অতলান্তিকে সেন্টিয়াগো, ম্যানোলিন আর আমার মৃত্যুর গল্প

[আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নোবেল পুরস্কার বিজয়ি The Old Man & The Sea’র প্রধান চরিত্র সেন্টিয়াগোর রূপকে গল্পটি লিখিত]

The Old Man & The Sea পড়ার পর থেকে বুড়ো সেন্টিয়াগোর সাথে দেখা করার প্রবল ইচ্ছে জাগে আমার। ‘ওল্ড ম্যান অব দ্যা সি’র সেই বুড়ো সেন্টিয়াগো, যার ভাঁজ পড়া চামড়ার ফাঁকে ফাঁকে জমেছিল শুকনো বরফকুচি- নীল মার্লিন শিকারের সুতীব্র আকাংখা ছিল আজন্ম। শীতার্থ ওক বৃক্ষের বাড়িটি বরফে ঢেকে গিয়েছিল তাঁর। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘেরা বন্ধনীর জীবনচক্র ছেড়ে, হারপুণ হাতে সমুদ্রে নেমেছিল নীল মার্লিনের জন্যে। অস্থির, ক্ষীণায়ু তাৎপর্যহীন জীবনটাকে টেনে, নিরর্থক সুন্দরের করুণ লড়াই করেছিল সে। বিনাশের অভিন্ন সূত্রে গাঁথা জীবন বয়ে বয়ে- অরাষ্ট্র্রে অখাপ খাওয়া বাতাস আর বৃষ্টিধারার মত, তাঁর দ্রোহ অব্যক্ত ছিল হৃদ-রক্তক্ষরণের ভেতরেই। নিষ্ঠুর হাঙরেরা তৃপ্তির অঘোর ঘুমের সময়- তার প্রাপ্তির মার্লিনকে খুবলে খুবলে রক্তাক্ত করল। অতএব মাথায় ঘুণ পোকারা ঢুকে নেচে উঠলো সেন্টিয়াগোর কাছ যাবেই যাবে। কিউবার হাভানা থেকে ২০-কিমি উত্তরে সেন্টিয়াগোর কোহিমার জেলেপল্লীতে যাবো আমি। দেখবো সেন্টিয়াগো, তার বাড়ি, কোহিমা জেলেপাড়ার মানুষ, তার ডিঙি, হারপুণ আর কিশোর ম্যানোলিনকে।
:
ঢাকা থেকে আমিরাত ফ্লাইটে দুবাই-ফ্লোরিডা হয়ে হাভানা পৌছলাম পাক্কা ২-দিনের পঞ্চমুখি ঝক্কিতে। হাভানার José Martí Airport-এ নেমেই ট্যাক্সি নিলাম উত্তর আটলান্টিকের তীরবর্তী ‘সান্তা ক্লারা’ শহরের। সান্তা ক্লারার পাশেই ছোট্ট গাঁ কোহিমাতেই থাকে বুড়ো সেন্টিয়াগো তার হারপুণ, ছোট ডিঙি আর ম্যানোলিন। শান্তা ক্লারা নেমে সুখ ডানার জন্মনেয়া রঙিন প্রজাপতির পাখায় উড়ে উড়ে চললাম কোহিমা জেলেপল্লীতে। সন্ধ্যার প্রাক্কালেই জেলেরা প্রায় সবাই ফিরে এসেছে তাদের পুরণো নৌকা, পাল, আর মাছ শিকারের যন্ত্রপাতি নিয়ে কোহিমাঘাটে। শিকারের মাছ আর নৌকার ভ্যাপসা গন্ধেও আমার সুখ পাখির হাঁসেরা উড়ে চলে আশ্চর্য তরঙ্গ ঢেউ তুলে নিখিল শব্দমাঝে। আনন্দ মৃত্তিকার টিলা, চোলাই মদের দোকানে দেহজীবী নারী, আর ওক গাছের বন পেরিয়ে আমি জীবনপথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাই বুড়ো সেন্টিয়াগোর সমুদ্রসেতুতে গড়া ঘাসের ছাদ দেয়া কুটিরের কাছে। পেজা তুলোর মত বরফে মননের ঘাসশিশুরা হেসে ওঠে বারবার আমার পথচলা দেখে।
:
