বাংলাদেশের বেশিরভাগ সম্পদ ২৫৫ জনের কাছে!

বাংলাদেশের বেশিরভাগ সম্পদ মাত্র ২৫৫ জন ব্যক্তির কাছে  আটকে আছে। এক্ষেত্রে শিল্পমালিক বিশেষত গার্মেন্টস শিল্পের মালিকদের হাতে বেশিরভাগ সম্পদ রয়েছে। গত ৫ বছরে ধনকুবেরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গণচীনে ও হংকংয়ে। কিন্তু ধনকুবেরের সংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ১৭.৩ শতাংশ বাংলাদেশে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ধনকুবেরের সংখ্যা ছিল ২৫৫ জন। আর মানুষের শ্রমে সৃষ্ট সম্পদ দেশে থাকছে না। বছরে দেশ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে।

দেশে আয়বৈষম্যও ক্রমাগত বাড়ছে। সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ লোকের কাছে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপি’র ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। যা কিনা ২০১০ সালের তুলনায় ৩ শতাংশেরও বেশি। অর্থনীতিবিদরা তাই বলছেন, ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই। কারণ নাগরিকদের উন্নয়ন নয়, বেশি উন্নয়ন হচ্ছে অল্প কিছু ধনী লোকেরই।

৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য, সমাধান কোন পথে?’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। প্রবন্ধে বলা হয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে। আয়বৈষম্য বাড়তে থাকার এ প্রবণতা দেশের জন্য আসন্ন এক মহাবিপদ সংকেত।

সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সোয়া ১ কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ডলারের ওপরে। অথচ কর দেন মাত্র ২০ লাখ মানুষ। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে কর আদায় বিশেষ করে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কার্যকর করতে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ৯০ এর দশকে সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ব্যাংকিং খাতের জন্য। স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ কোন দেশের জন্য সুখকর হতে পারে না। যেকোনোভাবে এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করা উচিত।

ড. মইনুল ইসলাম জানান, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বাড়ার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। আর দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ এখন গার্মেন্ট মালিকরাই। বছরে দেশ থেকে যে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে, এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা। কিন্তু এই খাতের ৩৫ লাখ শ্রমিক আগের মতো দরিদ্রই থেকে গেছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। তিনি বলেন, মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোমের মালিক এবং টরেন্টোর ‘বেগম পাড়ার’ বাড়ির মালিকদের মধ্যে দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল আমলা, সামরিক অফিসার, অর্থনীতিবিদদের পরিবারের পাশাপাশি গার্মেন্ট মালিকদের পরিবারই সংখ্যায় বেশি বলে চিহ্নিত হয়েছে।

সাড়ে তিন দশক ধরে সর্বশক্তি দিয়ে এ বিষয়ে জাতির মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, এ কথা উল্লেখ করে মইনুল ইসলাম বলেন, দেশে কোটিপতিদের সংখ্যা দ্রæত বাড়ছে। এর পেছনে ন্যক্কারজনক পন্থা হলো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়া। এমন কোনো সরকারি সংস্থার নাম করা যাবে না, যেটা খানিকটা দুর্নীতিমুক্ত। এছাড়া বর্তমান জাতীয় সংসদে সাংসদদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ সংসদ ব্যবসায়ীদের সংসদ এবং রাজনীতি এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা উল্লেখ করে ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ ও পুঁজি লুণ্ঠনের যাত্রা শুরু হয়। দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের মাধ্যমে গত ৪৪ বছরে দেশে লাখ লাখ ব্যবসা নির্ভর পুঁজিপতি, মার্জিন-আত্মসাতকারি রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দুর্নীতিবাজ আমলা এবং সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধনাঢ্য ও উচ্চবিত্ত গোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। তিনি বৈষম্য বৃদ্ধির শক্তিগুলোকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করার জন্য রাষ্ট্রকে জনগণের স্বার্থের পাহারাদারের ভূমিকা পালনে বাধ্য করতে হবে বলে অনুরোধ জানান। মইনুল ইসলাম বলেন, আয় ও সম্পদ বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে দূর্নীতি নিরসন করতে হবে। এর জন্য সকলকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরাসউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, মাতৃমৃত্যুর হার ছাড়া মানব উন্নয়নের অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু দেশে ক্রমান্বয়ে আয় বৈষম্য বেড়ে চলেছে। কেবল মাথাপিছু আয় দিয়ে উন্নয়নকে বিচার করলে চলবে না। যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, তার ভাগ যেন সমাজের প্রান্তিক মানুষ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বণ্টনের ন্যায্যতাসহ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে যেতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে রেখে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনতা ব্যাংকের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন (এফসিএ) বলেন, দেশে এখনো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করার মতো শক্তিশালী কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরশন বাংলাদেশ (আইসিবি) কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানের দীর্ঘমেয়াদী বন্ড মার্কেট এবং শেয়ার বজার উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন জামাল উদ্দিন।

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত সম্পদ বণ্টনের ন্যায্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রাষ্ট্রকে কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির পূজা করলে হবে না। সেই প্রবৃদ্ধি দিয়ে আসলে মানব উন্নয়ন হচ্ছে কি-না সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, ধরুন দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হলো, কিন্তু সেটা যদি সমাজের নিচু তলায় না যায়, তাহলে এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোন লাভ নেই। তিনি আংশকা প্রকাশ করে বলেন, নব্য উদারবাদী পুঁজিবাদ অর্থনীতিকে ধংবসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদ সমাজে আয় ও সম্পদ বৈষম্য নিরসনে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যায়ভিত্তিক ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহবান জানান।

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
ইভান অরক্ষিত Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
ইভান অরক্ষিত
পথচারী
ইভান অরক্ষিত

ধন্যবাদ প্রবন্ধটির জন্য। তথ্যের সোর্স যুক্ত করলে আরও প্রাসঙ্গিক হবে।