অযোধ্যা রায় ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হল এই ‘অযোধ্যা মামলা’। আর কোন মামলা, রাজনৈতিক তথা সমাজ জীবনে এতটা প্রভাব বিস্তার করেছে কিনা সন্দেহ! এই মামলার প্রভাব শুধু ভারতেই নয় এর প্রভাব গোটা উপমহাদেশে তীব্র ভাবে অনুভূত হয়। সেইসঙ্গে এই অযোধ্যা মামলাকে কেন্দ্র করে কত যে রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে তাঁর কোন হিসাব নেই! এই মামলা ভারত তথা উপমহাদেশের রাজনৈতিক, তথা ধর্মীয় ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিল, তাই এই রায় প্রদানের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছিল। 9 ই নভেম্বর 2019 তারিখে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে প্রায় 135 বছরের অধিক পুরানো আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি হল। (কেউ কেউ মনে করেন 150 বছরের অধিক পুরানো মামলা) এখন প্রশ্ন হল অযোধ্যা মামলা কি?

এবিষয়ে সকলে মোটামুটি অবগত তবুও বিস্তারিত না বললে ও ঐতিহাসিক আঙ্গিকে বলতে হয়- 1528 খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট বাবরের নির্দেশে তাঁর সেনাপতি ‘মির বাকি’ অযোধ্যায় ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণ করেন। হিন্দুদের দাবি, এই মসজিদ রামের জন্মভূমিতে বানানো হয়েছে। 1853 সালে এই সৌধ ঘিরে প্রথম হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ হয়। ‘নির্মোহী’ নামে হিন্দুদের একটি সংগঠন দাবি করে, মন্দির ভেঙে বাবর ওই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। 1885 সালে মসজিদের বাইরে একটি আচ্ছাদন তৈরির অনুমতি চান মহন্ত রঘুবীর দাস, এই আবেদন ফৈজাবাদ জেলা আদালত খারিজ করে। 1949 সালে মসজিদের ভেতর রামের মূর্তি পাওয়া যায়। মুসলমানরা অভিযোগ করে মূর্তিটি হিন্দুরা রেখে দিয়ে এসেছে, দুইপক্ষ মামলা দায়ের করে। সরকার সৌধ চত্বরটিকে বিতর্কিত ঘোষণা করে এবং গেটে তালা লাগিয়ে দেয়।

এরপর মন্দিরের তালা ঝুলতে থাকে ও বিশ্বহিন্দু পরিষদ এই মন্দির খোলার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। 1950 সালে রামজন্মভূমি ন্যাসের প্রধান মহন্ত পরমহংস রামচন্দ্র ও গোপাল সিং ভিশারদ মূর্তি পুজোর অনুমতি চেয়ে ফৈজাবাদ আদালতে আবেদন করে। পুজোর অনুমতি মিললেও ভেতরের গেটের তালা বন্ধই থাকে। 1959 সালে নির্মোহী আখড়া নিজেদের রামজন্মভূমির জিম্মাদার বলে সৌধের দখল চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। 1961 সালে সৌধ চত্বরে মূর্তি রাখা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ‘সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড’ আদালতের দ্বারস্থ হয়।1984 সালে বিশ্বহিন্দু পরিষদ এল কে আডবাণীর নেতৃত্বে মন্দির নির্মাণ কমিটি গঠন করে। 1986 সালে ফৈজাবাদ জেলা আদালত পুজোর জন্য গেট খোলার অনুমতি দেয়। ওই সময় ‘বাবরি অ্যাকশন কমিটি’ গঠন করা হয়।

1989 সালে সৌধের কাছাকাছি জমিতে মন্দিরের শিল্যান্যাসের অনুমতি দেয় তৎকালীন রাজীব গান্ধী সরকার। বলাইবাহুল্য, এতে সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়। আসলে সাহাবানু মামলার রায় (1985) পার্লামেন্টে বিল পাশের মাধ্যমে রাজীব গান্ধী সরকার বদল করে। পরবর্তী কালে মন্দিরের তালা খুলে হিন্দু কট্টরপন্থীদের খুশি করার চেষ্টা করেন। বস্তুত উভয় সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থীদের খুশি করতে গিয়ে রাজীব গান্ধী সরকার যে নীতি নিয়ে চলে তার ফল হিসাবে রামজন্মভূমি- বাবরি বিবাদ দেখা যায় এবং এর চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশকে। তাই সমস্ত সরকারকে মৌলবাদ তোষণ নীতি থেকে বাঁচা উচিত কিন্তু রাজনীতিবিদদের তা বোঝায় কে?

