বাঁশের কেল্লা : তিতুমীর ৫

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গ অঞ্চলে একটি মিশ্র সামাজিক এবং ধর্মীয় সংস্কৃতি বিরাজ করতাে। হিন্দু মুসলমানের জীবনযাত্রার মধ্যে কিছু কিছু বৈসাদৃশ্য থাকলেও তারা মূলতঃ একটি জাতিগােষ্ঠিই ছিল-বাঙ্গালী। ঐশিক কারণে হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ বাঁধলেও উপাসনা-আরাধনার কারণে কখনও বিবাদ ঘটতাে না। এর কারণ হলো, তখনও মূলতঃ মারিফতী ইসলামের সাহায্যে ইসলামায়িত তথাকথিত নিম্নবর্গের গ্রাম্য মুসলমানদের মধ্যে জেহাদী তত্ত্ব প্রবেশ করেনি। ফলতঃ তাদের আচার আচরণ ছিল সম্পূর্ণ মানবিক। তিতুমীর এসেই এই আধা-ইসলামী মানবতাবাদী জনগােষ্ঠীকে ইসলামায়িত করতে গিয়ে বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব প্রচার করা শুরু করলো । এই আধা মুসলমানদের মানসিকতার পরিবর্তন করার জন্য তিতু ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’র আশ্রয় নিলো । ‘তরিকা-ই মহম্মদীয়া’ সম্পর্কে আগের পর্বগুলোতে জানিয়েছি। কেবল মানসিকভাবে নয়, বাহ্যিক ভাবেও তিতু মুসলমানদের তাদের পূর্বসূরীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট হলো । বাংলার ইতিহাস বিস্তারিত ঘাঁটলেই জানা যাবে যে, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গ অঞ্চলের সাধারণ গ্রাম্য মুসলমানদের কাছা দিয়ে ধুতি পরার চল ছিল । তিতুমীর ফতােয়া জারী করলো, কাছা দিয়ে কাপড় পরা চলবে না। গোঁফ ছাঁটতে হবে, দাড়ি রাখতে হবে, কামাতে হবে মাথার মাঝখানটা।

তখনকার দিনে গ্রাম্য মুসলমানদের নাম হিন্দুদের নামকরণের থেকে আলাদা ছিল না। এখনকার মত ওন্ড টেষ্টামেন্টের চরিত্রের আরবায়িত নাম বা আল্লাহর নিরানব্বইটি বিশেষণকে ভিত্তি করে আরবী নামকরণ হতাে না। তিতুমীর ফতােয়া জারী করলো, পুরােপুরি আরবী মুসলমানী নাম রাখতে হবে। তিতু এই বাঙ্গালী মুসলমানদের পুরনাে নাম পাল্টে নতুন আরবী নামও দেওয়া শুরু করলো । এইরকম সামগ্রিকভাবেই তিতু একটা বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিলো এবং এই বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি ছিল শরিয়ৎ নির্দেশিত। বস্তুতঃ তিতু শরিয়ৎ নির্দেশিত এক জেহাদী মুসলমান সম্প্রদায়ের সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, যে সম্প্রদায় চেহারায় কথাবার্তায়, আচার-আচরণে মুশরিক হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে । সরফরাজপুরে বর্গীর হাঙ্গামায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি কোঠা বাড়ীর ছাদ ফেলে দিয়ে নতুন করে উলুখড়ের ছাদ লাগিয়ে তিতু নিজ সম্প্রদায়ের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করলো। এক এক করে অনেকেই তিতুর অনুগামী হতে লাগলাে। তারা তিতুর নির্দেশাবলী পালন করতে লাগলাে। বারাসতের গ্রামাঞ্চলে উদ্ভব হলাে একটা নতুন সম্প্রদায়ের। সে সম্প্রদায়ের মানুষেরা চেহারা, আচার-আচরণে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । হিন্দুদের থেকে আলাদা তাে বটেই, সাবেকী মুসলমানদের থেকেও অনেকটাই আলাদা । এর কারণ, সাবেকী মুসলমানরা হানাফী মজহাবের অন্তর্গত আর ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’ শাহ্ ওয়ালীউল্লা সিলসিলার আন্দোলন। গ্রামের লােকেরা এই নতুন সম্প্রদায়ের লােকদের বলতে লাগলাে ‘মৌলভী’। মৌলভীরা সহমর্মিতা সষ্টির জন্য একসঙ্গে খাওয়া দাওয়াও করতে লাগলাে। যেন ঠিক আধুনিক কালের কমিউনবাসী !

তখনের বঙ্গে, মুসলমান প্রজারা হিন্দু জমিদার ও তালুকদারদের বাড়ীতে পূজা পার্বনে ভেট পাঠাতাে এবং পরিবর্তে তাদের অনুষ্ঠানে পাত পেতে খিচুড়ী ও প্রসাদ খেতাে বিনা সংকোচে । তিতু এই ভেট পাঠানো ও হিন্দুদের ধর্মানুষ্ঠানে খাওয়া, দুটোই বন্ধ করতে ফতেয়া দিলো, কারণ শরিয়া অনুযায়ী একজন মুসলমান ‘কেতাবী’ খৃষ্টান ও ইহুদীদের সঙ্গে একসাথে খেতে পারে, কিন্তু পৌত্তলিক হিন্দুদের সাথে নৈবচঃ, নৈবচঃ। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে তিতুমীর গ্রাম বাংলার সম্প্রীতির বাতাবরণ বিষাক্ত করা শুরু করেছিল এবং তৎকালীন ধর্ম-সামাজিক ভারসাম্যকে আঘাত করেছিল। অপরদিকে, বহু শতাব্দী ব্যাপী তুর্কী শাসনের দুঃস্বপ্ন থেকে হিন্দুসমাজ তখন সদ্য সচেতন হয়ে উঠছে। ইংরেজরা বিধর্মী হলেও মূলতঃ, সাম্রাজ্যবাদী। সাম্রাজ্যের স্বার্থেই তারা হিন্দুর ধর্মাচরণে তেমন হস্তক্ষেপ করে না। সে আমলে খৃষ্টান মিশনারীদের প্রচার ছিল ঠিকই, ছিল তাতে সরকারী সমর্থনও কিন্তু মিশনারীরা অন্ততঃ গােমাংস খাইয়ে হিন্দুর জাত মারার জন্য আকুল ছিল না !

ব্যাপারটা মােটেই ভাল ঠেকলাে না স্থানীয় জমিদারদের। তারা আর এক ঔরঙ্গজেবের উদ্ভবের আশংকায় ভীত হয়ে উঠলো…….

(ক্রমশঃ প্রকাশ্য)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 4 =