মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করছে যারা

যুক্তরাষ্ট্র সরকার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তিন বছর আগে ২০১৬ সালের অক্টোবরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘শুদ্ধি অভিযান’ নাম দিয়ে গণহত্যা ও উচ্ছেদ চালানোর পর থেকে সে দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের সম্পর্ক ভালো নেই। তখন থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকাশ্যে তাদের সমালোচনা করে আসছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ ছাড়াও জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ও তাদের সামরিক বাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টাও করেছে।

মিয়ানমারের রাজনীতিবিদ ও সামরিক নেতৃবৃন্দ রাখাইন রাজ্যে সঙ্ঘটিত অপরাধ স্বীকার করতে বরাবরই অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে, যেটাকে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জাতিগত নিধন অভিযান এবং এমনকি গণহত্যার সাথে তুলনা করেছেন। রোহিঙ্গা নিপীড়নের এই ঘটনা এবারই প্রথম ছিল না। অতীতেও যখন এমনটা হয়েছে, তখন মিয়ানমার সরকার তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ওপর নির্ভর করে কালক্ষেপণ করার মাধ্যমে সব দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে।

আন্তর্জাতিক মহলও তাদের মধ্যেকার নানা দ্ব›েদ্বর কারণে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে মিঢনমার সরকারের এই কৌশলগুলো তাদের জন্য ভালোই কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। সাস্প্রতিক এক নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণায় উঠে এসেছে, মিয়ানমার ও তার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সমালোচনা এবং তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে নিজেদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তারা জোরদার করেছে এবং সামরিক বাহিনী এখনও আধুনিক অস্ত্র কেনা অব্যাহত রেখেছে।

মিয়ানমারে ২০১১ সালে ‘সীমিত গণতন্ত্রের’ আগমনের পর থেকে, চীন তাদের কাছে দুটো জিঙ্ঘু-২ শ্রেণীর ফ্রিগেট, ৭৬টি টাইপ-৯২ সাঁজোয়া যান, ১২টি সিএএসসি সিএইচ-৪ মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন) এবং ১৬টির মতো সিএসি/পিএসি জেএফ-১৭ জঙ্গি বিমান বিক্রি করেছে, যেগুলোর মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এই সব অস্ত্রাদির বেশিরভাগ এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়ে গেছে। প্রথম চারটি জেএফ-১৭ বিমান মিয়ানমারের বিমানবাহিনী এরই মধ্যে বহরে যুক্ত করেছে। জেএফ-১৭ বিমানটি পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে তৈরি করেছে চীন। রোহিঙ্গাদের সাথে বর্বর আচরণের জন্য মিয়ানমারের সমালোচনা করেছে পাকিস্তান। কিন্তু সেটা মিয়ানমারের বিমান কেনার পথে কোন বাধা হয়নি।

২০১৬ সাল থেকে মিয়ানমারের বিমান বাহিনী ১২টি ইয়াকোভলেভ ইয়াক-১৩০ জঙ্গি প্রশিক্ষণ বিমান কিনেছে রাশিয়ার কাছ থেকে। আরও চারটি তারা দ্রæতই হাতে পাবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবরে মিয়ানমারের বিমান বাহিনীর চারটি মিল মি-২৪পি হেলিকপ্টার গানশিপের মেরামত করা হয় রাশিয়ায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার কাছ থেকে ছয়টি সুখোই সু-৩০ বহুমুখী জঙ্গি বিমান কেনার জন্য চুক্তি করে মিয়ানমার। প্রায় ২০৪ মিলিয়ন ডলারে এই চুক্তিটি হয়েছে বলে জানা গেছে।

মিয়ানমার একই সাথে প্রতিরক্ষা কুটনীতিও জোরেসোরে চালিয়ে যাচ্ছে। সামরিক বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তারা দেশের বাইরে সফর করছেন এবং বাইরের দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও মিয়ানমার সফর করেছেন। এমনকি মিয়ানমার প্রতিবেশী দেশ ও আঞ্চলিক জোটের সাথে বেশ কিছু নৌ-মহড়াতেও অংশ নিয়েছে। ২০১৭ সালে চীনের সাথে, একই বছর আসিয়ানের সাথে এবং ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ভারতের সাথে নৌ-মহড়ায় অংশ নেয় তারা। চীন, ভারত ও রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজগুলো মিয়ানমার সফর করেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভিয়েতনাম ও ব্রুনেইয়ের ফ্রিগেট মিয়ানমারে ‘শুভেচ্ছা সফর’ করেছে। মার্চে মিয়ানমারের একটি নৌ জাহাজ চীনের পিএলএ নেভির ৭০তম বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।

এই সব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা নীতির তিনটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রথমত, তাদের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে যত উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিবেশীদের কাছে ভূকৌশলগত ও বাণিজ্যিক বিবেচনার জায়গায় সেগুলো কোন বাধা হয়নি। রোহিঙ্গাদের সাথে খারাপ আচরণের কারণে তাতমাদাওয়ের বিরুদ্ধে যত কঠোর সমালোচনাই হোক না কেন, সেটা ভারত বা চীনকে খুব একটা নাড়া দেয়নি। আবার মুনাফার সুযোগ আছে বলে রাশিয়া, ইউক্রেন এবং ইসরাইল এখনও মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

দ্বিতীয়ত, এমনকি নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বেও মিয়ানমার নিজেদের নীতি ও অগ্রাধিকার নিজেরাই ঠিক করতে চায়, তা সেখানে আন্তর্জাতিক মতামত যাই থাকুক না কেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে, বিশেষ করে জাতিসংঘ ও অন্যান্য জায়গায় যেখানে মিয়ানমার চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাচ্ছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সামর্থ সীমিত হয়ে পড়েছে।
তৃতীয়ত, রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের জন্য ব্যাপক নিন্দার শিকার হওয়ার পরও এবং দেশের অন্যান্য জায়গাতেও অপরাধ সঙ্ঘটিত করার পরও উচ্চাকাক্সক্ষী সামরিক শক্তি অর্জনের জন্য সামরিক বাহিনীর তহবিলের কোন অভাব হচ্ছে না। ২০১১ সালে আধা-বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা বাজেট নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হয়, এবং তখন থেকেই এটা উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
এই যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে এবং রোহিঙ্গা নিপীড়নের দায় তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যাচ্ছে না, বরং তারা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এটা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশসহ অন্যান্য জায়গায় যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাস করছে, তাদের সহায়তা করতে হলে এতদিন যা কিছু করা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি কিছু এখনও করা বাকি রয়ে গেছে।

মিয়ানমারের তীব্র জাতীয়তাবাদ ও নিজেদের নীতির ব্যাপারে তাদের আত্মকেন্দ্রিকতার বিষয়টিতে যে তারা ছাড় দিতে চায় না, এটা পরিষ্কার। তেমনি তাদের এ অবস্থানে টিকে থাকতে সহায়তা করছে কিছু দেশের সমর্থন, যে কারণে তারা তাদের অগ্রহণযোগ্য কাজের কোন শাস্তি পাচ্ছে না। সমস্যা এই দুটোই। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উভয় সমস্যা মোকাবিলায় মনোযোগী হতে হবে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of