সেন্টিয়াগোর সমুদ্র সংলাগ তৃণছাওয়া কাঠের বাড়িতে দরজা নাড়তেই এগিয়ে এলো ১২/১৩ বছরের এক কিশোর। পরিচয় দিলো নাম তার ‘ম্যানোলিন’। ম্যানোলিনকে পেয়ে টলটলা জলায়িত জীবনের সকরুণ গান খুশিতে রূপান্তরিত হয় আমার বসন্তের বাতাসে। এই হচ্ছ সেই কিশোর ম্যানোলিন, যে কিনা সব সময় থাকে সেন্টিয়াগোর কাছাকাছি। নিজের ঘর থেকে রুটি, পনির, মদ আর চুরুট নিয়ে সেন্টিয়াগোকে ধরিয়ে দিতো, আর হারপুণ পরীক্ষা করতো মার্লিন শিকারের হারপুণ।
:
আমি সুদুর ঢাকা থেকে এসেছি বুড়ো সেন্টিয়াগোকে দেখতে এবং ম্যানোলিনকেও জানি, এ কথা শুনে যেন মনোবিকলিত জীবনের গান গেয়ে ওঠে কিশোর। চুলের শুকনো বরফ ঝেড়ে আমায় টেনে নেয় ওক কাঠের ঘাসের কুঁড়েতে। আগুন জ্বালিয়ে দুজনের শরীরে ওম দেয়, আমার আর নিজেরও। ঘরের অদুরে প্রবেশদ্বারে বিশালাকার মার্লিনের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে, যা এ বাড়ির প্রবেশদ্বারে তীরে রক্ষিত। ম্যানোলিন আনন্দের অনিদ্রাকুসুম জ্বালিয়ে বলে, ‘ঐ সেই মার্লিনটার কঙ্কাল, যা শিকার করেছিল সেন্টিয়াগো একাকি চুরাশি দিনের সপ্তপদি জীবনবোধের প্রচেষ্টায়। জান তুমি এ শিকার কাহিনি? ওর কথা শুনে আমার ভূমি মনে প্রেমের লীনতা হাসে, বলি তাইতো এলাম ম্যানোলিন ভাললাগা সময়ের রূপরেখা এঁকে এঁকে!
:
বিকেলের সূর্য ঢলে পড়ার আগেই আমি সেন্টিয়াগোর সাথে দেখা করতে চাই জানালে, অপরূপ জৈবিক শিল্পক্রীড়া প্রদর্শনে ম্যানোলিন বলে, ‘সে এখন সমুদ্রতীরের চোলাই মদের আড্ডায়। সেখানে চুর এখন মদের নেশায়। তুমি যাবে ওখানে’? আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে, আচ্ছন্নতায় ডোবা স্মৃতির গান গাইতে গাইতে ম্যানোলিন নিয়ে চলে আমায় বড় বড় পাথর ঘেরা বৃক্ষময় ওক কাঠ বাড়িতে। যেখানে আরো জনা দশেক বুড়োর সাথে মদ গিলছে বুড়ো সেন্টিয়াগো। ঊষর ভূমণ্ডলে জলের তৃষ্ণার মতো আমি সেন্টিয়াগোর দিকে তাকিয়ে থাকি অনিমেষ। ম্যানোলিন পরিচয় করায় সেন্টিয়াগোর সাথে আমার। বলে, ‘তাকে দেখতেই এসেছি হাজার যোজন দুরের বাংলাদেশ থেকে’। শুনে উঠে দাঁড়ায় বৈভবের মৌনতায় ছায়া প্রাণময়তায় ভরা সেন্টিয়াগো, হাত বাড়ায় বুকে টেনে নেয়ার জন্য কিন্তু নেশার ঘোরে কালি মাখে যেন মানবজমিনের হৃদে। এক শিহরণপূর্ব আনন্দ আর দুখাতুর অনিন্দ্য অবয়বে আমি সেন্টিয়াগোকে জড়িয়ে ধরি। এদেশে নারীরা পুরুষকে জড়িয়ে ধরে, পুরুষেরা পুরুষকে নয়। তাই কামাতুর হিংসায় জ্বলা মিচকে পতিতারা বাঁকা চোখে শিষ দেয় আর চোখ মারে আমার দিকে। স্বল্পবসনা দেহজ নারীরা ডাকে চোখের ইশারায়। যদিও ওদের চপল রূপভারে ক্ষয়িষ্ণু জীবন এখন এ সমুদ্র তট বন্দরে।
:
