দমছে না চীনা জায়ান্ট হুয়াওয়ে

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ সহসাই বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধের প্রথম শিকার চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে। বড় আঘাত সইতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। তবে দমে যায়নি চীনের প্রতিষ্ঠানটি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের যন্ত্রাংশ ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনার নীতি বাস্তবায়ন করার পথে হাঁটছে তারা। মার্কিন সরঞ্জাম ছাড়াই পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ফাইভজির বেজ স্টেশন উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে তারা। আগামী মাস থেকে এ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে।

বিশ্বজুড়ে ফাইভজির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরুর কার্যক্রম চলছে। এরই মধ্যে বেশকিছু অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে ফাইভজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। আগামী বছর বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দ্রুতগতির ফাইভজি নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। যে কারণে আগামী বছর ফাইভজি বেজ স্টেশন উৎপাদনও দ্বিগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে হুয়াওয়ে।

হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেন ঝেংফেই জানান, তারা মার্কিন সরঞ্জাম ছাড়াই ব্যাপক পরিসরে ফাইভজি বেজ স্টেশন উৎপাদনে যাচ্ছেন। আগামী মাসের যেকোনো সময় এ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। গত আগস্ট থেকে শুরু করে চলতি মাস পুরোটাই আমরা পরীক্ষামূলক উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়েছি এবং অক্টোবরে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাব। আমরা প্রাথমিকভাবে মার্কিন সরঞ্জাম ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার ফাইভজি বেজ স্টেশন উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছি। চলতি বছর মার্কিন সরঞ্জামসহ এবং মার্কিন সরঞ্জাম ছাড়াই মিলে ফাইভজি বেজ স্টেশন উৎপাদন ছয় লাখ ইউনিটে পৌঁছবে। তবে আগামী বছর ফাইভজি বেজ স্টেশন উৎপাদন বার্ষিক ১৫ লাখ ইউনিট ছাড়াবে।

এদিকে ফাইভ জি সেবা উন্নয়নের জন্য রাশিয়ান টেলিকম কোম্পানির সঙ্গেও চুক্তি করেছে হুয়াওয়ে। এই চুক্তির আওতায় আগামী বছর থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ফাইভজি সেবা উন্নয়নে কাজ করে যাবে প্রতিষ্ঠান দুটি। ২০২৪ সালের মধ্যে সব প্রধান শহরে ফাইভজি চালু করতে চায় রাশিয়া। এরই অংশ হিসেবে মস্কোতে পরীক্ষামূলক ফাইভজি জোন চালু করেছে টেলিকম প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। ফাইভজি প্রযুক্তির উন্নয়ন ও পরিষেবাকে সমৃদ্ধ করার এ পাইলট প্রকল্প চলবে ২০২০ সাল পর্যন্ত। গুগল থেকে হুয়াওয়ে যে সকল পরিষেবা পাবে না বা বঞ্চিত হবে মূলত সেগুলো নিয়ে কাজ করবে রাশিয়ান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমটিএস।

হুয়াওয়ে বলছে, তাদের উদ্যোগেই ফাইভজি এখন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী ২০টি দেশের ৩৫টি ক্যারিয়ার ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক সেবা চালু করেছে। আর ৩৩টি দেশ ফাইভজি স্পেক্ট্রাম (তরঙ্গ) ডিস্ট্রিবিউট করেছে। হুয়াওয়ের করপোরেট স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রেসিডেন্ট উইল ঝ্যাং বলেন, মার্কিন সরঞ্জাম ছাড়াই উৎপাদিত ফাইভজি বেজ স্টেশন মান এবং কার্যকারিতার দিক থেকে কোনোভাবেই খারাপ হুওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমাদের গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের চমক আসতে যাচ্ছে। যদিও বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।

বিশ্বের বৃহৎ টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম এবং দ্বিতীয় বৃহৎ স্মার্টফোন নির্মাতা হুয়াওয়ে। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ। একই সঙ্গে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। যে কারণে হুয়াওয়ের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম এবং ডিভাইস ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি নিজেদের পণ্য উন্নয়নের জন্য মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর কাছ থেকে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও সেমিকন্ডাক্টর সরঞ্জাম ক্রয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সম্প্রতি মেট সিরিজের নতুন দুই ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন উন্মোচন করেছে হুয়াওয়ে। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার জেরে মেট ৩০ ও মেট ৩০ প্রো নামের দুই ডিভাইসে ইউটিউব, গুগল ম্যাপস, ক্রোম ও জিমেইলের মতো গুগলের জনপ্রিয় অ্যাপগুলো রাখা হয়নি। এমনকি ডিভাইস দুটিতে গুগল প্লে স্টোর সেবাও রাখা হয়নি। প্লে স্টোরের পরিবর্তে হুয়াওয়ের নিজস্ব স্টোর ‘হুয়াওয়ে অ্যাপ গ্যালারি’ রাখা হয়েছে। গুগল অ্যাপ ছাড়াই অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের ওপেন সোর্স সংস্করণচালিত ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন এনে হুয়াওয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ভবিষ্যতে তারা গুগল কিংবা মার্কিন অন্য অংশীদারদের সরঞ্জাম ছাড়াই নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম এবং ডিভাইস ব্যবসা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সক্ষম।

তবে গুগলের প্লে স্টোরের বাইরে গিয়ে নিজেদের কাঠামো গড়ে তোলাটা বড় চ্যালেঞ্জের। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত নতুন অ্যাপ বাজারে নিয়ে আসা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সার নিজেদের উদ্যোগে অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ বানাচ্ছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজেদের অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ বানাচ্ছে। এগুলো গুগলে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ফ্রিল্যান্স ডেভেলপাররা ও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বেচ্ছায় হুয়াওয়ের জন্য একটি ভার্সন তৈরি না করে, তাহলে এগুলোর নিজস্ব সংস্করণও বাজারে আনতে হবে হুয়াওয়েকে। এ কাজটি ধারাবাহিকভাবে করে যাওয়া খুবই কঠিন।

হুয়াওয়ের ভরসা হচ্ছে তারা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১৭০টির বেশি দেশ ও অঞ্চলে সেবা দিচ্ছে হুয়াওয়ে; যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের সমান। তাদের কর্মীসংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার। ২০১৮ সালে তাদের রাজস্ব ছিল ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নিক্কেই বিজনেস ডেইলির এক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ৬ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের যন্ত্রাংশ কেনে হুয়াওয়ে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের যন্ত্রাংশ কেনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ফলে তাদের বাতিল করার চাপটি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবেও নিতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই নেটওয়ার্ক পরিষেবা দিচ্ছে হুয়াওয়ে। বাংলাদেশে বর্তমানে চালু ফোরজি নেটওয়ার্ক সিংহভাগই হুয়াওয়ে সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু মিত্রদেশগুলোকে ফাইভজি নেটওয়ার্কে হুয়াওয়েকে না রাখতে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোয় হুয়াওয়ের ডিভাইস কেনা নিষিদ্ধ। এর মধ্যেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে হুয়াওয়ে। চীন সরকার যেখানেই বিনিয়োগ করছে, যেখানেই তারা সুবিধাজনক জায়গায় যাচ্ছে, সেখানেই তারা হুয়াওয়ের প্রযুক্তি বিক্রির সুবিধা আদায় করার চেষ্টায় আছে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of