পাকিস্তানে ব্লাসফেমি চর্চা কমছে না

পাকিস্তানে একজন হিন্দু অধ্যক্ষের ধর্মাবমাননা অর্থাৎ ব্লাসফেমির অভিযোগে গত সেপ্টেম্বর মাসেও একটি বিদ্যালয় ও মন্দিরে সহিংসতা চালানো হয়েছে। ওই ঘটনায় মুসলিম প্রধান এই দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয় বলে স্থানীয় পুলিশ জানায়। দেশটির দক্ষিণ প্রদেশের সিন্ধু প্রদেশে মহানবীকে (সা.) নিয়ে একজন হিন্দু অধ্যক্ষ অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ তুললে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জেলা পুলিশ প্রধান ফররুখ আলী রয়টার্সকে বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতা একটি স্কুলে ভাংচুর করে এবং একটি মন্দিরে হামলা চালায়। এরপর অধ্যক্ষকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ উভয় ঘটনারই তদন্ত শুরু করেছে। তাদের প্রাথমিক ধারণায় মনে হচ্ছে অধ্যক্ষ ইচ্ছা করে কিছু করেননি।

পাকিস্তানের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে দ্রæত পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে। এই টুইটে কমিশন এই ঘটনাকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বর্বর হিংস্রতা এবং একে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। পাকিস্তানের ২০৮ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে বেশিরভাগ সুন্নি মসুলমান, সেখানে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ হিন্দু স¤প্রদায়ের। তবে বøাসফেমির শিকার হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীর চেয়ে উদারমনা মুসলিমরাই বেশি।

ব্লাসফেমি শব্দের অর্থ- ‘ধর্ম নিন্দা’ বা ‘ঈশ্বর নিন্দা’। গ্রিক শব্দ ‘ব্লাসফেমেন’ থেকে শব্দটি এসেছে। এর অর্থ কারও ওপর অপবাদ বা কলঙ্ক আরোপ করা বা সম্মানে আঘাত করা। ইসলাম ধর্মের নবী হযরত মুহাম্মদকে (সা.) অপমান করলে ৯৫ শতাংশ মুসলমানের দেশ পাকিস্তানে বাধ্যতামূলকভাবে মুত্যুর সাজা দেয়ার বিধান রয়েছে। তাই বলা হয় বর্তমানে কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পাকিস্তানেই সবচেয়ে ভয়াবহ কঠোর ব্লাসফেমি আইন কার্যকর রয়েছে। আইনের এমন ধারাই সেখানে কারো বিরুদ্ধে ধর্মাবমাননার অভিযোগ ওঠা মাত্রই জনতা কর্তৃক তার ওপর হামলা চালানোর মতো পরিবেশ তৈরি করেছে।

ধর্মবেত্তারা মনে করেন, ইসলামে ব্লাসফেমির বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার বিষয়। আদিকাল থেকেই সৃষ্টিকর্তা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে নবী-পয়গম্বর পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাদের সবার ক্ষেত্রেই সমসাময়িক যুগের মানুষ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছে। এমনকি গালমন্দ বা হামলাও করেছে। স‌্বয়ং নবীজী হামলার শিকার হয়েছিলেন এবং তার দন্ত মোবারক শহীদ হয়েছিল। কিন্তু এরকম সব ঘটনার জন্য নবীরা কাউকে দন্ড দিয়েছেন জানা যায় না। বরং ভালোবাসা দিয়ে তাদের জয় করেছেন, অনুসারীদেরও সেই নির্দেশই দিয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৮৬ সালে দুটি বিশেষ ধারা যোগের পর থেকে পাকিস্তানে এই আইনটির ব্যবহার বাড়তে থাকে। এরপর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ বিষয়ে মামলা হয়েছে মোট এক হাজার ২৭৪টি। বেশির ভাগ মামলার শিকার হয়েছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। তবে মুসলমানরাও বাদ পড়েনি। এসব মামলায় নিম্ন আদালতে কয়েকজনের মৃত্যুদন্ডের রায় হয়েছে। উচ্চ আদালতে আপিল করার ফলে কোনো মৃত্যুদন্ড এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই খুন হয়েছেন ৪৬ জন আসামি। এর মধ্যে পাঁচজন মৌলভী ও পেশ ইমামও আছেন। বাদ পড়েননি শ্রমিক, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীরাও।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতেও খুন হয়েছেন ব্লাসফেমি মামলার অনেক আসামি। কারাগারে বন্দী অবস্থায় মারা গেছেন চারজন আসামি, আত্মহত্যা করেছেন একজন। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) এর দুরুদের ভেতর একটা নোক্তা (.) দিয়ে অর্থ বিকৃত করে ফেলায় ফারায়েল ভাট্টির বিচার হয়েছিল ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো সকলের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরও বারো বছর বয়সী এই শিশুটিকে রেহাই দেয়নি সমাজ। এমনকি অনেক নামকরা ইসলামি চিন্তাবিদের সুপারিশ সত্ত্বেও সপরিবারে এলাকা ছাড়তে হয়েছে তাকে।

১৪ বছর বয়সী রিমশা মশিহকে ইসলামাবাদের শহরতলীতে স্থানীয় মসজিদের এক ইমাম কোরান পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে অভিযুক্ত করলে স্থানীয় লোকজন তাকে হত্যার জন্য উদ্যত হয়। সে অবস্থায় পুলিশ তাকে আটক করে বøাসফেমি আইনের আওতায়। রিমশা মশিহ শিশু এবং মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ তার বিরুদ্ধে  ব্লাসফেমির মামলাই এনেছিল।

পরে সৌভাগ্যবশত মসজিদের একজন মুসল্লিসহ তিন জন প্রত্যক্ষদর্শী জানান যে পুরোটাই ছিল ইমামের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সে স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উস্কানির জন্য জেনেশুনেই এই শিশুর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। এখন ইমাম খালেদ চিশতী নিজে একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে। আদালত রিমশাকে জামিন দিয়েছে। কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে বাচ্চা মেয়েটি বাড়ি ফিরতে পারেনি। সেনাবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টারে করে তাকে নিয়ে যেতে হয়েছে নিরাপদ অবস্থানে।

১৯৯৭ সালে লাহোরে আরিফ ইকবাল হোসেন ভাট্টি নামের একজন বিচারক বøাসফেমির অভিযোগ থেকে দুজনকে খালাস দেয়ার পর তার অফিস কক্ষে নিহত হন। বøাসফেমি আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং বøাসফেমি মামলার আসামিকে সহযোগিতা করার জন্য হত্যার শিকার হয়েছেন পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসির ও সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টি।

কিছুকাল আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেত্রী, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য শেরি রেহমান সংসদে বøাসফেমি আইন সংশোধন করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধেও বøাসফেমি আইনে মামলা করা হয়েছে। তাকে হত্যারও হুমকি দেয় ধর্মীয় উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলো। পরে সরকার তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে বাঁচিয়েছে।

গত জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় ব্লাসফেমির দায়ে মৃত্যুদন্ডে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে কয়েক বছর জেলে কাটানো এক খ্রিস্টান নারীর খালাসের আদেশ বহাল রেখেছে। কাশ্মীরে জঙ্গি হামলার পরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে হিন্দুদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় গত মার্চে পাকিস্তানের এক প্রাদেশিক মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of