পরবর্তীতে 1990 সালে লালকৃষ্ণ আডবাণী সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রার সূচনা করে। এই রথ যেখান থেকেই যায় সেখানেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। শেষে বিহারের সমস্তিপুরে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব আডবাণীকে গ্রেপ্তার করেন। এভাবেই সেই রথযাত্রা শেষ হয় এবং এর ফলে বিজেপি, ভি পি সিং সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকার ক্ষমতা হারায়। এই সময় সাম্প্রদায়িকতা রোধে সমাজবাদী পার্টির মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। উন্মত্ত কার সেবকদের হাত থেকে সৌধ রক্ষার্থে 1990 সালের 30 শে অক্টোবর মুলায়ম সিং কার সেবকদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পরের নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির ভরাডুবি হয় কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার্থে মুলায়ম সিং যাদবের যে ভূমিকা তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। 1991 সালে উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিং এর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করে ও অযোধ্যায় কার সেবকদের ভিড় জমতে শুরু হয়। অযোধ্যা কান্ডের চুড়ান্ত রূপ দেখা যায় 1992 সালের 6 ই ডিসেম্বর, একদল উন্মত্ত কার সেবকরা বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয় এবং অস্থায়ী মন্দির গঠন করে। এরফলে দেশজুড়ে তীব্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং সম্পত্তির ক্ষতি হয়!

বাবরির প্রভাব ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর অবর্ণনীয় হিংসা নেমে আসে। তসলিমা নাসরিনের ‘লজ্জা’ উপন্যাসে সেই সময়ের বিভৎসতা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশে সেই সময় মিছিল বের হত- ‘দুই চারটা হিন্দু ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর’! আসলে উপমহাদেশ তখন হিংসা ও ভাতৃঘাতি দাঙ্গায় জ্বলছিল। কত মানুষের যে মৃত্যু হয়েছিল, কত মহিলার উপর যে ধর্ষণ হয়েছিল, তাঁর সঠিক কোন হিসাব নেই! যাইহোক এই দাঙ্গার সবচেয়ে তীব্র প্রভাব দেখা যায় বোম্বাইয়ে এবং পরবর্তীকালে এই দাঙ্গার প্রতিশোধ স্বরূপ 1993 সালে প্রথম সিরিয়াল ‘বম বিস্ফোরণ’ দেখা যায় বোম্বাইয়ে। ভারত প্রথম বার এই রকম সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের শিকার হয়। এই প্রথম দেশ আন্ডার ওয়ার্ল্ড ও দাউদ ইব্রাহিমের নাম শোনে। এথেকেই বোঝা যায় তখন বোম্বাই কতটা অসহায় ছিল এবং মানুষের মনে কতটা ভয়, ভীতি ও ঘৃণার প্রসার ঘটেছিল!

বাবরির এই প্রভাব এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে নি 2002 সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আবার মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে অযোধ্যায় কার সেবকদের ভিড় জমায়। এই কার সেবকদের একাংশ অযোধ্যা থেকে ফেরার পথে গুজরাটের গোধরায় 2002 সালের 27 শে ফেব্রুয়ারি হিংসার বলি হয়, 58 জন কার সেবকরা এই মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। এরপর গুজরাটে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং এই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়। (সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই দাঙ্গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।) তাই বাবরির প্রভাব আজও সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়েছে তা বলা যায় না।