বোধের গভীরের কষ্টদের চেপে রেখে সেন্টিয়াগো হাসে আটলান্টিক বাতাসের শীতলতার নীলাভ পাথারের মত। এক সময় নিঃসঙ্গতার ক্রুশে ঝুলতে ঝুলতে আমার আর ম্যানোলিনের কাধে হাত রেখে সেন্টিয়াগো হাঁটতে থাকে, দুখাক্রান্ত ঘুমন্ত সমাজ, আর ঘরবাড়ি দুপায়ে মারিয়ে। পথশেষে ঘরে পৌছতেই যেন বারান্দায় শুয়ে থাকা কষ্টেরা উঠে দাঁড়ায় সেন্টিয়াগোকে ঘিরে! এক বোহেমিয়ান সামুদ্রিক জীবন থেকে ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রী মেরি চলে গেছে করুণতার দুর্লঙ্ঘ নিয়তি মাঝে। এরপরো সমুদ্র ছাড়েনি সেন্টিয়াগো। নতুন স্ত্রী মার্থাকে ঘরে ফেলে দিনরাত হারপুণ হাতে তিমি আর মার্লিন শিকারি দ্রোহি সেন্টিয়াগো ঘুরে বেড়োতো অতলান্তিকের অতল জলে। এক দুপুরে ফিরে মার্থাহীন কষ্টভরা সমস্ত বিকেল কাটালো জীবনের অন্তিম আর্তনাদে কেঁদে-কেঁদে। স্ত্রী হারিয়ে এ যেন বৃষ্টিস্নাত এক মরীচিকা প্রেম সমুদ্রের প্রতি। ক্লেদাক্ত কষ্টের আকাশে ভাসিয়ে এক সময় প্রেমিকা পাওলিনও হারিয়ে যায় চোলাই মদের আড্ডায়। সবশেষে সেক্সপার্টনার হার্ডলিকে হারানোর পর অপ্রাপ্তির দাসেরা ইতিউতি ঘোরে সেন্টিয়াগোর জীবনে। কষ্টেরা জাল ফেলে আলোময় আঁধারঘন তার জীবন নদীতে। তাই চার-নারী হারিয়ে আটলান্টিকের গভীর নীল জলে রক্ত আদিমতার নেশা জাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় একাকি সারাদিন সারাক্ষণ বুনো গাঙচিল হয়ে। এই সেই সেন্টিয়াগো, বুড়ো মার্লিনের মৃত হাড়ের বিভাজিত করুণতায় যে কাঁদে অহর্নিশ!
:
রাতে দুখ তার বহমান বংশানুক্রমে জেগে থেকে সমুদ্রের শীতার্থ বাতাসে সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি করায় আমাদের ৩-জনেরই। উষ্মজলে স্নান সেরে সুখের আঁচলের নিচে ঢাকা যৌবনময়তার মত ঝড়ঝড়ে কথা বলে সেন্টিয়াগো। যাপিত জীবনের মাঝে সাগরের কথাই বলে যায় ঝড়ের মত নিরন্তর, বলে তার ছোট্ট ডিঙি নৌকায় চেপে শিকারের সব সাহসি কথা! এই প্রথম দক্ষ নিপুণতার সাথে দেখি আমি বুড়ো সেন্টিয়াগোকে। সেন্টিয়াগো অবিশ্বস্ত অবচেতনে বিনাশিত সুখের মত বলে যান, সব হারিয়ে কেবল সুখ আর মুনাফার জন্য নয়, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদেই অর্থের মানদন্ডে নির্মাণ করে নিচ্ছে মানুষ তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে। তবে সমাজের এ চিত্র সুন্দর নয়, নয় সুখেরও। এ চিত্রটি অত্যন্ত কুৎসিত এবং নির্মম। তার অত্যন্ত কষ্টার্জিত অর্জন, পঁচাশি দিনের মাথায় ধরা এক বিশাল নীল মার্লিন , যার সঙ্গে তিনদিন ধরে ক্রমাগত অসম সাহসী লড়াই করে জিতেছে সে। তাকে রক্ষা করার জন্য লড়ছে সে সমুদের হিংস্র, যুথবদ্ধ নিষ্ঠুর হাঙরকুলের সঙ্গে। স্বল্পস্থিতির মাঝে সুখের আকুলতা নিয়ে পুন. সেন্টিয়াগো বলে, সাময়িক পরাজয়ে হাল ছেড়ে দেয়ায় নেই কোন মুক্তি। ঝড়ো নৌকার গলুইয়ের তীরে দাঁড়িয়ে জীবন দহনে পোড়ার নামই জীবন। স্বপ্নতরঙ্গে ভেজা সেন্টিয়াগোর দিকে তাকিয়ে আমি তার মানবিক দুখের সুসম প্রাক্কলন করতে থাকি ক্রমাগত তুষারময় ধোয়াশার সকালে!
