পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে আমার প্রথম লেখা “ইদি”

অনেক বিষয়ে গল্প, প্রবন্ধ এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি আমি। যার সংখ্যা ন্যূনতম ১০,০০০-এর কম হবেনা। কিন্তু পাকিস্তান নিয়ে কোন লেখা লিখিনি আমি। কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনো পছন্দ নয় আমার। তাই অনেক দেশ ভ্রমণ করেও PIA-তে কখনো ভ্রমণ করিনি, যদিও ভুটানের দ্রুক এয়ারেও ভ্রমণ করেছি আমি। পাকিস্তানের তৈরি জামা-পোশাক কখনো পরিনি, এমনকি পাকিস্তানের আচারো কখনো খাইনি আমি। একবার “ইন্ডিয়াগেট” চাল না থাকাতে, দোকানি দিলো আমাকে এক প্যাকেট পাকিস্তানের “মেহরান” বাসমতি। ঐদিন চাল ছাড়াই ফিরলাম ঘরে। যেদিন পাকিস্তানের সাথে কারো ক্রিকেট খেলা চলে, সেদিন খেলাই দেখিনা আমি। ফেসবুকে কবন্ধুকে আনফ্রেন্ড করলাম, যখন জানলাম তারা পাকিস্তানি।

:
কিন্তু সেই পাকিস্তানের একজন লোককে খুব পছন্দ আমার। তার নাম আব্দুল সাত্তার ইদি। জিন্নাহ টুপি পরিহিদ তার ড্রেসটি পছন্দ না হলেও লোকটিকে পছন্দ করি আমি। কারণ লোকটি বৈশ্বিক ও মানবতবাদি। কারণ আর্তের জন্য নিজ জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি৷ পাকিস্তানের প্রখ্যাত এ সমাজসেবী আব্দুল সাত্তার ইদি ৮৮ বছর বয়সে মারা গেছেন গত ৮ জুলাই৷ আব্দুল সাত্তার ইদি এমন একটি দেশে তিনি জীবন কাটিয়েছেন, যে দেশ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং সহিংসতার ভাগাড় হিসেবেই বেশি পরিচিত৷ আর সেখানে মানবতা আর অসাম্প্রদায়িকতার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন ইদি নামের মানুষটি। পাকিস্তানের দরিদ্র মানুষের জন্য সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি৷ আর এ সব তাঁকে করতে হয়েছে সামাজিক কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতার বেড়া জাল টপকে৷ ইদি বরাবরই নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করতেন৷ যাঁর কাছে মানবতা ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে, যা তিনি সারাজীবনে আর্তের সেবা করে তা প্রমাণ করে গেছেন৷ তিনি কাজ করেছেন সব ধর্ম, বর্ণ এবং দরিদ্র মানুষের জন্য৷ কিন্তু বিনিময়ে কিছুই চাননি৷

:
তরুণ বয়সেই ইদি সমাজসেবার কাজ শুরু করেছিলেন৷ তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ইদি ফাউন্ডেশন এখন বিশাল এক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, ছয় দশক আগে যার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আব্দুল সাত্তার ইদি নিজের হাতে৷ কেবল পাকিস্তানে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় কাজ করছে ফাউন্ডেশনটি৷ সবচেয়ে বড় অ্যাম্বুলেন্স সেবা, বাড়িতে গিয়ে নার্সিং সেবা, এতিমখানা, ক্লিনিক, নারী আশ্রয় কেন্দ্র, নারী ও শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, মাদকাসক্ত ও মানসিক রোগীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে এই ফাউন্ডেশন৷ স্থানীয়রা জানালেন, যে কোনো দুর্গোগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের আগে সব সময় পৌঁছে যায় ইদি ফাউন্ডেশনের অ্যাম্বুলেন্স৷ বিশ্বে পাকিস্তানের একটি নেতিবাচক দিক মানুষ জানে৷ এই দেশটির পরিচিতি কেবল সন্ত্রাসবাদ, দাঙ্গা – এ সব নিয়েই৷ কিন্তু এ দেশকে ইতিবাচকভাবে একমাত্র উপস্থাপন করেছিলেন এ ইদি৷ একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ইদি তাঁর ফাউন্ডেশনের কাজ শুরু করেছিলেন, আর আজ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক তাঁরই ফাউন্ডেশনের৷ তবে আশ্চর্যের বিষয় ফাউন্ডেশন বড় হলেও ইদি নিজে কিন্তু পাল্টে যাননি পাকিস্তানের অন্য রাজনীতিবিদ বা সমাজসেবীদের মতো৷ খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি৷ এ কারণেই মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে, আস্থা রেখেছে তাঁর ফাউন্ডেশনের ওপরও৷