2003 সালে এএসআই জমি খুঁজে দশম শতকের এক মন্দির পাওয়া গেছে বলে এলাহাবাদ হাইকোর্টকে রিপোর্টে জানায়, এই রিপোর্ট পক্ষপাত দুষ্ট বলে অভিযোগ আসে। যাক 2009 সালে লিবরাহান কমিশন বাবরি মসজিদ ভাঙার জন্য বিজেপি নেতাদের দায়ী করে। 2010 সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত জমিটি রামলালা ট্রাস্ট, নির্মোহি আখড়া ও ওয়াকাফ বোর্ডের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেন। অবশ্য বিতর্কিত জায়গাটি হিন্দুদের দেওয়া হয়, বলাইবাহুল্য কোন পক্ষই এই রায়ে খুশি হয়নি এবং তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। 2011 সালে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় খারিজ করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। 2017 সালে সুপ্রিম কোর্ট আদালতের বাইরে সমাধান সূত্র খোঁজার চেষ্টা করে। 2019 সালের 8 ই মার্চ সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এফ এম আই খলিকুল্লার নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্যানেলের কাছে মধ্যস্থতার জন্য মামলা পাঠানো হয়। 9 ই মে অন্তর্বর্তী রিপোর্ট জমা পড়ে। 10 ই মে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য 15 ই আগস্ট পর্যন্ত সময় বর্ধিত করা হয়। 6 ই আগস্ট মধ্যস্থতার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আদালত প্রতিদিন শুনানির নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ 40 দিন শুনানির পর গত 16 ই অক্টোবর, 2019 তারিখে শুনানি পর্ব শেষ হয়। 9 ই নভেম্বর, 2019 তারিখ সুপ্রিম কোর্ট তাঁর ঐতিহাসিক অযোধ্যা মামলার রায় ঘোষণা করে।

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো সুপ্রিম কোর্ট এই রায়কে কোন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেনি, রামের অস্তিত্ব ছিল কি না সুপ্রিম কোর্ট তা বিচার করেনি। সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি উভয় পক্ষের জমি বিবাদ হিসেবেই দেখেছেন। তাই এই দেওয়ানি মামলায় হিন্দু মুসলমান উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের দলিল পেশ করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রতিটি বিষয়কে খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তাই যদি কেউ বলে সুপ্রিম কোর্ট কোন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করেছে তা যথার্থ নয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট সাংবিধানিক বেঞ্চ প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে এই রায় প্রদান করেছেন। (অন্যান্য বিচারপতিরা হলে- এস এ বোবদে, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও এ আব্দুল নাজির।)

1045 পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ রায় প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারপতিগণ যে সব যুক্তি তুলে ধরেছেন তার সবটি এখন ও জানা সম্ভব হয়নি, তবে সুপ্রিম কোর্ট যে রায়টি প্রদান করেছে তা হল-

• বিতর্কিত 2.77 একর জমি মন্দির তৈরীর জন্য দেওয়া হল।
• সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে অযোধ্যার কোনও গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গায় 5 একর জমি দেওয়া হবে মসজিদ তৈরীর জন্য।
• শিয়াদের আবেদন খারিজ।
• নির্মোহী আখড়ার সেবায়েত হওয়ার আর্জিও খারিজ। মন্দির গঠনের ট্রাস্টে থাকতে পারবে তারা।
• পাঁচ বিচারপতিই রায়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করছে।
• জমি তিন ভাগে ভাগ করার যে রায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট দিয়েছিল তা ভুল ছিল, সেই রায় খারিজ।

এই রায়ের গুরুত্ব পূর্ণ কিছু অংশ-

1. 1992 সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরিপন্থী। এই মসজিদটিকে যেভাবে নষ্ট করা হয়েছে তা কোন ধর্মনিরপেক্ষ দেশে, আইনি শাসন হতে পারে না।
2. 1949 সালের 22-23 শে জানুয়ারি রাম লালার মূর্তি বসানোর ঘটনাটিও বেআইনি। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য বলছে বাবরি মসজিদ ফাঁকা জমির উপর তৈরী হয়নি, তবে যা ভাঙা হয়েছিল তা হিন্দুদের মন্দির কি না, সে বিষয়ে এ এস আই এর রিপোর্টে কিছু জানা যায় নি।
3. 1857 সালের আগে থেকে হিন্দুরা ওই স্থানে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে উপাসনা করে গেছেন।
4. শর্তসাপেক্ষে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের ও বিতর্কিত উপর অধিকার রয়েছে।
5. মুসলিমরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রমাণ নিয়ে আসেননি। বিতর্কিত জমির মূল অংশ ছিল বিতর্কিত এলাকা, আর তথ্য প্রমাণ একবার ও বলছে না, মুসলিমরা সে এলাকা খালি করে চলে গিয়েছিল। এমন প্রমাণ ও নেই যাতে বলা হয় মুসলিমদের নামাজের কারণে হিন্দুরা বহিষ্কৃত হয়েছিল।
6. প্রায় 450 বছর আগে তৈরি মসজিদ থেকে মুসলিমদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল।