:
শান্ত সুবোধ অবোধ প্রেমিকের মতো সেন্টিয়াগো থামতে চায়না। কষ্টদের টোল খাওয়া গালে চিমটি কেটে তার ছোট ডিঙিতে চরে বসি আমরা ৩-জনে। আটলান্টিক শীতল জমাট স্রোতে দানবাকৃতির এক নীল মার্লিন’র সাথে সেন্টিয়াগো নামক পেশাদার জেলের সংগ্রামের কাহিনি সে ক্রমাগত বলে যায় মধ্যদিনের গনগনে তপ্ত আগুনের সূর্যের মতো। আটলান্টিকের প্রবল ঢেউয়ের মাঝেও আমি সেন্টিয়াগো নামক মানুষের নিঃসঙ্গতা, একাকীত্বরে যন্ত্রণা, যন্ত্রণার নিরাকার দৃশ্য অবলোকন করি। বিশাল মার্লিনের সাথে এক অসম লড়াইয়ে মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, তবু তার কাছে পরাজয় স্বীকার করে না পৌরুষদীপ্ত ঝকঝকে সেন্টিয়াগো। আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু খুইয়ে বসা সান্তিয়াগো আসলে হারায়নি তার অথবা মানুষের কিছুই। আসলে ঐশ্বর্যটাই হচ্ছে মানুষের আজন্ম লালিত স্বপ্ন! জীবন নামক সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধতার কাছে হার স্বীকার করেনি সেন্টিয়াগো যেমন করেনি তার প্রতিভু মানুষেরা । দুখ শিল্পের অপ্সরীদের স্বপ্নেও্ যে জীবনটা আসলে সমুদ্রই; সেটি কখনো উত্তাল, কখনো শান্ত, তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ কখনো তার রূপ, কখনো বা নিস্তরঙ্গ নিথর। অনিত্যর শব দেহে সে কথাই অনুরণিত হয় সেন্টিয়াগোর জীবন কথনে সারাক্ষণ!
:
কিশোর ম্যানোলিনকে ভালবাসে সেন্টিয়াগো। যে আসলে সেন্টিয়াগোর ফেলে আসা কৈশোর-শৈশব আর যৌবনময়তার নাম। ম্যানোলিন আর সেন্টিয়াগোর একত্রিত শক্তি সেন্টিয়াগোর এই বৃদ্ধ বয়সে তার যন্ত্রণা এবং সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বিজয়ের মুহূর্তে তার শক্তির অনুপম আঁধার যেন। এমনটিই আমার মনে হয় নানা প্রতীকায়ণের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুটিত পরিস্থিতি আর প্রেক্ষিতগুলোর অনুভবে। :
:
কথা বলতে বলতে হৃদয়ের রিক্তানদীর বাঁধ ভেঙে উপচে পরা দুখগুলোর মাঝে অত্যন্ত চমৎকার একটি উক্তি করে সেন্টিয়াগো। বলে- ‘Man is not made for defeat. Man can be destroyed, but not defeated!’ আসলেই, মানুষের জন্ম তো হার মানার জন্য নয়। মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু কখনো পরাজিত হয় না। শত প্রতিকূলতা, কুৎসিতের মুহূর্মুহু আক্রমণ, একে অপরের থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতা, শ্রেষ্ঠ আর সুন্দরতম অর্জনগুলো ছিনতাই হয়ে যাওয়া। এই চরম হতাশার মাঝেও তবু আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে অযাচিত স্বপ্নেরা। সুন্দরতম আগামীর সে স্বপ্ন নিরন্তর আমাদের জানিয়ে যায়, আসলে মানুষের সকল সময়ই দুঃখসময়, যদি আত্নসমর্পণ করা হয় দুখের কাছে। আর এ বোধের কারণে এক অসম লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হতেও পরাজয় স্বীকার না করা এ সাহসি যোদ্ধা বুড়ো সেন্টিয়াগো, চিরতারুণ্যকে ধারণ করে আমাদেরকে অবিরাম প্রেরণা দিয়ে যায় আর বলে, আত্নসমর্পনে কোন মুক্তি নেই, কখনো ছিলও না এবং মানুষ হার স্বীকারের জন্য জন্মেনি; সে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু কখনো পরাজিত হয় না ! বলতে বলতে পুরণো প্রাসাদের বুড়ো ইটের দুখের মত অট্টহাসি হাসে সেন্টিয়াগো, অতলান্তিকের বাতাসে তা অনুরণিত হয় বারবার।
