সাগর-রুনি হত্যার বিচার হবে না?

সম্প্রতি ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পর থেকে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলোর বিচারের দাবি আবারো জোরালো হয়েছে। এর মধ্যে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন নাহার রুনি হত্যা মামলার বিচারের দাবি অন্যতম। সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিচার কি হবে না? এ প্রশ্ন আজ খুব সঙ্গতভাবেই দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ৬৮ বার পেছানো হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়। মামলার তদন্ত সংস্থা র‌্যাব প্রতিবেদন দাখিল না করায় পিছিয়ে যাচ্ছে বিচার কাজ। সর্বশেষ ১ অক্টোবর ২০১৯ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও র‌্যাব তা দিতে পারেনি। আগামী ১৪ নভেম্বর ফের দিন ধার্য করেছে আদালত। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, আদালত কেন এভাবে বারবার সময় বাড়াচ্ছে? কেন বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে না!

২০১২ সালের ১০ ফেব্রæয়ারি রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙার বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি দম্পতি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সাড়ে সাত বছরের বেশি সময় পার হতে চললেও এখনো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসামী শনাক্তে তাদের এমন ব্যর্থতা নজিরবিহীন। সাধারণ মানুষ মনে করে, খুব প্রভাবশালী কোনো মহলের হাত রয়েছে এর পেছনে।

মেহেরুন রুনির পরিবার, সহকর্মী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন তদন্ত সঠিক পথে নেই বলেই এত দিনেও সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হচ্ছে না। রুনির ভাই নওশের রোমান জানান, আমরা আসলে গত দুই বছর ধরে মামলা নিয়ে কিছুই জানতে পারিনি। তারা এ মামলা নিয়ে কোন কথা বলছে না। আগে মিডিয়ার মাধ্যমে কিছুটা হলেও জানতে পারতাম। এখন সেখানেও তারা কথা বলছে না। এসব দেখে মনে হয় যে তারা এখন আর এ মামলার কোন তদন্তই করছে না।

অথচ হত্যাকান্ডের পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনীদের গ্রেফতারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর পুলিশ প্রধান জানিয়েছিলেন, তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এরপরই হঠাৎ থমকে যায় তদন্তের অগ্রগতি। রহস্যের জট তো খোলেইনি বরং আরো ঘনীভূত হয়। মামলা হওয়ার পর প্রথমে এর তদন্তে নামে শেরে বাংলা থানা পুলিশ। চারদিনের মাথায় মামলা হাতবদল হয় ডিবি পুলিশের কাছে। এর ৬২ দিনের মাথায় ডিবি আদালতে ব্যর্থতা স্বীকার করলে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। দায়িত্ব নিয়েই সাগর ও রুনির মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে পুনরায় ময়না তদন্ত ও ভিসেরা পরীক্ষা করে র‌্যাব। বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হলেও তদন্ত আর এগোয়নি। র‌্যাব এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। আদালতও তাদের ব্যর্থতা আমলে নিচ্ছে না।

এই হত্যাকান্ডের ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন সাংবাদিক হারুন উর রশীদ। তার মতে, তদন্ত সঠিক পথে না থাকাতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে নানারকম গুজব ছড়ানো হয়েছিল। প্রভাবশালীরা কেউ জড়িত, অথবা সাগর কোন একটা বই লিখেছে অথবা কোন ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকেও এটি ঘটতে পারে এরকম নানা কথা বাজারে ছড়িয়েছিল। এমনকি পুলিশ গ্রিল কাটা চোর নিয়ে মহড়া করে সেটা ভিডিও করেছিলো। মানে চোর তত্ত¡ও তো বাজারে এসেছে। এরকম নানা তত্ত¡ যখন বাজারে ছড়ায় তখন বোঝা যায় যে, ঘটনার আসল তদন্ত হচ্ছে না। এসব গুজব অনেক সময় আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর পক্ষ থেকেও ছড়ানো হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে।
আইন ও শালিস কেন্দ্রের মুখপাত্র ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, কয়েকটি কারণে তদন্ত থেমে যেতে পারে। প্রথমত, এ ঘটনায় এমন প্রভাবশালী কেউ জড়িত, যার কেশাগ্র স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো নেই। দ্বিতীয়ত, এ ঘটনায় এমন একটা পাবিলক পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে, এর বিপরীত কোন তথ্য তদন্তে বের হলেও তা প্রকাশ করতে পারছেন না তদন্তকারীরা। কোন মামলায় যখন নানারকম চাপ কিংবা বাধা তৈরি হয়, তখন অনেক সময় তদন্তকারী সংস্থা তদন্ত শেষ না করে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়ে থাকেন। এখন বাধাটা কোথায় সেটা সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে ঘটনার পরপরই আন্দোলনে নেমেছিলেন অনেকেই। অল্পকিছুদিন পরই সেই আন্দোলন থেমে গেলেও আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী পরে হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। তিনি মামলার তদন্তে কোন বাধার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে কখনোই কোন বাধা দেয়া হয়নি। তবে এ প্রসঙ্গে র‌্যাব, পুলিশ বা গোয়েন্দা শাখার কেউ মুখ খুলতে নারাজ। অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, এই হত্যার বিচার নিয়ে আশাই ছেড়ে দিয়েছে খোদ সাগর-রুনির পরিবার।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of