এখানে উল্লেখ্য রায় পড়ার সময় প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন 1949 সালের 22-23 শে জানুয়ারি রাতে অযোধ্যায় রামের মূর্তি স্থাপন করা যেমন অন্যায় কাজ হয়েছিল, তেমনই বেআইনি কাজ হয়েছিল 1992 সালের 6 ই ডিসেম্বর সৌধ ধ্বংস করা। দুটোই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরিপন্থী। রায় দিতে গিয়ে সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

প্রথমত: ইতিহাস, যেখানে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া বা ভারতের পুরাতত্ব সর্বেক্ষণের রিপোর্ট উল্লেখ করে শীর্ষ কোর্ট জানিয়েছে, ফাঁকা জমির উপর মসজিদ নির্মাণ হয়নি। সেটি দ্বাদশ শতকের একটি অ-ইসলামিক কাঠামোর উপর গড়ে উঠেছে। যদিও তা হিন্দু মন্দির ছিল কিনা তাঁর উল্লেখ নেই। এই কাঠামোটি ছিল বিশাল, 17 টি সারিতে 85 টি স্তম্ভ। এই প্রামাণ্য দলিল দ্বাদশ শতকের হিন্দু ধর্মের আচরণের সঙ্গে যুক্ত কোনও কাঠামোকেই চিহ্নিত করে বলে কোর্ট অভিমত প্রকাশ করেছে।

দ্বিতীয়ত: ধর্মবিশ্বাস, কোর্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, 1857 সালের আগে থেকেই ওই জমিতে হিন্দুরা নিরবচ্ছিন্নভাবে উপাসনা করতেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল ওই জমিতেই রাম জন্মেছেন। এই ‘প্রমাণ’ বিভিন্ন পর্যটকের ভ্রমণগাথা ও মৌখিক ইতিহাস থেকে পাওয়া গেছে। এই দুই তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই মন্দিরের জন্য জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিচারপতিরা।

অনেকে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত এ এস আই রিপোর্টের ভিত্তিতে এই রায় প্রদান করেছে যা যথার্থ নয়। আবার অনেকে মনে করছেন হিন্দুদের বিশ্বাসকে ভিত্তি করে যে রায় দেওয়া হয়েছে তা সঠিক নয় যদিও সুপ্রিম কোর্ট নিজে এই রায়ে বলেছেন- ‘অযোধ্যা জমি বিতর্কে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হিন্দুদের বিশ্বাস বিতর্কিত ভূমিতে রাম জন্মেছিলেন। কিন্তু বিশ্বাসের ভিত্তিতে জমির মালিকানা নির্ধারিত হতে পারে না। কোন ও বিশ্বাস যুক্তি সঙ্গত কি না, তা বিচার বিভাগীয় তদন্তের উর্ধ্বে। কোন ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলে আদালতের উচিত সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া, তবে ভারসাম্য বজায় রেখে’। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন এই রায়ের ফলে মহাকাব্যের রাম এখন তিনি ‘ঐতিহাসিক চরিত্র’ হয়ে উঠেছেন। তাই এই রায় নিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সমালোচনা দেখা যাচ্ছে।

কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও বলতে হয় অযোধ্যার এই রায় সমস্ত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে অভিযোগ করছেন এখানে সংখ্যাগুরুদের পক্ষে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এই অভিযোগ সঠিক নয় কারণ সকলকে সমান ভাবে কথা বলার সুযোগ প্রদান করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টকে সমালোচনা করলে ও এই পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ভূমিকা ও খতিয়ে দেখতে হবে। এই রায় শুধু আইনি দৃষ্টিভঙ্গীতে নয় বরং অর্থসামাজিক ও ধর্মীয় পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে। কারণ এই রায়ের প্রভাব ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এর প্রভাব উপমহাদেশে বিস্তৃত তাই সুপ্রিম কোর্টকে এমন একটি রায় দেওয়া প্রয়োজন ছিল, যাতে দেশের সুস্থিতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে, সুপ্রিম কোর্ট সেই গুরুদায়িত্ব পালন করেছে। এখানে উল্লেখ্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আর একটি বিষয় পরিষ্কার সুপ্রিম কোর্ট বাবরি ধ্বংসের তীব্র নিন্দা করেন এবং এই কাজ ঠিক হয়নি বলে ও উল্লেখ করেন তাই বাবরি মসজিদ ভাঙার মামলা এখন ও নিম্ন আদালতে চলছে, আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার রায় দেবে আশা করা যায়। তাই বাবরি কান্ডে বিজেপির অভিযুক্ত নেতাদের কপালে ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক!