:
জলের ঋণ শোধরাণোর মতো ক্লেদ করুণতায় সেন্টিয়াগো এবার আটলান্টিকের ঝড়ো বাতাসে চোখ মোছে। আমি কাধে হাত রাখি সেন্টিয়াগোর। দলিত মৃত্তিকা কান্নার শব্দের মত বলি, সেন্টিয়াগো ডাকিনীর চরে রাখালের দুখরা হাটে যেমন, তেমনি তুমি হেঁটেছো এ আটলান্টিক জলচরে। হার্ডলে, পাওলিন, মার্থা, মেরি সবাই ছেড়ে গেছে তোমায় দুখের অকথিত ইতিহাস হয়ে। তুমি বাংলাদেশে যাবে আমার সাথে চলো? সেখানে অনাবাশ্যকীয় ঝড়াপতার গান আছে, শেষাব্দির উপাচারে ভরা কুয়াশা স্রোত আছে, হাঙর আর মার্লিনে ভরা বে অব বেঙ্গল আছে, ছিপ নৌকো আছে, সুখের অনুপম তন্ময়তা আছে। তোমার দুটো হারপুণ আর ম্যানোলিনকে নিয়ে চলো আমার সাথে। প্রিয়তমার নাব্যতা মাপবে তুমি বঙ্গললনার মাঝে, তারা চলে যাবেনা তোমায় ছেড়ে কখনো। ডিঙি বানিয়ে দেব আমি, মৃত হাড়ের বিভাজিত করুণতায় ভরা ডিঙি । তোমার সমুদ্র শিকারের সহযোগি হবো, আমরা দক্ষিণে ভারত মহাসাগর হয়ে শীতল লাব্রাডা স্রোতে যাবো হাতুড়িমুখো হাঙর শিকারে কিংবা শীতল জলের নীলচোখা মার্লিনের খোঁজে !
:
বয়সের ভারে ন্যুজো সেন্টিয়াগো চাঁদোয়া মাঠের ঝাপসা ধোয়াসার কান্নার মাঝেও খিলখিলিয়ে হাসে। তার হারিয়ে যাওয়া জীবন প্রেমহীনতায় যেন সুদাসলে কষ্টের নদীরা স্লোগান তোলে একই করতালে। সাময়িক ধার করা সুখেরা উড়ে যায় দুখের বিভাজনে হঠাৎ। বুড়ো ক্লেদাক্ত সেন্টিয়াগোর স্বপ্নভঙ্গের জলছাপের কান্নাগুলো দুমরে মরে অতলান্তিকের গভীর নীল জলে। হারপুণ হাতে সেন্টিয়াগো নিরীক্ষণ করে জলতলের হাঙরদের। তার অবোধ দুখরা জেগে থাকে সারাক্ষণ তাকে ঘিরে, আমাকে আর ম্যানোলিনকে আঁকড়ে । আবার বাতাসে চোখ তুললে ধ্যানের পিঁড়িতে বসা দুখরা উড়ে আসে মৃতপ্রায় আকাশে। আকস্মিক আটলান্টিক নীলজলে যৌবনময়ী অশরীরী ঝড়ের মাতম ওঠে! সেন্টিয়াগো, ম্যানোলিন আর আমি দুখাতুর পারদর্শী পৌরাণিক প্রেমিকের মত নীল জলে নিমজ্জিত হতে চাই ভাললাগা সময়ের রূপরেখার মত। শান্তসুবোধ অবোধ প্রেমিকের মতো এই প্রথমে সেন্টিয়াগো, ম্যানোলিন ও আমি হ্যামারহেড হাঙর সমৃদ্ধ জলে ঝাপ দেই। আমাদের দুখের অশ্রুজলের ঘ্রাণে ভাসে নীল জলধি। বলিদানের প্রসাদী মাংসের স্তুপের মত হাঙর উৎসবে পুনর্বার জলে ভাসতে আর ডুবতে থাকি আমরা। স্বল্পস্থিতির মাঝে সুখের আকুলতায় আমরা ভাসতে আর ডুবতে থাকি গভীর নীল জলে অবিনশ্বর অমরতা নিয়ে। আমাদের চারপাশে তখন হাতুড়িমুখো অসংখ্য হাঙর, যাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সেন্টিয়াগোর স্বপ্নের নীল দানবাকৃতি মার্লিনেরা। আমরা দুখাতুর পৌরাণিক প্রাণির মত হাড়বৃক্ষ, হাড়ঘাস, মৃত মার্লিনের জীবাশ্ম হয়ে অতলান্তিকের গভীর জলে নিমজ্জিত হতে থাকি এক পরম পুলকিত চিত্তে!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of