:
১৯৮৬ সালে নিজেদের কাজের জন্য ইদি আর তাঁর স্ত্রী বিলকিস রেমন মাগসেসে পুরস্কার পান৷ এছাড়া লেনিন শান্তি পুরস্কার এবং বলসান পুরস্কারও পেয়েছেন তাঁরা৷ ১৯৮৯ সালে পাকিস্তান সরকার সেদেশের সবচেয়ে বড় বেসামরিক পুরস্কার ‘নিশান এ ইমতিয়াজ’-এ ভূষিত করেন ইদিকে৷ আব্দুল সাত্তার ইদি রাজনীতিবিরোধী মানুষ ছিলেন৷ তিনি সমাজবাদকে উৎসাহ দিতেন৷ কিন্তু ধর্ম, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং সামরিক স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর কঠোর অবস্থান৷ সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতেন বলে গণতন্ত্রবিরোধী পাকিস্তানের সরকারের রোষের মুখে পড়েছিলেন তিনি, বহুবার ইদি আর পৃথিবীতে না থাকলেও, তাঁর পরিবার এবং কর্মীরা ফাউন্ডেশনটিকে তাঁর মতো করে চালাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ৷ আর ইদিও বিশ্বাস করতেন, তিনি চলে যাওয়ার পরও সংস্থাটি মানবতার জন্য কাজ করে যাবে, সবসময়৷

:
মৃত্যুর পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আব্দুল সাত্তারকে গার্ড অব অনার দিয়েছিল। করাচির জাতীয় স্টেডিয়ামে তাঁর জানাজায় হাজার হাজার লোক জড়ো হয়েছিল। জানাজা শেষে তাঁর লাশ ইদি গ্রামে নিয়ে কবর দেওয়া হয়। ২৫ বছর আগে তিনিই এ গ্রামের পত্তন ঘটান। ভারতের এক গুজরাটি বণিক পরিবারে আব্দুল সাত্তারের জন্ম। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান। অতি সাধারণ জীবন যাপনের জন্য পরিচিত এই ব্যক্তিত্ব ২০১৪ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, তাঁর কর্মের মূল ভিত্তি হলো সাধারণ জীবন যাপন, সততা, কঠোর পরিশ্রম ও সময়ানুবর্তিতা। তিনি বলেছিলেন, ‘অন্যদের সেবা করা প্রত্যেকের কর্তব্য। এটাই মানবজীবনের অর্থ। যত বেশি সংখ্যক মানুষ এভাবে চিন্তা করবে, তত বেশি সংখ্যায় সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। জানা যায়, তাঁর মাত্র দুই প্রস্ত পোশাক ছিল এবং খুব সাধারণ ঘরে অতি দিনহীনভাবে দিন দিনযাপন করতেন।

:
ইদির মত পাকিস্তানি মানুষ দেখে চিন্তনে নাড়া দেয় এই বলে যে , ধর্ম কোন মানুষকে ভাল করেনা। বরং ইদি খুবই কম ধার্মিক ছিলেন। বড়ু চন্ডীদাসের “সবার উপর মানুষ সত্য” এ নীতিতে বিশ্বাসি ছিলেন মুসলিম ইদি। এমন মানুষ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান, জৈন, শিখ, ইহুদি, পার্সি কিংবা নাস্তিক হলেও অবশ্যই তারা বৈশ্বিক ও শ্রদ্ধেয়। ইদির জন্যেই হয়তো মানবিক মানুষ পাকিস্তানকে একটা “দেশ” বলবে, যেখানে অন্তত দুচারজন মানবিক মানুষ বাস করে।

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of