মিয়ানমারে বড় শক্তিগুলো হিস্যা প্রতিষ্ঠায় মরিয়া

মিয়ানমারে চীন ও ভারতের অর্থপূর্ণ প্রভাব দৃশ্যমান। জাপান সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়ে ভারতের সঙ্গেই সহযোগিতা করে চলে। চীনের কৌশল মোকাবিলায় এ অঞ্চলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার অংশীদার। সেই পরিকল্পনায় আঞ্চলিক মিত্র হলো ভারত। কিন্তু মিয়ানমারের ক্ষেত্রে জাপানের বাড়তি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সেখানে সরাসরি নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী তারা। ভারত ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে হলেও মিয়ানমারে নিজ হিস্যা আদায়ে মরিয়া জাপান।

চলতি বছরের আসিয়ান এবং বর্তমানে ব্যাংককে চলমান ইস্ট এশিয়ান সম্মেলনের আড়ালে জাপান মিয়ানমারে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য গোপনে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনার মুখে উদ্বিগ্ন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি এখন তার দেশের সপক্ষে এশিয়ার ‘বন্ধু’ দেশগুলোর সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় জাপানের এমন আগ্রহ তাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সু চি এই মুহূর্তে ব্যাংককে অবস্থান করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্যাংককে সু চির কর্মকান্ড থেকে স্পষ্ট যে, এ অঞ্চলে তার দেশের গুরুত্ব বাড়ছে।

সু চির ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন যে, তিনি মনে করেন ব্রিটেন আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাথে প্রতারণা করেছে। গত বছর তিনি তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগিকে বলেন যে, মিয়ানমার আসলে দুইটা মাত্র বন্ধুর প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে, চীন ও জাপান। আর এর চেয়ে কিছু কম মাত্রায় ভারতের উপর। এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, জাপান ইতিমধ্যে মিয়ানমারে নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠায় ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে। তবে জাপান একা নয়, অন্য শক্তিগুলোও মিয়ারমারে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের উপায় অনুসরণ করছে।

মিয়ানমারে পশ্চিমাদের সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে, যদিও ব্রিটেন জাতিসংঘে তাদের সমালোচনার মাত্রা কিছুটা নমনীয় করেছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য তারা মিয়ানমারের দ্বারস্থ হচ্ছে। তবে নিজেদের দিক থেকে মিয়ানমার এশিয়াতেই তার শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিগত ছয় মাসে রাখাইনের বর্বর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে মিয়ানমারের বিচারের জন্য যে চাপ বাড়তে শুরু করেছে, সেখানে মিয়ানমার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশেষ করে জাতিসংঘে চীনের সুরক্ষা নেয়ার চেষ্টা করেছে।

এই বিষয়ে রাশিয়াও বিশেষ সুবিধা নিতে পেরেছে। কারণ রাশিয়া জাতিসংঘ সিকিউরিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মিন অং লাইং এবং সিনিয়র সরকারী কর্মকর্তারা বিশেষ করে জাতিসংঘে মস্কোর সমর্থন পেয়েছেন। রাশিয়া মিয়ানমারের বড় ধরনের অস্ত্রের সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে, যেটা চীনকে কিছুটা বিস্মিত করেছে। বিগত তিন বছরে মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে রাশিয়া সফর করেছেন।

১৯৮৮ সাল থেকে জেনারেলরা মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলের পর এবং ১৯৯০ সালের আগের নির্বাচনের ফল বাতিল করার পর থেকে চীন মিয়ানমারের অনমনীয় মিত্র হিসেবে সাহায্য করে যাচ্ছে। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) অনেকে মনে করেন যে, একমাত্র চীনের সমর্থনের কারণেই আন্তর্জাতিক মহল ও পশ্চিমা দেশগুলোর তীব্র সমালোচনা সত্বেও যতদিন খুশি স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করে গেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী

তবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সরকারের নীতির কারণেই এসব দেশ সেখানে এত সুযোগ নিতে পারছে। চীনকে সুযোগ দিতে রাজি থাকলেও সামরিক বাহিনী বেইজিংয়ের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ বেইজিং তাদের উপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সাম্প্রতিককালে তাদের ভারতীয় সাবমেরিন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সেটা বোঝা গেছে। আবার এই চিন্তাধারাটা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও রয়েছে। মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষের মতো সু চিও চীনকে অপছন্দ করেন। কারণ আগের সামরিক সরকারকে তারা পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। তবে একই সাথে তিনি বাস্তবপন্থী। ২০০৩ সালে চীনবিরোধী অবস্থান নেয়ার পরপরই তার গাড়ি বহরে হামলা হয় এবং তিনি গৃহবন্দী হন। নিজের ক্ষোভ ও সন্দেহ দূরে সরিয়ে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তারা শক্তিধর প্রতিবেশী, এবং তাদের ক্ষুব্ধ করাটা আমার উচিত হবে না’।

স্টেট কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকে এবং একইসাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই মনোভাব তার কৌশল নির্ধারণে সাহায্য করেছে। মিয়ানমারে যেসব ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাখাইন সঙ্কট এবং বর্বর সামরিক অভিযান থেকে প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার প্রায় দশ লাখ মুসলিম শরণার্থীর প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের পর থেকে মিয়ানমার আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও সহায়তার জন্য তারা আরও বেশি করে চীনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের জন্য এটা একটা বড় সমস্যা তৈরি করেছে। তাই বিগত এক বছর ধরে মিয়ানমারের নেতারা তাদের কৌশলগত ছাতা সম্প্রসারিত করার এবং ‘জোটের’ ক্ষেত্র বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

এর ফল হিসেবেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই জাপান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সু চির সম্প্রতি জাপানের নতুন সম্রাটের সিংহাসনে আরোহন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের কাছে জাপানের গুরুত্বের দিকটি উঠে এসেছে। চলতি বছরে দুবার জাপান সফরে গেলেন সু চি, অন্যদিকে চীনে গিয়েছেন একবার। এটা হয়তো মিয়ানমারের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তবে শক্তিধর প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে কিভাবে তারা ভারসাম্য রক্ষা করে চলবে, সেটা একটি বড় বিষয়।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of