপর অনেক সময়ই আরএসএস চাপ সৃষ্টি করেছে। আবার অনেক সময় বিপরীতটিও হয়েছে। ২০১৪ সালে দালাই লামা ও আরএসএস নেতারা ওয়ার্ল্ড হিন্দু কংগ্রেসে (দিল্লিতে অনুষ্ঠিত) যোগ দেন। ওই অনুষ্ঠানে তিব্বতি আধ্যাত্মিক নেতা বলেন, প্রাচীন ভারত ছিল আমাদের গুরু। তিনি আরো বলেন, আধুনিক ভারত অনেক বেশি আধুনিকায়ন করা। এমন বক্তব্য আরএসএসের কাছে মধুর মতো মনে হয়।

কিন্তু এত কিছু সত্তে¡ও আরএসএস পরিবার যমজ ভাই বিজেপিকে এই ইস্যুতে সক্রিয় করতে পারছে না। বি এস কোশিইয়ারির মতো স্বল্প পরিচিত গুটিকয়েক বিজেপি রাজনীতিবিদ ‘তিব্বতের স্বাধীনতার’ কথা বলেন। তবে বিজেপি সরকার প্রধানত তিব্বত কার্ডটি আড়াল করেই রাখছে। এমনকি দোকলাম ইস্যুতে উত্তেজনার পারদ সপ্তম চড়লেও তখনো তারা সেদিকে হেলেনি। মূলত ভারতে চীনের বিনিয়োগ এবং চীনের বাজারে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নানা পণ্যের বিস্তারের কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্য থেকেই মোদি সরকার তিব্বত প্রশ্নে চুপচাপ থাকছে। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে চীন যদি একই গতিতে এগোতে থাকে, তাহলে মোদি সরকার এ প্রশ্নে কিছু খেল দেখানোর চেষ্টা অবশ্যই করবে।

ভারতের ক‚টনীতি বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিজেপির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিজেপি দেশের ভেতরে বেকায়দায় পড়লে আরএসএস তখন এটিকে বিজেপিকে সহায়তার হাতিয়ার করে তুলতে পারে। ভারত-চীন উত্তেজনা যদি বর্তমান পর্যায়ের চেয়ে বেড়ে যায়, সেক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত সুবিধাজনক পথই ধরবে। প্রবাসী তিব্বত সরকার এবং ভারতে আশ্রিত তিব্বতীদের গোপন মদদ জোগানোটা অব্যাহত রাখবে তারা। খুব উস্কানিমূলক পথে তারা এ মুহূর্তে যাবে না। তবে ভেতরে ভেতরে আয়োজন চলছে, তিব্বতের জন্য স্ট্যাপল ভিসার ব্যবস্থা করবে ভারত। প্রবাসী তিব্বতি সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দ্ব্যর্থবোধক ভাষা প্রয়োগ করা হতে পারে। এতে চীন-ভারত উত্তেজনা বেড়ে যেতে পারে, তবে সেইসঙ্গে ভারতের দর কষাকষির ক্ষমতাও কিছুটা বাড়বে বলে মনে করে সে দেশের বিদেশ নীতি বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of