পরিশেষে বলা যায় বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বাম, আপ, বিএসপি, এসপি, এডিএমকে, ডিএমকে সমেত সমস্ত রাজনৈতিক দলই এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। শুধু এআইএমএম নেতা আসাদউদ্দিন ওবেইশি বলেন- ‘এই রায়ে সন্তুষ্ট নয়’, তাঁর কথায় সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ, কিন্তু অভ্রান্ত তো নয়। আমরা অধিকারের জন্য লড়াই করছিলাম, মুসলিমদের দান হিসাবে পাঁচ একর জমির প্রয়োজন নেই’। আসলে সব জায়গায় ধর্ম রাজনীতি করা যাদের কাজ তাঁরা এই রায় সহজে মেনে নিতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। এই ধর্মকে পুঁজি করেই এদের রাজনীতি, তাই তাঁর অনুগামীদের আরও উত্যক্ত করতে চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক! এই সমস্ত ধর্মান্ধ রাজনীতিকদের থেকে সচেতন থাকা প্রয়োজন, কারণ এরা সুস্থ গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তাই ছোটখাটো বিরোধ থাকলেও মোটের উপর দেশের সর্ব ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষার মানুষ এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। দিল্লিতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের নেতৃত্বে সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক বৈঠক হয়েছে, যেখানে সব ধর্মের ধর্মগুরুরাই সর্বসম্মতিক্রমে সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন। এটাই ভারতবর্ষ, এটাই ভারতীয় গণতন্ত্র!

ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ধর্ম বিমুখ মানুষ তাই রাম মন্দির হল না বাবরি মসজিদ হল এ নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। যদি ওই জায়গায় কোন হাসপাতাল বা বিশ্ববিদ্যালয় হত তাহলে মানব সমাজের আরও অনেক বেশি কল্যাণ হত।সাধারণ ধর্মান্ধদের সেকথা বোঝাই কে? সাধারণ ধার্মিকদের দিক থেকে বলতে হয় হরিপদ কেরানি বা গফুর চাচা কেউই রাম মন্দিরে পুজো দিতে বা বাবরি মসজিদে নামাজ পড়তে যাবে না। তাহলে এত রক্তপাত, এত হিংসা, এত বিদ্বেষ কেন? ঈশ্বর, আল্লা বা ভগবান কি নিজের ঘর রক্ষা করতে পারেন না, যে তাঁর ঘর রক্ষা করতে গিয়ে যুগ যুগ ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজের জীবন আহুতি দিয়ে চলেছে? এই নোংরা ধর্ম রাজনীতি উৎস রাম মন্দির- বাবরি মসজিদ বিতর্কে কতজন প্রাণ হারিয়েছে, এবং কতজন সর্বস্বান্ত হয়েছেন তাঁর কোন হিসাব নেই! তাই এই বিবাদের যত দ্রুত সম্ভব সমাধান প্রয়োজন! তাই শেষ পর্যন্ত এই নোংরা ধর্ম রাজনীতির মূল উৎস, অযোধ্যা রায়ের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে, তাই এটা দেশ ও দশের পক্ষে মঙ্গলজনক! আমরা আশাবাদী সমস্ত সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতা দূর করে আমাদের আগামীর জন্য এক সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে পারব। তার জন্যই আমাদের এত ত্যাগ, তিতিক্ষা, ও সংগ্রাম!

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এইসময়।
3. গণশক্তি।
4. The hindu.
https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/several-positives-for-the-muslim-plaintiffs/article29947180.ece

https://www.thehindu.com/opinion/editorial/peace-and-justice/article29938535.ece

5. ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যসূত্র।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of